menu

ডেটলাইন সুন্দরবন

ধরা পড়ছে চুনোপুঁটি, আড়ালে থেকে যাচ্ছে গডফাদার

পাঁচ মাসে ৭ মণ হরিণের মাংস উদ্ধার

সংবাদ :
  • বাকী বিল্লাহ, ঢাকা ও এমাদুল হক, শরণখোলা
  • ঢাকা , শুক্রবার, ১১ জুন ২০২১

সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী শিকার থামছে না। সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র হরিণ, বাঘ ও কুমির শিকার করছে। এসব প্রাণীর বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ পাচার করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের গত ৫ মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পৃথক অভিযান চালিয়ে ৭ মণ হরিনের মাংস, ৩০টি চামড়া ও দুটি বাঘের চামড়া উদ্ধার করেছে।

অভিযান চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কমপক্ষে ৩০ জনকে আটক করেছে। এরা স্থানীয় পাচারকারী। তবে মূল হোতা গডফাদারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। এ কারণে থামছে না বন্যপ্রাণী শিকার ও চামড়া পাচার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৯ জানুয়ারি র‌্যাব সদস্যরা সুন্দরবনের শরণখোলা রাজৈর এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বাঘের চামড়াসহ গাউস ফকির নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে। তাৎক্ষনিক জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, চামড়াটি শরণখোলার সোনাতলা গ্রামের বাসিন্দা ওহিদুল ও ওবায়েদুল বিক্রির জন্য তার কাছে দিয়েছে। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব তদন্ত করছে।

গত ২২ জানুয়ারি গোয়েন্দা পুলিশ শরণখোলার রাজৈর বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি বাসা থেকে ১৯টি হরিণের চামড়া উদ্ধার করেছে। এ সময় ইলিয়াস কাজিসহ ২ জনকে আটক করা হয়েছে।

গত ৩০ জানুয়ারি মোংলা কোস্টগার্ডের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ৪৭ কেজি, হরিণের মাংস, হরিণের একটি মাথাসহ মোনা সর্দার, জাহিদ শেখ ও শহিদুল শেখকে আটক করেছে।

গত ৩১ জানুয়ারি বনরক্ষীরা শরণখোলার দক্ষিণ রাজাপুর এলাকা থেকে ২০ কেজি হরিণের মাংসসহ মিলন শেখ নামে এ ব্যক্তিকে আটক করেছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করে, পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা এলাকার বন্যপ্রাণী পাচারকারী গ্রেপ্তারকৃত হাবিব তালুকদার ওরফে বাঘ হাবিব, তানজের, চান মিয়াসহ কয়েকজন বন্যপ্রাণী শিকারি হরিণ শিকার ও হরিণের মাংস বিক্রি করে।

বাগেরহাট জেলা গোয়েন্দা পুলিশ গত ১ ফেব্রুয়ারি রামপাল এলাকায় গোপিনাথপুর গ্রামে অভিযান চালিয়ে ৪২ কেজি হরিণের মাংস, ৩টি মাথাসহ আবদুর রহমান শেখ ও তার ছেলে মোস্তাকিন শেখকে আটক আটক করেছে। কোস্টগার্ডের সদস্যরা গত ৭ ফেব্রুয়ারি হরিণের ৪টি পাসহ জাহাঙ্গীর মোল্লা ও ফজলু শিকারি ও ১৮ ফেব্রুয়ারি ২২ কেজি হরিণের মাংসসহ একজনকে আটক করেছে।

গত ২২ এপ্রিল সুন্দরবন সংলগ্ন পানিরঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে শরণখোলা থানা পুলিশ ১৫ কেজি হরিণের মাংসসহ দুই পাচারকারীকে আটক করেছে। এভাবে গত ৫ মাসের বিভিন্ন সময় সুন্দরবন শরণখোলাসহ আশপাশ এলাকায় র‌্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়ে বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্রের ৩০ সদস্যকে আটক করেছে। তাদের কাছ থেকে প্রায় ৭ মণ হরিনের মাংস, চামড়া ও বাঘের অঙ্গপ্রতঙ্গ উদ্ধার করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবন থেকে পাচারকারী চক্র বিভিন্ন কায়দায় বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্র শিকার করে আনা বন্যপ্রাণীর অঙ্গপ্রতঙ্গ শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের সীমানা পেরিয়ে চলে যায় আর্ন্তজাতিক চোরাই বাজারে। তবে এসব চক্রের হোতারা রহস্যজনক কারণে সব সময় পর্দার অন্তরালে থাকায় বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্রের লাগাম টানা যাচ্ছে না বলে অভিমত বন বিশেষজ্ঞদের। এ পর্যন্ত বন বিভাগের হিসাবে ৫৪টি বাঘের নানা কারণে মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে ১৫টি। লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় গ্রামবাসীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে ১৪টি। আর চোরা শিকারিরা বিভিন্ন পন্থায় ও ফাঁদ ব্যবহার করে হত্যা করেছে ২৬টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

শরণখোলা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বন্যপ্রাণীর চামড়া, মাংসসহ প্রায় সময় স্থানীয় পাচারকারী চক্রের চুনোপুঁটিরাই গ্রেপ্তার হচ্ছে। তাদের মূল হোতা বা গডাফাদারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। সম্প্রতি বাঘ হাবিব গ্রেপ্তার হলে তাকে আদলতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। স্থানীয়দের মতে, বাঘ হাবিবকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পাচারকারী চক্রের গডফাদারদের নাম বেরিয়ে আসতে পারে। গডফাদাররা গ্রেপ্তার হলে বন্যপ্রাণী পাচার নিয়ন্ত্রণে আসবে।

সুন্দরবন সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সহ-সভাপতি ওয়াদুদ আকন বলেন, বন্যপ্রাণী নিধনের জন্য বন সংলগ্ন এলাকার প্রভাবশালীরা দায়ী। কিছু পাচারকারী তাদের ছত্রছায়ায় থেকে অপকর্ম করছে। প্রভাবশালীরা বিভিন্ন স্থানে হরিণের মাংস বিক্রি করে। আর মাংস দিয়ে তদবির করে কাজ ভাগিয়ে নেয়।

শরণখোলা থানার ওসি সাইদুর রহমান জানান, পুলিশসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধির কারণে এখন পাচারকারীরা আটক হচ্ছে। বাঘ হাবিব আটকের পর নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।

বন কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন জানান, বন্যপ্রাণী পাচারকারী ও শিকারিদের ধরতে বনের নিরাপত্তা জোরদার ও অভিযান অব্যাহত আছে। বন্যপ্রাণী অবাধ বিচরণের জন্য সুন্দরবনের ৫০ ভাগ এলাকা এখন সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে। পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনতে চেষ্টা অব্যাহত আছে।