menu

ঈদে বাড়ি ফেরায় সংক্রমণের চরম ঝুঁকি

মৃত্যু ও শনাক্ত এখন সর্বোচ্চ

সংবাদ :
  • রাকিব উদ্দিন
  • ঢাকা , মঙ্গলবার, ২০ জুলাই ২০২১
image

গত ঈদুল ফিতরের ছুটিতে গ্রামমুখী মানুষের বেপরোয়া আচরণের কারণেই করোনা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, দেশব্যাপী করোনার সামাজিক সংক্রমণ ঘটছে। এর ফলে ঈদুল আজহা উদযাপনের আগ মুহূর্তে দেশে সংক্রমণ হার ৩০ শতাংশের কাছাকাছি।

এই পরিস্থিতিতে সংক্রমণের চরম ঝুঁকি ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করেই দলবেঁধে রাজধানী ছাড়ছেন মানুষ। পশুর হাটেও ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না ক্রেতা-বিক্রেতারা। এই কার্যক্রমে প্রশাসনের নজরদারিও ঢিলেঢালা। করোনায় মৃত্যু ও শনাক্তও এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

এই উদ্বেগজনক অবস্থায় ঈদের তিনদিনের সাধারণ ছুটির আগে গতকাল শেষ সরকারি কর্মদিবস ছিল। এদিন দেশে নমুনা পরীক্ষা অনুপাতে সংক্রমণের হার ছিল সাড়ে ২৯ শতাংশের ওপরে। ঈদের দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর সংক্রমণ হার কোথায় পৌঁছে সে সর্ম্পকে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।

গত ঈদুল ফিতরের সাধারণ ছুটি ছিল ১৩ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত। ওই সময় সংক্রমণের হার ছিল ৮ থেকে ৯ শতাংশের কাছাকাছি। সংক্রমণের এই হার ঠেকাতেই ঈদের ছুটিতে দেশে গণপরিবহন বন্ধ রাখে সরকার।

কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি বিধিনিষেধ বা ‘লকডাউন’ উপেক্ষা করেই গ্রামমুখী হয় বিপুল সংখ্যক মানুষ। এতে ঈদ যাত্রা ও ফিরতি যাত্রার দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর করোনার ব্যাপক বিস্তারের আশঙ্কা প্রকাশ করেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। এখন তাদের আশঙ্কারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

পশুর হাটে মানুষের ভিড় ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে মানুষের গ্রামে ফেরার প্রবণতায় সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে কিনা জানতে চাইলে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএমএম আলমগীর সংবাদকে বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন আরও খারাপের দিকেই যাচ্ছে। দুই সপ্তাহের ‘লকডাউন’ শেষে সংক্রমণ একটা স্থিতিশীল অবস্থানে এসেছিল... সংক্রমণ হার ২৭, ২৮ ও ২৯ শতাংশের মধ্যে ছিল। কিন্তু মানুষের বেপরোয়া আচরণের কারণে সংক্রমণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে।’

স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করার কারণে ঈদের সাত থেকে দশ দিন পর সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করে ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, ‘এখনই দৈনিক ১২-১৩ হাজারের মতো রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সংক্রমণ হারও ২৯ শতাংশের ওপরে, আমাদের মতো দেশের জন্য এটি খুবই খারাপ অবস্থা। কিন্তু মানুষের বেপরোয়া আচরণের কারণে আমরা সবাই বিপদে পড়তে যাচ্ছি।’

ঢাকায় করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে চারপাশের সাত জেলায় গত ২২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘লকডাউন’ আরোপ করা হয়। এরপর ১ জুলাই থেকে দেশব্যাপী শুরু হয় ‘কঠোর লকডাউন’। তবে ঈদ উপলক্ষে সাত দিনের জন্য ‘লকডাউন’ শিথিল করেছে সরকার। এরপর ২৩ জুলাই থেকে পুনরায় ‘লকডাউন’-এর ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত কোভিড-১৯ বিষয়ক ‘জাতীয় কারিগরি কমিটি’র সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল গতকাল সংবাদকে বলেছেন, ‘আমরা খুবই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে আছি। মানুষ যেভাবে গ্রামে যাচ্ছে, পশুর হাটে ঘুরছেন... কেউই ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা করছেন না। এর ফলে ঈদের কিছুদিন পর সংক্রমণ আরও বাড়বে, মৃত্যুও বাড়বে। সংক্রমণ এখনই ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে, এটি আরও বাড়লে কী যে অবস্থা হয়, বলা মুশকিল।’

ঈদ যাত্রায় মানুষের ¯্রােত ঠেকাতে ঈদ শেষে রাত থেকে ‘কারফিউ’ জারির পরামর্শ দিয়ে বিশিষ্ট এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘অনেকেই শহর থেকে সংক্রমণ নিয়ে গ্রামে যাচ্ছেন, সেখানে সংক্রমণ ছড়াচ্ছেন, গ্রামেও লোকজন সংক্রমণ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঈদ যাত্রায় এই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। এখন একটাই উপায় আছে, সেটি হলো মানুষকে গ্রামে আটকে ফেলা। এজন্য ঈদের দিন শেষে রাতেই কারফিউ জারি করতে হবে।’ গত ঈদের দুই সপ্তাহ পর ৩০ জুন দেশে সংক্রমণের হার ছিল ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। এরপর গত ১৫ জুন সংক্রমণের হার ছিল ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ ও পরদিন এই হার ছিল ১৬ দশমিক ৬২ শতাংশ।

দেশের প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয় গত বছরের ৮ মার্চ। এরপর ১৭ মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত টানা সাধারণ ছুটি চলে। এই ছুটির মধ্যে গত বছরের ২৫ মে ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় মানুষের মধ্যে রাজধানী ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা খুব একটা দেখা যায়নি। স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে সরকারও ছিল কঠোর অবস্থানে। এ কারণে ঈদের পরও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ছিল।

এরপর গত বছরের ১ আগস্ট ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হয়। ওই ঈদের ছুটিতেও মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা ছিল। সংক্রমণের বিস্তার রোধে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তৎপরতাও ছিল উল্লেখ করার মতো। এ কারণে সংক্রমণ বৃদ্ধির সুযোগ হয়নি।

তবে এ বছর ঈদুল ফিতরের সময় মানুষের গ্রামমুখী প্রবণতা ঠেকাতে প্রশাসনের বিধিনিষেধ বলবৎ থাকলেও এর জোরালো বাস্তবায়ন দেখতে পাননি জনস্বাস্থ্যবিদরা। ওই সময় মানুষের মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।

ঈদের ছুটির আগের দিন মৃত্যুর রেকর্ড

দেশের করোনা সংক্রমণ শুরুর পর সবচেয়ে খারাপ দিন ছিল গতকাল। এদিন সর্বোচ্চ প্রাণহানি দেখলো বাংলাদেশ। গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা অর্থাৎ একদিনে রেকর্ড ২৩১ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এর আগে গত ১১ জুলাই ২৩০ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকালের আগে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু ২৩০ জনই ছিল।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো করোনাভাইরাস সম্পর্কিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া লোকজনকে নিয়ে দেশে করোনায় মৃত্যু ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেল। করোনা আক্রান্তদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মারা গেলেন ১৮ হাজার ১২৫ জন।

একদিনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা

রেকর্ড মৃত্যুর দিনে একদিনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রোগীও শনাক্ত হয়েছে। এদিন ১৩ হাজার ৩২১ জনের দেহে করোনার জীবাণু পাওয়া গেছে। তাদের নিয়ে দেশে করোনা শনাক্তের মোট সংখ্যা দাঁড়ালো ১১ লাখ ১৭ হাজার ৩১০ জনে।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৪৫ হাজার ১২টি। দেশে এখন পর্যন্ত মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৭৩ লাখ ৩৯৯টি। এই ২৪ ঘণ্টায় করোনা রোগী শনাক্তের হার ২৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর এখন পর্যন্ত শনাক্তের হার ১৫ দশমিক ৩০ শতাংশ।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্তদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন নয় হাজার ৩৩৫ জন। তাদের নিয়ে দেশে করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন নয় লাখ ৪১ হাজার ৩৪৩ জন। মোট শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৮৪ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুহার এক দশমিক ৬২ শতাংশ।

গত একদিনে করোনায় মারা যাওয়া ২৩১ জনের মধ্যে পুরুষ ১৩৬ জন এবং নারী ৯৫ জন। করোনায় মোট মৃত্যু হওয়া লোকজনের মধ্যে পুরুষ ১২ হাজার ৫৫০ জন এবং নারী ছিলেন পাঁচ হাজার ৫৭৫ জন।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একদিনে মারা যাওয়া ২৩১ জনের মধ্যে চারজনের বয়স ছিল ৯১ থেকে ১০০ বয়সের মধ্যে। অন্যদের মধ্যে ৮১ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে ১৭ জন, ৭১ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে ৪৪ জন, ৬১ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে ৭৪ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৪৩ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ৩৩ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে নয়জন, ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছয়জন এবং একজনের বয়স ছিল ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে।

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হওয়া লোকজনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৭৩ জন, চট্টগ্রামে ৪৩ জন, রাজশাহীতে ১৬ জন, খুলনায় ৫৭ জন, বরিশালে ছয়জন, সিলেটে আটজন, রংপুরে ১৭ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ১৬৭ জন, বেসরকারি হাসপাতালে ৪৬ জন ও বাড়িতে মারা গেছেন ১৮ জন।

একদিনে ঢাকা বিভাগেই সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোগী

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ২০ হাজার ৮৬৯টি নমুনা পরীক্ষায় ছয় হাজার ৫৪০ জনের দেহে করোনার জীবাণু পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মহানগরসহ ঢাকা জেলায় ১৫ হাজার ৯৪৯টি নমুনা পরীক্ষায় চার হাজার ৮৩৪ জনের সংক্রমণ পাওয়া গেছে।

অন্য বিভাগের মধ্যে ময়মনসিংহে এক হাজার ৯০৪টি নমুনা পরীক্ষায় ৪৭২ জনের সংক্রমণ শনাক্ত, চট্টগ্রামে ছয় হাজার ৫৫৯টি নমুনা পরীক্ষায় দুই হাজার ২৮৮ জনের করোনা শনাক্ত, রাজশাহীতে চার হাজার ৪৮৭টি নমুনা পরীক্ষায় ৮৮৭ জনের দেহে করোনা শনাক্ত, রংপুরে দুই হাজার ২১৩টি নমুনা পরীক্ষায় ৫৯২ জন রোগী শনাক্ত, খুলনায় চার হাজার ৬৩২টি নমুনা পরীক্ষায় এক হাজার ১৬৫ জনের জীবাণু শনাক্ত, বরিশালে দুই হাজার ৯৯২টি নমুনা পরীক্ষায় ৮৯১ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত এবং সিলেট বিভাগে এক হাজার ৩৫৬টি নমুনা পরীক্ষায় ৪৮৬ জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ পাওয়া গেছে।