menu

স্বস্তিতে নেই রাবিতে অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তরা

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ, কেউ চাকরিতে যোগ দিতে পারবে না

সংবাদ :
  • ওয়াসিফ রিয়াদ, রাবি
  • ঢাকা , শনিবার, ০৮ মে ২০২১

বিদায়ের শেষ বেলায় অবৈধ নিয়োগে কী করেননি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী উপাচার্য এম আবদুস সোবহান। চাপ এড়াতে রেজিস্ট্রার আবদুস সালামকে আত্মগোপনে যেতে হয়েছিল। তার এই নিয়োগ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। কিন্তু এতকিছুর পরও যারা নিয়োগ পেলেন তারা বলছেন স্বস্তিতে নেই তারা।

নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা জানান, চাকরির জন্য ‘অনেক দিন অপেক্ষা’ করতে হয়েছে তাদের। চাকরি হয়েছে তবে এর নিশ্চয়তা না থাকায় স্বস্তি পাচ্ছেন না তারা। বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পরে আরও শঙ্কিত তারা। তাদের দাবি ‘অনেকেরই যোগ্যতা অনুযায়ী’ চাকরি হয়নি। সে কারণে এখন অনেকেই চাকরিতে যোগ দেবেন কিনা তাও ভাবছেন।

বিশ^বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ৯ জন শিক্ষক, ২৩ জন সেকশন অফিসার, ২৪ জন সহায়ক কর্মচারী এবং ৮৫ জন উচ্চ ও নি¤œমান সহকারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তান, স্ত্রী ও স্বজন, ছাত্রলীগের সাবেক-বর্তমান ৪৩ নেতাকর্মী, রয়েছে চার জন সাংবাদিক নেতা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি সূত্র বলছে, আগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া কিছু পদেও এই নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তখন অনেকেই আবেদন করেছিলেন। কিছু পদে পরীক্ষাও হয়েছিল। সুতরাং তাদের বাদ রেখে ওই পদে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া যায় না। কেউ আইনের আশ্রয় নিলে এই অ্যাডহক নিয়োগ বাতিল হয়ে যেতে পারে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিদায়ী উপাচার্য এম আবদুস সোবহান তার মেয়াদের শেষ দিনে ১৪১ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। অস্থায়ী ভিত্তিতে বিভিন্ন পদে এই নিয়োগ দিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নিয়েছেন তিনি। এরপরই বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নিয়োগ বৈধ নয় উল্লেখ করে নিয়োগে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

তদন্ত কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে নিয়োগে জড়িতদের চিহ্নিত করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন ঘোষণার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন না নিয়োগপ্রাপ্তরা।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় প্রশাসনিক নিয়োগদানে তাকে নিষেধ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিদায় বেলায় উপাচার্য বিভিন্ন পদে অবৈধ ও নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগদানের বৈধতা নেই।’

বৃহস্পতিবার সদ্য বিদায়ী উপাচার্য সোবহান বিদায় বেলায় বিভিন্ন পদে অস্থায়ী (এডহক) ভিত্তিতে ১৪১ জনকে নিয়োগ দেন। নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোয় তিনি রেজিস্ট্রার আবদুস সালামকে অব্যাহতি দেন। পরে তার স্থলে পরিষদ সেকশনের সহকারী রেজিস্ট্রার মামুন-উর-রশিদকে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দেয়া হয়। আর বিদায়ী উপাচার্যের নির্বাহী আদেশে উপরেজিস্ট্রার মো. ইউসুফ আলীর স্বাক্ষরে এই নিয়োগ দেয়া হয়।

অব্যাহতির বিষয়ে জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার আবদুস সালাম বলেন, ‘নতুন করে রেজিস্ট্রার নিয়োগের তথ্যটি সঠিক নয়। আমাকে নানাভাবে অনৈতিক চাপ দেয়া হয়েছিল। তাই আমি আত্মগোপনে ছিলাম।’

নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ অবৈধ নিয়োগ। এই নিয়োগের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা এসেছে। যেহেতু এটি একটি অবৈধ নিয়োগ, সেহেতু কথাকথিক নিয়োগপ্রাপ্তদের কেউই চাকরিতে যোগদান করতে পারবেন না।’

নিয়োগের ভবিষ্যত সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার মো. মখলেছুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যলয়ে অ্যাডহকে ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। এই সময় শুরু হয় সংশ্লিষ্ট পদে যোগদানের দিন থেকে। ছয় মাস পর যদি ওই ব্যক্তি আবার চাকরি করতে চান, তখন তাকে বিশ্ববিদ্যলয়ে আবেদন করতে হয়। বিশ্ববিদ্যলয় বিবেচনা করলে আবার ছয় মাস বাড়বে, নয় তো চাকরি চলে যাবে।’

এদিকে বিশ^বিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহাকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয়। উপাচার্য নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তিনি উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করবেন।

এর আগে নিয়োগ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গত কয়েকদিন ধরে চলা অস্থিরতার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে রাবি ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও কর্মচারীরা তাদের ধাওয়া করে। এতে ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যায় মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

এ সময় মহানগর ছাত্রলীগ সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার আবদুল্লাহ আল মামুন ও সেকশক অফিসার মাসুদের উপরও হামলা চালান। পরে বিশ্ববিদ্যলয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এগিয়ে এলে তাদের উপরও হামলা চালান। এ সময় রাবি ছাত্রলীগ সংগঠিত হয়ে ধাওয়া করলে মহানগর ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পালিয়ে যান।

২০১৭ সালের ৭ মে দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য পদে নিয়োগ পান এম আবদুস সোবহান। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে যোগ্যতা শিথিল করে মেয়ে-জামাতাকে নিয়োগসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। গত বছর ইউজিসির তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের নিয়োগ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়।