menu

শঙ্খ ঘোষের গদ্য : মর্মজয়ী মাধুর্য

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল ২০২১
image

মাত্র ৫ মাস আগে-পরে চলে গেলেন পঞ্চাশের দশকের বাংলা কবিতার দুই খ্যাতিমান কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (বাঁয়ে) ও শঙ্খ ঘোষ

গদ্য হলো জীবন-যাপনের ভাষা। সহজ মানুষ যে সরল ধারার জীবনে অভ্যস্ত, গদ্য হচ্ছে তারই অনূদিত ভাষ্য। গদ্য একদিকে জীবনের আখ্যান আর অন্যদিকে যাপনের ধারাবিবরণী। তাই গদ্য যত সহজ ততই হৃদয়গ্রাহী। গদ্যে কেতাদূরস্ত ভাবের আমদানি মানেই মাটির কাছ হতে তাকে দূরে টেনে নেওয়া। যে গদ্য মাটির যত কাছাকাছি সে গদ্য ততবেশি প্রাণবান। গদ্যকে প্যাঁচানো মানেই তাতে ভাবের জট লাগানো। সেই জট খুলতে গেলে ভাবকে কেটে খর্ব করে ফেলতে হয়। তাতে ভাব সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয় না। আধুনিক গদ্য শব্দের প্রয়োগের চেয়ে বাক্য নির্মাণ কৌশলের প্রতি চোখ রাঙায়। আধুনিক গদ্য কোমল নয়, তবে অতি কঠিনও নয়। গদ্যের ভাষা নির্ভর করে ব্যক্তির ওপরে নয়, লেখার বিষয়ের ওপরে। যদিও কোনো কোনো গদ্যশিল্পীর নাম সামনে এলে তাদের গদ্যের ধরনও প্রকাশিত হয়। এরকম গদ্যশিল্পীর মধ্যে বঙ্কিমীয় গদ্যের ধরন আজও বিখ্যাত হয়ে আছে। একে তো সাধু ভাষার ব্যবহার তার ওপর শব্দ প্রয়োগে অতিরিক্ত সমৃদ্ধির কারণে বঙ্কিমীয় গদ্য হয়ে ওঠে অধিকাংশের জন্যেই দুষ্পাচ্য। ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র কমলকুমার বাংলা গদ্যকে এমন জটিলাবর্তে নির্মাণ করেছেন, সাধারণ বাঙালিকে তার পেছন পেছন ছুটতে হলে গদ্যের সন্ধানে খোল-নলচেই পাল্টে যাবে জীবনের।

গদ্যকে অধিক পাঠযোগ্য করার জন্যে সাধারণ পাঠকের কাছেই রাখা চাই। অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গদ্য ছিল আপামর মানুষের জন্যে। তাই যতটুকু মধ্যবিত্তের আবেগমথিত কাহিনীর জোরে, তার চেয়ে অধিক সরল ভাষ্যের কারণেই গৃহিণীদের ভাতঘুমে তিনি নিত্য চর্চিত হতেন। গদ্যকে নিয়ে এতো বিচলিত হয়ে ওঠার মুখ্য কারণ ইদানীং কারও কারও মতে কবিদের গদ্য ম্যাড়মেড়ে। তাও অনেকটা কবিতার ফ্লেভারেই ভরা। বিশেষত সদ্য প্রয়াত কবি শঙ্খঘোষের গদ্য নিয়ে অনেকেরই ব্যক্তিগত অভিমত, তাঁর গদ্য অতি কোমল, কঠিন নয়। ঘুরিয়ে বললে, বলতেই হয়, তাদের মতে, শঙ্খ ঘোষের গদ্য মানসম্পন্ন গদ্যের পর্যায়ে পড়ে না। এবং তাঁর গদ্যকে পুরোহিত ধরে যারা গদ্য চর্চা করতে গিয়েছেন তাদের সবার গদ্যের হাত নাকি নষ্ট হয়ে গেছে। কবি শঙ্খ ঘোষের গদ্য নিয়ে এরকম ঢালাও মন্তব্য করার কারণে আমাদের সেই গদ্যের প্রতি পেছন ফিরে তাকানোর উপলক্ষ তৈরি হয়েছে বৈকি। শঙ্খ ঘোষ কবি হলেও তাঁর গদ্যে কবিতার লালিত্য কিংবা লাজুকতা ফুটে ওঠেনি বরং গদ্যের আলাপচারিতাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। ব্যক্তি হিসেবে তাত্ত্বিক বিষয়ের অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষ তাঁর গদ্যকে তত্ত্বের কপচানিমুখর করে তোলেননি, তিনি গদ্যের সতত প্রবহমান পাহাড়ি

ছড়ার গতি তৈরি করেছেন।

গদ্যকে পাঠকের পাতে পরিবেশনকালে তিনি বিভিন্ন বয়সী, বিভিন্ন শ্রেণির পাঠকের কথা ভেবেছেন। তিনি একদিকে পাঠককে দীক্ষিত করে তুলেছেন তাঁর গদ্যভাষায় আর অন্যদিকে শিশুমনের মনস্তত্ত্বের বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। একাডেমিক বইগুলোতে তিনি যে সরস ভাষ্যে বিষয়বস্তুকে তুলে ধরেছেন তা শিক্ষার্থীর মনে গভীর রেখাপাত করে সহজেই। তিনি তাঁর গদ্যের লাগাম শক্ত হাতে ধরতে পেরেছিলেন। ফলে গদ্য বেচাল চালে চলেনি, বেতালও হয়ে ওঠেনি। তিনি যা বলতে চেয়েছেন, তাঁর গদ্য খুব সহজেই তা বলতে পেরেছে।

শিশুদের নিয়ে লেখা তিনটি উপন্যাসের সিক্যুলিতে তাঁর গদ্যভাষা ছিল শিশুতোষ। যে কোন কিশোর যাতে তরতর করে এগিয়ে যেতে পারে আখ্যানের ভেতরে, সেই চেষ্টাই মুখ্য ছিলো। নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করার দিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ ছিল না। সকালবেলার আলো, সুপুরিবনের সারি এবং শহর পথের ধুলো নামের উপন্যাসত্রয়ে দেশবিভাগের বেদনাকে একটা কিশোরের কোমল জীবনবেদ দিয়ে তিনি যেভাবে অবিচলিত মমতায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তাতে কবি নয়, গদ্যশিল্পীই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো কিশোরমনকে আঁকতে গিয়ে কখনো কখনো কবিতাকে বাহন করেছেন, কিন্তু তাতে তাঁর ঝরঝরে টানা গদ্যের মহিমা এতটুকু ম্লান হয়ে যায় না।

‘ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা’ শীর্ষক একটি বলিষ্ঠ প্রতিবাদী নিবন্ধ তিনি রচনা করেন যাতে কবির কোমলতা নয়, ফুটে উঠেছে বেদনার্ত মানুষের কষ্টের প্রতিধ্বনি। সাম্প্রদায়িকতাকে আঘাত করে কবি শঙ্খ ঘোষ গুজরাটের দহনে সেই নিবন্ধে লিখেছেন,

“গুজরাট জ্বলছে। আমরা জানি, গুজরাটের মানুষদের সঙ্গে সঙ্গে সে-আগুন নেভাবার দায়িত্ব আজ আমাদেরও; এই রাজ্যের মানুষদেরও। কিন্তু এই নেভানো বলতে কী বুঝব আমরা? কতদূর বুঝব?’

‘ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগ’ তাঁর আত্মজৈবনিক টুকরো গদ্য। কলেজের রেলিঙের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন একদিন তাঁরই আরাধ্য বুদ্ধদেব। দূর হতে আরাধ্য মানস-দেবতাকে প্রত্যক্ষণ করে শঙ্খ ঘোষ দাঁড়িয়েছিলেন স্থানু হয়ে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওয়ার ঢংয়ে তিনি বলছেন,

“প্রেসিডেন্সি কলেজের সামনের রেলিংগুলি তখনও ঢাকা পড়ে যায়নি। কিছু বই দাঁড় করানো থাকে রেলিং ঘেঁষে, কিছু বই নিচে নামানো, আর পুরোনো বইয়ের ব্যাপারিরা প্রতীক্ষা করে থাকে কোনো-কোনো চেনামুখের জন্য। ওয়াই এমসি-এর পাশ দিয়ে কলেজের দিকে হেঁটে আসছি একদিন সেই বইয়ের সারি পেরিয়ে, ১৯৫১ সালের মাঝামাঝি এক সকালবেলায়। না, সকাল ঠিক নয়, এগারোটা বাজতে আর বাকি নেই বড়ো। এগোতে এগোতে হঠাৎ দেখি, এ কী! কলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন উনি কে? উনি তো বুদ্ধদেব বসু! এখানে বুদ্ধদেব? কী করছেন উনি এখানে? আমি আর এগোতে পারি না। কোনো-একখানা বই দেখবার ছল করে থেমে যাই সেইখানেই। আর দেখতে থাকি বুদ্ধদেব বসুর সেই দাঁড়িয়ে-থাকাটুকু।...

আশ্চর্য, চিনতে পারছে না ওঁকে কেউ? বুদ্ধদেব বসুকে?’...

কবির লেখা গদ্য হলেও শঙ্খ ঘোষের গদ্যের যে মর্মজয়ী ভাষ্য তাতে পাঠকের বোধ আলোড়িত হয়, পাঠক একাত্ম হয়ে যেতে পারেন অধীত বিষয়ের সাথে। বর্ণিত বিষয়কে সুরুচিবান পাঠকের মননপাত্রে সুপাচ্য করে পরিবেশনের দক্ষতা শঙ্খ ঘোষের আছে বলেই ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ পেয়েছে পাঠকপ্রিয়তা। ‘ছন্দের বারান্দা’তে শঙ্খ ঘোষ নিজে হেঁটেছেন, হাঁটিয়েছেন পাঠক-সমাজকে। সম্পূর্ণ উচ্চমার্গের করণকৌশল বিশ্লেষণে তিনি যেভাবে একের পর এক আলোচনার দল মেলেছেন তাতে গদ্য হয়ে উঠেছে আগ্রহী পাঠকের সরোবরের নীর আর তৃষ্ণার্ত পাঠক তাতে অবগাহন করেছেন জানার ক্ষুধার উপশমে। কখনো তাতে মনে হয়নি, কোন এক কবি কথা বলছেন। বরং বার বার মনে হয়েছে কুশলী কথক তাঁর কথার ঝাঁপি খুলে বসেছেন আর একের পর এক তন্ময়তায় তিনি পাঠককে পায়চারী করিয়েছেন বারান্দাজুড়ে। পাঠশেষে সাধারণ পাঠক হয়ে ওঠেন বোদ্ধা কিন্তু বোঝার ভারে টলমলে হয়ে পড়েন না।

‘ইছামতীর মশা’ শঙ্খ ঘোষের ভ্রমণগদ্য হলেও রম্যরস তাতে ছলকে পড়েছে। তিনি যে সহজ কৌশল নিয়ে চলন্ত ট্রেনের ভেতরের হই-হুল্লোড় আর পোহানো ভোগান্তি ফুটিয়ে তুলেছেন তাতে পাঠককে গদ্যের প্যাঁচ খুলতে গিয়ে প্রাণান্ত হতে হয় নি। রিজারভেশনকৃত রেলের কম্পার্টমেন্টে লাজশরমহীন অভব্য যাত্রীদের যে অত্যাচার তা ‘ইছামতীর মশা’ নামের গদ্যে ধ্রুপদী হয়ে পরিস্ফুটিত হয়েছে। নিজের পয়সায় কেনা চারটে সিট ছেড়ে দিয়ে চারজনের পরিবারকে একসময় অভব্য রেলযাত্রীদের চাপে কোণঠাসা হয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করার যে রসময় বর্ননা জীবন্ত হয়েছে তাতে ভিন্নতর গদ্যের অবতারণা হতে দেখি। এ গদ্যে অনুযোগ নেই কিন্তু যাত্রাপথের বিড়ম্বনাকে মেনে নেওয়ার স্বাভাবিকতা তৈরি হতে থাকে যা ভারতবর্ষের রেলযাত্রায় নিত্যকালের ঘটনা।

সুকান্ত গদ্যের যে কড়া হাতুড়িকে হানতে বলেছেন তা আপামর মানুষের গদ্য নয়, তা বামপন্থী হাতুড়ির সংঘাত। গদ্য হলেই তাতে পদলালিত্য থাকতে নেই- একথা সর্বৈব সত্য নয়। কবির পদ্য পায়েসের মতো নরম হবে এটা যেমন অর্থহীন কথা তেমনি গদ্যশিল্পীর গদ্য মুগুরের মতো কঠিন হবে তা-ও সর্বদা অভিপ্রেত নয়। প্রাবন্ধিকের গদ্যে যে জটিলাবর্ত কিংবা কলামিস্টের গদ্যে যে চটুলতা, তা শিক্ষকের গদ্যে আশাকরাটা বোকামি। শিক্ষকের গদ্যে পেলবতা যেমন থাকে, তেমনি থাকে ভারে চলার শ্লথ গতি। কবিতার শিল্পমান নয়, এ গদ্যে থাকে সামাজিক চলমানতার সৌকর্য আর দিন-যাপনের ধারাবাহিকতা।

নিজের গদ্য নিয়ে শঙ্খ ঘোষ নিজে তাই মুখ খুলেছেন কলমে। শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন : ‘গদ্যে নিজের বিষয়ে লিখতে ভয় হয়, গদ্য এত সরাসরি কথা বলে, এত জানিয়ে দেয়। কেবলই মনে হয় প্রকাশ্য করে এসব বলবার সময় নয় এখন। হাত থেকে কেবলই খসে যায় কলম, যে-কথাটুকু বলবার ছিল সেটুকুও ধরতে পারি না ঠিকমতো।’ যেটুকু বলার তা বলতে না পারার আক্ষেপ শঙ্খ ঘোষের গদ্যকে দিয়েছে মর্মজয়ের শক্তি, দিয়েছে অতৃপ্তির মাধুর্য। দিনশেষে কবির গদ্য নয়, গদ্যশিল্পী শঙ্খ ঘোষই স্বতন্ত্র ভাষ্যে জলকেলি করেন পাঠকের মনের সরোবরে।