menu

মহামারীতে কর্মহীন মানুষ এনজিওগুলো মাঠে নেমেছে ঋণের কিস্তি আদায়ে

দিচ্ছে নানা হুমকি

সংবাদ :
  • লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর
  • ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৪ মে ২০২১

রংপুরে করোনা সংক্রমণের কারণে অব্যাহত লকডাউনে জনজীবন যেখানে বিপর্যস্ত, হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন, সহায়-সম্বলহীন পরিবারগুলো যেখানে অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে সে সময় এনজিওগুলো তাদের কাছ থেকে সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা জোর করে আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টাকা না দিলে নানাভাবে হুমকি-ধমকি প্রদানেরও অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিন রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খোদ নগরীতেই কর্মজীবী, শ্রমিকসহ নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো বড় বড় এনজিও যেমন আশা, ব্র্যাক, ঠেঙ্গামারা সমিতিসহ বিভিন্ন এনজিও থেকে ৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছে। তাদের সাপ্তাহিক ও মাসিক কিস্তি ভিত্তিতে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানায় দিন আনা দিন খাওয়া মানুষসহ নিম্নবিত্ত মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ফলে তারা তাদের নেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না। নগরীর মুন্সিপাড়া মহল্লার জামিলা বেগম জানান, তিনি ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন, তাকে সপ্তাহে ৫শ’ টাকা কিস্তি দিতে হয়, কিন্তু লকডাউনের কারণে তাদের কোন আয়-উপার্জন না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে নিজেরাই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে, সেখানে সাপ্তাহিত কিস্তি দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এনজিওকর্মীরা বলছে, যেহেতু ব্যাংক খোলা সে কারণে তাদের কিস্তি দিতেই হবে। একই কথা জানালেন মোসলেমা, নাজরীন বেগমসহ অনেকে। নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়া মহল্লায় আশা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছে বেশ কয়েকজন নারী। তারা সাপ্তাহিক কিস্তি হিসেবে টাকা আদায় করে, কিন্তু ঋণ গ্রহণকারীরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় ঋণ প্রদান করতে পারছে না বলে জানিয়েছে অনেকে, কিন্তু এনজিওকর্মীরা এসব অজুহাত বলে উড়িয়ে দিয়ে জোর জবরদস্তি কিস্তির টাকা আদায় করছে।

নগরীর শালবন, মিস্ত্রিপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিস্তি দিতে না পারায় তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। নাজমা বেগম নামে একজন নারী জানান, মানুষের বাড়িতে কাজ করে তার স্বামী বাজারে কুলিগিরি করে। লকডাউনের কারণে আয়-রোজগার একেবারে কমে যাওয়ায় নিজেরাই খেতে পারছে না ফলে এনজিও থেকে নেয়া ঋণের কিস্তি প্রদান করতে পারছে না। তিনি বলেন, সরকার আপাতত লকডাউনকালে কিস্তি দেয়া বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলে তারা এনজিওর অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতেন।

এ ব্যাপারে একটি প্রতিষ্ঠিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনজিওকর্মী এ প্রতিনিধিকে জানান, সরকার গত বছরের মতো ঋণের কিস্তির টাকা আদায় স্থগিত রাখার ঘোষণা দিলে আমরাও বাঁচতাম গরিব মানুষরাও রক্ষা পেত। নগরীর লালবাগ বস্তিতে প্রায় এক হাজার পরিবার বাস করে, এদের বেশিরভাগ পরিবার বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। কিন্তু লকডাউনের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়ায় তারা কিস্তির টাকা দিতে পারছে না বলে জানিয়েছে।

সাফিয়া খাতুন, মর্জিনাসহ কয়েকজন জানালেন তারা বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও মেসে কাজ করতেন। করোনার কারণে বাড়িতে কাজে নিচ্ছে না অনেকে, ফলে তাদের নিজেদের চলে না, তিন বেলার মধ্যে এক বেলাই ভাত পাচ্ছেন না ঋণের টাকা প্রদান করবে কিভাবে?

এদিকে নগরীর শাপলা চত্বর, মেডিকেল পুর্বগেট, বেতপট্টি এলাকায় ভোর থেকে কাজের সন্ধানে আসা বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা শ্রমিক, দিনমজুররাও জানিয়েছে একদিকে কর্ম নেই অন্যদিকে এনজিওগুলোর কাছ থেকে নেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় মহাবিপদে পড়েছেন।

এ ব্যাপারে এনজিও ব্র্যাকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমরা সাধারণত নারীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ঋণ দেই যা সাপ্তাহিক ও মাসিক কিস্তিতে আদায় করা হয়। তিনি বলেন, আমরা চাকরি করি কিস্তির টাকা আদায় করতে না পারলে আমাদের তো চাকরি নেই বেতনও নেই। ফলে সরকার ব্যবস্থা নিলে সুবিধা হতো।

এভাবেই রংপুর নগরী ছাড়াও জেলার ৮ উপজেলার প্রায় ৩ লাখেরও বেশি নারী কোন না কোন এনজিওর কাছ থেকে ঋণ দিয়েছে। তারা এমন সময় কিস্তির মাধ্যমে সেই টাকা পরিশোধ করত, কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে লকডাউন অব্যাহত থাকায় তারা কর্মহীন হয়ে পড়ায় কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পারছে না।

এ ব্যাপারে খেতমজুর শ্রমিকের কাজ করা আরেফিন তিতু জানালেন, আমরা অনেক আগে থেকে বলে এসেছি করোনার এই মহামারীকালে সহায়-সম্বলহীন মানুষের ঋণের কিস্তি নেয়া বন্ধ রাখতে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যংকের একটি নির্দেশনাই যথেষ্ট, কিন্তু সেটা হচ্ছে না।

আর এনজিওগুলো বেনিয়ার মতো আচরণ করছে টাকা দেয়ার জন্য, নানা হুমকি-ধমকি দিচ্ছে, এ ব্যাপারে সরকারের এখনই পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে সিপিবির উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত হোসেন অভিযোগ করেন, এনজিওগুলো এমনিতেই চড়া সুদে ঋণ দেয়, তার ওপর এখন করোনা মহামারী চলা অবস্থায় তাদের ঋণের কিস্তি নেয়া বন্ধ করতে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ ব্যাপারে এনজিও সংগঠন ব্র্যাক, আশা, ঠেংগামারার রংপুরে কর্মরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা কেউই কথা বলতে রাজি হননি। সার্বিক বিষয়ে জানতে রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের কাছে এমন অভিযোগ আসছে। লিখিত অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।