menu

কাজুবাদাম সংগ্রহ ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা

জামাল উদ্দিন

  • ঢাকা , মঙ্গলবার, ২০ জুলাই ২০২১

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্তমানে দেশে কাজুবাদাম চাষে বেশ তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে। এ নিয়ে সরকারের উদ্যোগ ও বেশ চোখে পড়ার মতোই। নব্বইয়ের দশকে ভিয়েতনামে কাজুবাদামের প্রক্রিয়াজাত করার কারখানা গড়ে তুলে বর্তমানে বিশে^র কাজুবাদাম বাণিজ্যের ১৪.৯ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৯ বিলিয়ন ডলারের বাজার একাই নিয়ন্ত্রণ করছে। এটা সম্ভব হয়েছে সে দেশের সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনার কারণে। আমাদের দেশেও এ কার্যক্রম বেগবান হতে যাচ্ছে। সে জন্য কাজুবাদামের উৎপাদন বৃদ্ধি যেমন জরুরি তেমনি কাজুবাদাম সংগ্রহ এবং সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা যেমন শুকানো, সংরক্ষণ, গ্রেডিং এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়টিও ততটাই জরুরি। সাধারণত উন্নতজাত বা উচ্চফলনশীল কাজুবাদাম গাছের বয়স তিন বছর হলেই অর্থনৈতিকভাবে বাদাম সংগ্রহের জন্য উপযুক্ত হয়। গাছের বয়স ১০-১৫ বছর হলে সর্বোচ্চ ফলন দেয়া শুরু করে। গাছের বয়স, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে প্রতি গাছ থেকে ০.৫ থেকে ২৫.০ কেজি পর্যন্ত নাট (বাদাম) পাওয়া যায়। আর আট বছর বা এর বেশি বয়সী গাছে ১০.০ থেকে ২৫.০ কেজি পর্যন্ত নাট সংগ্রহ করা সম্ভব। উচ্চ ফলনশীল জাত হলে উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতি হেক্টরে ৩.০ থেকে ৫.০ টন পর্যন্ত নাট পাওয়া সম্ভব বলে আন্তর্জাতিক প্রবন্ধে উল্লেখ রয়েছে। তবে আমাদের দেশে বিদ্যমান ফলন হেক্টর প্রতি ১.৫-১.৮ টন যা বৈশি^ক গড় ফলন ০.৭৫০ টনের এর চেয়ে বেশি। আমাদের দেশে মে থেকে জুন মাস পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। ফল সংগ্রহের আগে গাছের নিচের আগাছা পরিষ্কার করে নেয়া ভালো।

কাজুবাদাম পরিপক্ব হলে এর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবে এটি প্রাকৃতিকভাবে ঝরে পড়ে। কাজু ফলটি সংগ্রহের পর ছাকু বা নাইলন সুতা দিয়ে বাদাম থেকে ফলটি সাবধানে আলাদা করতে হবে। সাধারণত ঝরে পড়া নাটগুলোই বেশি পরিপক্ব থাকে। নাট পানিতে ডুবলে পরিপক্ব আর পানিতে ভেসে থাকলে অপরিপক্ব বলে ধরে নেয়া যায়। পরিপক্ব ফল ঝরে পড়া ছাড়াও কাঠি দিয়ে, গাছে উঠে হাত দিয়ে অথবা গাছ ঝাঁকুনি দিয়ে সংগ্রহ করে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে অপরিপক্ব নাট সংগ্রহের ঝুঁকি থেকে যায়। অপরিপক্ব নাট প্রক্রিয়াজাত করলে রপ্তানিযোগ্য নাট পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ঝরে পড়া পরিপক্ব নাট সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রহ না করলে মাটির বা পানির সংস্পর্শে এসে কার্নেলের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সপ্তাহান্তে নাট সংগ্রহ করা যায় তবে এটা নাটের পরিপক্বতার ওপর নির্ভর করে। অপরিপক্ব নাট যেন প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানায় সরবরাহ করা না হয় সেদিকটি চাষিদের বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা উচিত। অন্যথায়, সুনাম ক্ষুণœ হতে পারে। দাম কমে যেতে পারে। এটা নিশ্চিত করতে কাজুবাদাম চাষিদের নিয়ে সংগঠন তৈরি করা যেতে পারে।

কাঁচা নাট সংগ্রহের পর রৌদে ৩-৪ দিন ভালোভাবে শুকালে পচন রোধ হয়। শুকানোর জায়গাটি অবশ্যই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে হবে। বিশেষ করে ত্রিপলে নাট না শুকিয়ে রাফ কনক্রিটের মেঝেতে বা মাদুরে শুকানো গেলে ভালো। ত্রিপলে অতি গরমে নাটের কার্নেলের মান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে ভালোমানের ত্রিপল ব্যবহার করা যেতে পারে। নাট এমনভাবে শুকাতে হবে যেন এর আর্দ্রতা ৮-৯ শতাংশে নেমে আসে। এটি বোঝার উপায় হলো নাটগুলোকে নাড়াছাড়া করলে রেটলিং বা ঝনঝন শব্দ হবে। নাটগুলো যাতে সমভাবে শুকায় সেজন্য মাঝে মাঝে নেড়ে দেয়া ভালো। নাটগুলো শুকানোর পর ঘানি ব্যাগ বা চটের বস্তায় বায়ুরোধী করে বেঁধে উপযুক্ত বায়ু চলাচল আছে এমন জায়গায় পরপর কিছুটা ফাঁক রেখে নাটভর্তি ব্যাগগুলো রাখা উচিত। নাটগুলো এভাবে রাখলে ৮-১১ মাস পর্যন্ত সাধারণ তাপমাত্রায় ভালো থাকে। তবে ৬ মাস পর থেকে এর সজীবতা কমতে থাকে। তার আগেই নাটগুলো প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানায় বিক্রি করে দেয়া ভালো। ভালোভাবে নাট শুকানো ও সংরক্ষণের ওপর মানসম্মত কার্নেল প্রাপ্যতা নির্ভর করে। প্লাস্টিক ব্যাগে বা টিনের পাত্রে নাট না রাখাই ভালো।

প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানায় নাট প্রেরণের আগে গ্রেডিং একটি অপরিহার্য কাজ। কৃষক গ্রেডিং করে শুকানো নাট প্রেরণ করতে পারলে প্রক্রিয়াজাত করা সহজ হয়। খোসাসহ ১৮০টি নাটের ওজন এক কেজি হলে উহাকে ‘এ’ গ্রেড হিসাব করা হয়। এরপর ১৮১-২১০টি হলে ‘বি’ গ্রেড এবং ২১১টির উপরে হলে ‘সি’ গ্রেড নাট হিসেবে ধরা হয়। নাটের আকার যত বড় হবে তত বাজার মূল্য বেশি পাওয়া যায়। খোসাসহ নাটের ওজন ১১০টি মিলে যদি এক কেজি হয় সেটি সুপার ক্লাস নাট হিসাবে বিবেচনা করে থাকে। বড় সাইজের নাটের বাজার চাহিদা এবং বাজার মূল্য অনেক বেশি। তাই বড় আকৃতির নাট পাওয়া যায় এমন কাজুবাদামের জাত উদ্ভাবন প্রয়োজন। প্রক্রিয়াজাতকরণের পর গ্রেডিং আবার ভিন্ন হয়ে থাকে। সেটি কার্নেলের সাইজের ওপর ভিত্তি করে বাণিজ্যিক উদ্দেশে করা হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণ সুযোগ তৈরিকরণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ালেই কৃষক বেশি লাভবান হবে। নতুন করে কাজুবাদাম চাষের দিকে মনোনিবেশ করার মূল লক্ষ্য হলো প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করা। তাতে দেশ সমৃদ্ধ হবে। কাজুবাদাম উৎপাদনে যেমনটি গুরুত্ব দেয়া হয় ঠিক তেমনটি প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টিতে সমভাবে গুরুত্ব দেয়া উচিত। উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তোলা দরকার। অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে হয় যেমন রোস্টিং, শেলিং, কার্নেল ড্রাইয়িং, পিলিং, সুইটিং উল্লেখযোগ্য। এসবে অনেক খরচ ও শ্রম জড়িত থাকে। আর সে কারণে কৃষক পর্যায়ে কাজুবাদামের দাম এবং প্রক্রিয়াজাতকৃত কাজুবাদামের দামে বেশ ফারাক লক্ষ্য করা যায়। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিলে এবং সরকারি সহায়তা পেলে সবাই লাভবান হবে বলে আশা করা যায়।

[লেখক : উপ-প্রকল্প সমন্বয়কারী পরিচালক, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প]