menu

দ্রুত মারা যাচ্ছে আক্রান্তরা

টানা তিন দিন দৈনিক শতাধিক মৃত্যুর রেকর্ড

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১
image

দ্রুত মারা যাচ্ছেন করোনায় আক্রান্তরা। করোনার উপসর্গ নিয়ে দ্রুততম সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও মৃত্যু ঠেকাতে পারছেন না চিকিৎসকরা। গতকালও দেশে সর্বোচ্চ ১০২ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। এ নিয়ে দেশে টানা তিনদিন দৈনিক শতাধিক করোনা রোগীর মৃত্যু হলো।

গত বছরের সর্বোচ্চ সংক্রমণের তুলনায় চলতি এপ্রিলে দৈনিক ৫০ শতাংশ রোগী বেশি মারা গেছেন। করোনা আক্রান্ত রোগীরা মানসিক সমস্যায়ও ভুগছেন। সংক্রমণ ও মৃত্যু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। করোনায় মৃত্যুর চলমান ধারা আরও দুই সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।

আইইডিসিআরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, করোনায় মৃত্যুর চলমান গতি আরও দেড়-দুই সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর কমতে থাকবে। এখন যারা মারা যাচ্ছেন তারা ৫/৬ এপ্রিলের আগে সংক্রমিত হয়েছেন। এরপরই সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ হয়েছে। এসব রোগীর পরিস্থিতি এখন খারাপ হতে পারে। এতে মৃত্যুও বাড়তে পারে।

করোনা আক্রান্তদের স্বল্প সময়ের মধ্যে মৃত্যু হওয়ার কারণ সর্ম্পকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল গতকাল সংবাদকে বলেছেন, ‘দেশে এখন যে সংক্রমণ হচ্ছে, সেটা খুবই তেজস্বী। এটা সাউথ আফ্রিকান ভেরিয়্যান্ট হতে পারে, এটা খুব দ্রুত চরিত্র বদলাচ্ছে, মিউটেশন হচ্ছে। বিভিন্নভাবে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে দুর্বল করে দিচ্ছে, এর ফলে কেউ শ^াসকষ্টে, কেউ হার্টফেল করে, কেউ হার্ট অ্যাটাকে দ্রুত মারা যাচ্ছেন।’

এখন যারা করোনায় মারা যাচ্ছেন, তারা দুই-তিন সপ্তাহ আগেই সংক্রমিত হয়েছেন মনে করে এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, এরপর যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের ক্ষেত্রেও মৃত্যু একই গতিতে অব্যাহত থাকতে পারে। এ কারণে আগামী কিছুদিন এভাবেই হয়তো আরও মৃত্যু দেখতে হতে পারে বলে মনে করেন ডা. আবু জামিল ফয়সাল।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ে ১৭ এপ্রিল রাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) মৃত্যু পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির পাঁচ দিনের মধ্যে ৫২ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ রোগী উপসর্গ শুরুর পাঁচ থেকে দশ দিনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। ১২ শতাংশ রোগী ভর্তি হয় উপসর্গ শুরুর ১১ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে।

আইইডিসিআরের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬৩৮ জন, ১৫ এপ্রিলে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৯৪১ জনে। এ হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা ৩২ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে চলতি বছরের এপ্রিলে তার আগের বছরের সর্বোচ্চ হারের চেয়ে (৩০ জুন, ২০২০ মৃত্যুর সংখ্যা ৬৪ জন) প্রতিদিন ৫০ শতাংশ রোগী বেশি মৃত্যুবরণ করেছেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ২৮১, মার্চে ৬৩৮ জন এবং এপ্রিলে ৯৪১ জনের মৃত্যু হয় করোনায়। আর গত বছরের এপ্রিলে ১৬৩ জনের মৃত্যু হয়।

করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আইইডিসিআর বলেছে, গত ২৮ জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তির হার ছিল ৪৪ শতাংশ অর্থাৎ এ সময় করোনা আক্রান্ত রোগীদের প্রায় বড় অংশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বাকিরা প্রাতিষ্ঠানিক (৩৩ শতাংশ) বা হোম আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।

নারী ও পুরুষের তুলনামূলক মৃত্যুর পর্যালোচনায় সংস্থাটি বলেছে, গত বছরের জুলাই মাসে যখন করোনা সংশ্লিষ্ট মৃত্যুহার সর্বোচ্চ ছিল সে সময় নারী-পুরুষের মৃত্যুর (২২৬/৯৮২) অনুপাত ছিল ১ঃ৩.৫। এ বছরের এপ্রিলে দেখা গেছে নারী-পুরুষের মৃত্যুর (২৬৩/৬১৪) অনুপাত ১ঃ২.২৩। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে নারী অধিক হারে মৃত্যুবরণ করেছেন।

মানসিক সমস্যায় ভুগছেন আক্রান্তরা

করোনা সংক্রমণের আতঙ্ক, চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা, মৃত্যুভয়, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বেকারত্বের কারণে করোনা আক্রান্তদের মানসিক সমস্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জরিপের ফলাফল তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ২০১৮ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে ছয় দশমিক সাত শতাংশের মধ্যে বিষণœতা এবং চার দশমিক সাত শতাংশ মানুষ ভুগেছেন দুশ্চিন্তায়।

কোভিড-১৯ মহামারীর সময় বাংলাদেশে পরিচালিত কয়েকটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশের মধ্যে বিষণœতা ও ৩৩ শতাংশের মধ্যে দুশ্চিন্তার লক্ষণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর।

তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ চিকিৎসায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীরা চাপ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু

গতকাল বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনা সংক্রমণে একদিনে রেকর্ড ১০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে টানা তিনদিন দৈনিক শতাধিক মানুষের মৃত্যু হলো। এর আগের দু’দিন ১০১ জন রোগী মারা গেছেন। গত একদিনে ১০২ জন নিয়ে দেশে মোট ১০ হাজার ৩৮৫ জনের মৃত্যু হলো।

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা শনাক্তের পর ৩০ জুন একদিনে সর্বোচ্চ ৬৪ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। আর গত মার্চের শুরুতেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। এরপর গত ৩১ মার্চ ৫২ জনের মৃত্যুর তথ্য দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে দৈনিক মৃত্যু ৫০ এর নিচে নামেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে তিন হাজার ৬৯৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশে করোনা আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়ালো সাত লাখ ১৮ হাজার ৯৫০ জনে।

সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ে গত বছরের ২ জুলাই একদিনে সর্বোচ্চ চার হাজার ১৯ জনের করোনা শনাক্ত করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

আর সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে গত কয়েক দিন ধরেই দিনে ছয় হাজারের বেশি মানুষের করোনা শনাক্ত হয়ে আসছিল। এর মধ্যে গত ৭ এপ্রিল রেকর্ড সাত হাজার ৬২৬ জনের করোনা শনাক্তের তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ছয় হাজার ১২১ জন। এ নিয়ে মোট সুস্থ রোগীর সংখ্যা দাঁড়ালো ছয় লাখ ১৪ হাজার ৯৩৬ জনে।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বিশ্বে করোনা শনাক্তে ৩৩তম স্থানে এবং মৃত্যুর সংখ্যায় ৩৮তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে দেশে ২৫৭টি ল্যাবে (পরীক্ষাগার) ১৯ হাজার ৪০৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ নিয়ে মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৫১ লাখ ৭০ হাজার ৬৭টি।

গত একদিনে নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ছিল ১৯ দশমিক ০৬ শতাংশ, এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর শনাক্ত বিবেচনায় মোট সুস্থতার হার ৮৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১০২ জনের মধ্যে ৫৯ জন পুরুষ এবং ৪৩ জন নারী। তাদের ৯৭ জন হাসপাতালে এবং পাঁচজন বাড়িতে মারা গেছেন। এর মধ্যে ৬৩ জনের বয়স ৬০ বছরের বেশি, ২৩ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছর, ১৪ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছর এবং দুইজনের বয়স ছিল ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে।

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মারা যাওয়া লোকজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগের ৬৮ জন। এছাড়া ২২ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, তিনজন রাজশাহী বিভাগের, একজন খুলনা বিভাগের এবং চারজন করে বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

মোট মারা যাওয়া ১০ হাজার ৩৮৫ জনের মধ্যে সাত হাজার ৬৯৪ জন পুরুষ এবং দুই হাজার ৬৯১ জন নারী।