menu

বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫ শ্রমিক নিহত

দুই মামলায় সাড়ে তিন হাজার আসামি

বিক্ষোভ অব্যাহত বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি সুজনের

সংবাদ :
  • চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • ঢাকা , সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারায় এস আলমের মালিকানাধীন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে পাঁচজন নিহতের ঘটনায় শ্রমিকদের নামে দুইটি মামলা দায়ের হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ একটি আর পুলিশ অন্য মামলাটি করে। দুই মামলায় ২২ জনের নাম উল্লেখসহ অন্তত অজ্ঞাত সাড়ে ৩ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল ভোরে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানায় এ মামলাগুলো দায়ের করা হয়। থানার এক এসআই বাদী হয়ে পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা, হামলার অভিযোগ দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাত আড়াই হাজার জনকে আসামি করা হয়। অন্যদিকে এসএস পাওয়াপ্ল্যান্টের চিফ কো-অর্ডিনেটর ফারুক আহমেদ ২২ জনের নাম উল্লেখ করে আজ্ঞাত আরও ১ হাজার ৫০ জনকে আসামি করে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরের একটি মামলা করেন। বাঁশখালী থানার ওসি শফিউল কবীর বলেন, মামলা হয়েছে। এখন তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষে নিহত ৫ জনের ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল বিকেল পৌনে ৪টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়।

এর আগে গত ১৭ এপ্রিল সকাল থেকে ১২ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ডাকে বিদ্যুৎ নির্মাণ কর্তৃপক্ষ। আন্দোলন বেলা পৌনে ১২টার দিকে উত্তপ্ত হয়ে উঠে যখন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের জোর করে দমাতে যায়। এরপরই শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে পুলিশের ওপর হামলা করলে পুলিশও তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন ও চমেক হাসপাতালে একজন নিহত হয়। আহত হয় অন্তত আরও ১৭ জন। এছাড়া আহত হয় তিন পুলিশ সদস্যও। ওইদিন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার সদস্যের এবং পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। জেলা প্রশাসনের কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে এবং পুলিশের তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, শ্রমিকদের আন্দোলন ও হামলার ঘটনার জন্য স্থানীয়রা ২০১৬ সালের আন্দোলনের হোতা গণ্ডমারার চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা লিয়াকত আলীর ইন্ধন থাকার কথা বললেও তাকে আসামি করা হবে কিনা তার জন্য রাতভর দফায় দফায় বৈঠক করেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি পুলিশ। অবশেষে ভোর রাতে তাকে বাদ দিয়েই এই মামলা দুটি করে। শ্রমিক নিহত ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গত শনিবার থেকে এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ রয়েছে। চীনা নাগরিকরা নিরাপদে রয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে বলেও জানান ওসি।

এদিকে পাওয়ার প্ল্যান্টের বকেয়া বেতন-ভাতাসহ ৪ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর বর্বরোচিত পুলিশি হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে গতকাল বিকেল ৫টায় চেরাগি পাহাড় চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম জেলা।

বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি রিপায়ন বড়ুয়ার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সহ-সভাপতি শ্যামল লোধ, সহকারী সাধারণ সম্পাদক জাবেদ চৌধুরী, রুপন কান্তি ধর, সাংগঠনিক সম্পাদক রাশিদুল সামির, টুটন দাশ, বিপ্লব দাশ, জুয়েল বড়ুয়া, মিঠুন বিশ্বাস, রবি শংকর সেন প্রমুখ বক্তারা বলেন, এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার লিমিটেড চীনের দুটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহযোগিতায় গণ্ডামারা ইউনিয়নে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে। এখানে শ্রমিক সরবরাহ করে তৃতীয় একটি কোম্পানি। এ কোম্পানি শ্রমিকদের দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা নিয়ে অনিয়ম করছে। গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে বকেয়া বেতন পরিশোধ, বেতন বাড়ানো, শুক্রবারে জুমার দিন হওয়ায় এক বেলা কাজ করাসহ ৪ দফা দাবিতে শ্রমিকরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তর্কাতর্কি হয়। সে সময় কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দেয়। এ করোনা মহামারীর মধ্যেই আনোদলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশ শ্রমিকদের নিপীড়নে নেমে পড়ে। পুলিশের গুলিতে ৫ জন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছে। শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশের এই বর্বরোচিত হামলা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

বাঁশখালীর শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত চায় সুজন

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক জানায়, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ৫ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। একই সঙ্গে অবিলম্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল সুজনের সভাপতি এম. হাফিজউদ্দিন খান ও সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট নামে নির্মাণাধীন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে মার্চ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ, প্রতি মাসের বেতন ৫ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে প্রদান, পবিত্র রমজান মাসে কর্মঘণ্টা ৯ থেকে কমিয়ে ৬ ঘণ্টা করা, ইফতার ও সেহেরির সময় কর্মবিরতিসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছিলেন। এ বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে পাঁচ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। যা হত্যাকাণ্ডেরই নামান্তর। সংঘর্ষের ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। একইসঙ্গে আহতদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ নিহতদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছি।

সুজন মনে করে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ না করায় অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে, যার দায় মালিকপক্ষ কোনভাবেই এড়াতে পারে না। এর আগে ২০১৬ সালে ওই এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিবাদে এলাকাবাসী বিক্ষোভ করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। আমরা যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি, তখন স্বাধীন দেশের অসহায় শ্রমিকদের নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তাই এ ঘটনা বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা দরকার।

নিহতদের পরিবারের জন্য ৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে নোটিশ

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক ও পুলিশের সংঘর্ষে নিহত পাঁচজনের পরিবারকে তিন কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ এবং এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। গতকাল মানবাধিবার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দা নাসরিন এই নোটিশ পাঠান।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ১৮ জনকে এ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে ৭ দিনের মধ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় প্রতিকার চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আইনজীবী সৈয়দা নাসরিন লিগ্যাল নোটিশের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নোটিশে পুলিশের গুলিতে নিহত প্রত্যেক পরিবারকে তিন কোটি টাকা ও আহত প্রত্যেকের পরিবারকে দুই কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া নিহত এবং আহত শ্রমিকদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও ক্ষতিপূরণ দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না গ্রহণ করলে এর প্রতিকার চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করা হবে।