menu

লকডাউনে স্পিডবোট বেপরোয়া

শিবচরে বাল্কহেডে ধাক্কা : ২৬ লাশ উদ্ধার

সংবাদ :
  • শিব শংকর রবিদাস, শিবচর (মাদারীপুর)
  • ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৪ মে ২০২১

মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা নদীতে বালুবাহী বাল্কহেডের সঙ্গে যাত্রীবাহী স্পিডবোটের সংঘর্ষের ঘটনায় ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন ৫ জন। গতকাল সকাল ৭টার দিকে বাংলাবাজার ফেরিঘাটের পুরনো কাঁঠালবাড়ী ঘাটে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

বাংলাবাজার ফেরিঘাটের ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক আশিকুর রহমান বলেন, মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া থেকে ৩০ জন যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোট বাংলাবাজার ফেরিঘাটের দিকে যাচ্ছিল। বেপরোয়া গতির স্পিডবোটটি বাংলাবাজার ফেরিঘাটের পুরনো কাঁঠালবাড়ী ঘাটের কাছাকাছি আসার পর নদীতে নোঙর করে রাখা একটি বালুবোঝাই বাল্কহেডের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে স্পিডবোটটি উল্টে ও দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

বালুবাহী বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে উল্টে যাওয়া স্পিডবোটটির কোন নিবন্ধন ছিল না, এর চালকের দক্ষতার সার্টিফিকেটও ছিল না। স্পিডবোটের আহত চালক শাহ আলম আটক হওয়ার পর এসব কথা জানিয়েছে শিমুলিয়া নৌ-বন্দর কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা বলেন, শিমুলীয়া ঘাট থেকে ছাড়ার পরই চালক বেপরোয়া গতিতে স্পিডবোট চালাচ্ছিল। আস্তে চালাতে বললেও চালক শুনেনি।

এ ঘটনায় মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারপ্রতি নগদ ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দেয়া হয়েছে। দুর্ঘটনায় আহত ৫ জনকে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

নিহতরা হলেন, খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার বারুখালির মনির মিয়া (৩৮), হেনা বেগম (৩৬), সুমী আক্তার (৫) রুমি আক্তার (৩), ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার চরডাঙা গ্রামের বাবা আরজু শেখ (৫০), ইয়ামিন সরদার (২), মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার সাগর ব্যাপারী (৪০), কুমিল্লার দাউদকান্দির কাউসার আহম্মেদ (৪০), রুহুল আমিন (৩৫), মাদারীপুর জেলার রাজৈরের তাহের মীর (৪২), কুমিল্লার তিতাসের জিয়াউর রহমান (৩৫), মাদারীপুরের শিবচরের হালান মোল্লা (৩৮), শাহাদাত হোসেন মোল্লা (২৯), বরিশালের তেদুরিয়ার আনোয়ার চৌকিদার (৫০), মাদারীপুর রায়েরকান্দির মাওলানা আবদুল আহাদ (৩০), চাঁদপুর জেলার উত্তর মতলবের মো. দেলোয়ার হোসেন (৪৫), নড়াইলের লোহাগড়ার রাজাপুরের জুবায়ের মোল্লা (৩৫), মুন্সীগঞ্জ সদরের সাগর শেখ (৪১), বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের সায়দুল হোসেন (২৭), রিয়াজ হোসেন (৩৩), ঢাকার পীরেরবাগের খেরশেদ আলম (৪৫), ঝালকাঠির নলসিটির এসএম নাসির উদ্দীন (৪৫), বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের মো. সাইফুল ইসলাম (৩৫), পিরোজপুরের চরখামার মো. বাপ্পি (২৮), পিরোজপুরের ভা-ারিয়ার জনি অধিকারী (২৬)। অন্য নিহত যাত্রী বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের মনির হোসেন জমাদ্দারের (৩৫) নাম নিশ্চিত হলেও পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

সন্ধ্যা ৭টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২৫ জনের লাশ শনাক্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের কার্যক্রম চলছিল। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারপ্রতি নগদ ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে। এ ঘটনায় মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক আজহারুল ইসলামকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, গতকাল ভোর সাড়ে ৬টার দিকে শিমুলিয়া থেকে ৩০ জন যাত্রী নিয়ে কান্দু মোল্লা ও জহিরুল ইসলামের মালিকানাধীন একটি স্পিডবোট বাংলাবাজারের উদ্দেশে রওনা দেয়। এর চালকের নাম শাহ আলম। নিহতদের সবার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রত্যেক যাত্রীকে লাইফ জ্যাকেট পরার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নিহত ২৬ জনের কারও পরিধানেই লাইফ জ্যাকেটও ছিল না।

৫ জন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করে স্থানীয়রা পাড়ে তুলতে সমর্থ হয়। খবর পেয়ে নৌপুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পরে সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। দুপুরের মধ্যেই শিশুসহ ২৬ জনের লাশ শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের দোতারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে রাখা হয়। নিহতদের লাশ শনাক্তে স্বজনরা দোতারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আসতে শুরু করে। এ সময় নিহত স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠে।

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর জালালউদ্দিন আহমেদ, বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম, মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন, পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেলসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন।

রেজিস্ট্রেশন নম্বর, নেভিগেশন আলোকবাতি, চালকদের ন্যূনতম প্রশিক্ষন সনদ নেই

নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে স্পিডবোট সার্ভিসটি একপ্রকার অন্যাচারে রূপ নিয়েছে। দ্রুতগতির এ নৌযানটির কোন রেজিস্ট্রেশন নম্বর নেই। নেভিগেশন আলোকবাতি নেই কোন স্পিডবোটে। চালকদের নেই ন্যূনতম প্রশিক্ষণ সনদ। রাতে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গভীর রাত পর্যন্ত চলে স্পিডবোট। করোনায় নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও শুরু থেকেই এ নৌযানটি নিয়মিতই চলছে।

বিশেষ করে শিমুলিয়া ঘাট থেকে প্রকাশ্যেই টিকিট কেটে চলছিল স্পিডবোটগুলো। শিমুলিয়া ঘাটের ইজারাদার আওয়ামী লীগ নেতা ইউপি চেয়ারম্যান মো. আশরাফ হোসেন ও বাংলাবাজার ঘাটের ইজারাদার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ইয়াকুব বেপারী।

দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া আদুরি বেগম বলেন, আমার মা মারা যাওয়ায় স্বামী ও মেয়েকে নিয়ে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা যাচ্ছিলাম। কিন্তু স্পিডবোট দুর্ঘটনা আমার সব কেড়ে নিল।

শিবচর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ইসমাইল হোসেন বলেন, শিমুলিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে আসার পরই চালক খুব বেপরোয়াভাবে স্পিডবোট চালাচ্ছিল। আমরা আস্তে চালাতে বললেও চালক শুনেনি। হঠাৎ করে বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনাটি ঘটে। দুর্ঘটনায় আমার ভাই মারা গেছে।

স্থানীয় আমিন মিয়া বলেন, শিমুলিয়া ঘাট থেকে কিছু অসাধু অদক্ষ চালক স্পিডবোট দিয়ে যাত্রী পারাপার অব্যাহত রেখেছে। চালকের অদক্ষতার কারণেই পাড়ে নোঙর করে রাখা বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এত বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।

ফায়ার সার্ভিসের মাদারীপুর ইউনিট প্রধান নজরুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করি।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, যে মৃতদেহগুলো উদ্ধার করা হয়েছে কোনটির পরনেই লাইফ জ্যাকেট ছিল না। সবার মাথায়ই আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দাবি

মাদারীপুরের শিবচরে কাঁঠালবাড়ী পুরাতন ঘাটে স্পিডবোট দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত ও ৫ জন আহত হওয়ার ঘটনায় দ্বায়িদের শাস্তি ও নিহত পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতি পূরণ প্রদানের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গতকাল এক বিবৃতিতে এই দাবি জানান সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত লকডাউনের মধ্যেও এত বেশি সংখ্যক যাত্রী নিয়ে স্পিডবোট চলাচলের জন্য ঘাট ইজারাদার, নৌ-পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিআইডাব্লিউটিএ ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর কেউ দ্বায় এড়াতে পারেন না। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর এই ঘাটে মনিটরিংয়ের দায়িত্বরত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ এনে হত্যা মামলা দায়ের করার দাবি জানান তিনি।

আমাদের দেশের নৌ-পথ দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, সরকার নৌ-পথের উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেও এ খাতে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতা, দায়িত্বে অবহেলাসহ নানা কারণে নৌ-পথের যাত্রীদের নিরাপত্তা বরাবরই উপেক্ষিত হচ্ছে। একদিকে লকডাউন ও অন্যদিকে কাল-বৈশাখীর এহেন দুর্যোগপূর্ণ ভরা মৌসুমে ০৮-১০ জন যাত্রী যাতায়াতের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি স্পিডবোটে লাইফ জ্যাকেট বিহীন ৩০-৩৫ জন যাত্রী নিয়ে যাতায়াত সারাদেশে নৌ-পথের এহেন অবহেলার চিত্র ফুটে উঠেছে। তাই নৌ-পথে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব অবহেলায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়েরের পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে নিহত প্রত্যেক পরিবারকে ১০ লাখ টাকা ও আহতদের ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানান তিনি।