menu

ডাকঘর ডাকে, আমিই অমল

ভাগ্যধন বড়ুয়া

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ মে ২০২১
image

মন্ত্র বা মন্ত্রণা দিয়ে হয়তো যন্ত্র চলতে পারে কিন্তু পুঁথির ধারামতো মন তো চলে না; কাশবনে ঢেউ তোলা, সূর্যাস্তে রংখেলা, প্রিয়জনের নজরলাগা টান কি শাস্ত্রমতো চলে?

শরতের রৌদ্র আর মৃদু সমীরণ কেবল বাহিরে ডাকে; নিয়ে যায় দূর প্রান্তে- পৃথিবীর পথে পথে, তৃণ ঘাসে যেখানে বারো মাসে তেরো পার্বণ আর কানে বাজে সারাক্ষণ ঘুমপাড়ানিয়া গান; ঘুম যারে দুধের বাছা... আয় আয় চাঁদ মামা। উঠোনে নিয়ে যাও, উঠোনে যেতে চাই, ভরা উঠোন যেখানে কাঠবিড়ালি রোদ হয়ে দৌড়ে প্রান্ত থেকে সীমান্তে...

বোবা আকাশ হাতছানি দেয় বুকের ভাষা বোঝাতে; যাদের মনে শব্দ-সুর অনুনাদ তোলে তারা শুধু বুঝে শিলাপাহাড়ের গান, জোনাকির কান্না আর যারা পুঁথি নিয়ে পড়ে থাকে দিনে রাতে তাদের কোনো খবর নেই আলোয় ভরা দুপুরের ধারাভাষ্য... তাদের কথা বাদই দিলাম।

কাজ খুঁজতে খুঁজতে বহুদূর যেতে হয়, কেউ পাহাড়ের চূঁড়ায়, কেউ সমুদ্রের পাড়ে, কেউ বা খাল-বিল-ঢালুপথ- উপত্যকা পার হয়ে আরো দূরে অজানায়... তারপর আর ফেরে না। সেখানে ঝরনার জলে পা ভেজায়, জলের ঢেউ দেখে; ছলছল কলকল ঢেউ, কেন্দ্র থেকে পরিধি বরাবর ঢেউ, সরে যায় দূরে যায়, পাড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়...। কোনো কোনো প্রিয়জন যেমন চোখের সন্মুখ থেকে চিরদিনের জন্য দূরে হারিয়ে যায় ডুমুরের ছায়ায়...

আমি তো যেতে চাই দিগন্তে, চেয়ে থাকি চাতক চোখে, কৃষ্ণচূড়া ডাকে চৌম্বকীয় টানে, জারুল জানায় নববার্তা রঙের গালিচায়...। কেমনে ধরি প্রাণ অন্তপুরে অন্ধ প্রকোষ্ঠে; আলোহীন, বায়ুহীন নিঃসঙ্গ বাসগৃহে?

পাখির ডাক... উড়াল পাখির কিংবা ফিরতি পথের আকুতির সুর, দুরন্ত দুপুরে কুহু কাঁদে পাঁজরের পাড়ে পাড়ে। পাঁচমুড়া পাহাড়ের ডাক, শামলী নদীর বানমারা টানমারা, রাঙামাটির লালপথ, জ্ঞাতি বটবৃক্ষের আবেশ চোখ ভরে নিয়ে আসে ঘুম, আমি ঘুমাই, স্বপ্নে আসে রাজপুত্র, রাজকন্যা... ধীরে ধীরে রাজপুত্র সেজে

নিজেই শাদা গোলার্ধে উড়াল দিই...

দেখি খোলাচোখে; গরু চরে মাঠ ভরে, আলপথে হেঁটে যাই, মাঝে মাঝে ঝিম মেরে ঝিমোই, বাতাসের ছোঁয়া পেলে ধানশীষ দোল খায়। কাঁপে প্রাণ ধাপে ধাপে প্রণয়ের ইশারায়, লালশাড়ি পলি দেহে বীজ বোনে, জল দেয়, চারা হয় বৃক্ষের আদলে। দেখি না বাঁধা চোখে, খোলা চোখ আটকায়, মনোজলে ডুব দিই। একা একা সাধনায় রত হই। চারিদিকে খালিচোখে দেখে যাই অন্তরের আলোছায়া, হারগোঁজা কাঁটা সুঁই, বাদুড়ের দৌড়ঝাপ, বেদনার পাতকুয়া। নিজ কাজে ডুব দিই, সুখ খুঁজি একা মনে, মনের মুকুরে...

প্রহরী, ঘণ্টা বাজাও, বেলা যায়, নিয়ে যাও ভরা রোদে... স্নাত হই অজ্ঞাত বাসনায়, কেউ বলে বয়ে যায় নিরবধি সময়ের ভরা স্রোতে, কেউ বলে বাকি থাকে এখনো প্রহরের বাকি কাল... ঢং ঢং বেজে চলে গির্জার ঘণ্টা বহুদূর বহুকাল ভাবীকালের পাহারায়... কার লাগি বিরহ, কার লাগি প্রহরায় জানে না, জানে নাই, যে জানে সে নেই। পশ্চিমের পথ ধরে শুকতারা হেঁটে যায় একান্ত খেয়ালে...। যদি থাকো ভরে থাকো, নাই মানে ঘর নেই, ভর নেই, স্বর নেই; চারিদিকে খালি খালি শূন্য শূন্য। প্রহরী প্রহর বানায় আর ঘরে ঘরে সাজে রাত, প্রয়োজনে মন মতো রং মাখে, রং আঁকে- সময়ের বাঁকে বাঁকে স্বল্পদৈর্ঘ্য ছায়াছবি।

ডাকঘরে চিঠি আসে, ডাক আসে, চিঠি হাসে, চিঠি ভাসে অশ্রুজলে, চাপা থাকে কত কথা, শত গান, শত প্রেম, বুকভাঙা হার মানা আবেদন... বোবাঘরে পড়ে থাকে নিশিদিন প্রাপকের অপেক্ষায়। আশা রাখি, বুক বাঁধি পাবো হাতে একদিন আরাধ্য উপহার।

রাতের সাধনা ভাঙায় ঢং ঢং কাঁপা বোল, পরতে ভাঁজ খোলে দেহবাঁক ফাগুনের ইশারায়... পাড়ি দিই ঢেউ তুলে জানি না কী হবে আলিঙ্গন কামনায়!

কারো কারো সারা মনে কৃষ্ণপক্ষ সখা, অবিরত দোষ খোঁজে জড়ানো হুল নিয়ে অনু বারোমাস। দেরি বিনে ফেরি করে বেদনা বেসাতি। আনন্দের উৎস অন্তরের কুয়াজলে... যার ঢেউ সেই তোলে; যার বান তার ব্যথা, স্রোতে ভাসে মন প্রাণ।

কেবল একটু আকাশ আমার; অর্ধ দরজার আকাশ- এই পথেই আনাগোনা, এই সীমায় যাতায়াত। না না, তা বন্ধ করো না, খোলা রাখো, খুলে যাও সখা, পূজা দেবো, সাজি ভরে ফুল দেবো শাদা নীলে, মালা গেঁথে জড়াবো একদিন, জানাবো ভালোবাসি, ভুলো না, ভুলি নাই, ভুলেও যাবো না... চেয়ে থাকি চোখে চোখে আদরের অপেক্ষায়...

ফুল ফোটে, ঝরে যায়, চেনা ঘ্রাণে ভরে রাখে পুরো ঘর। তাই তারা ফুটে থাকে ডালে ডালে যেখানে মনুয়া শিস্ দেয়, ডাক দেয়, বলে দেয় সাজাবো মন দিয়ে জীবনের আয়োজন।

প্রতিশ্রুতি রেখে যাই- আসবো, না ভুলে কথা সব; ফিরবো সাদা রাতে চুপি চুপি তারাদের নিশানায়। তবুও জোরে জোরে নাম বলি, মনে রেখো আমারে, ভুলো না...

খেলাশেষে আরতি সন্ধ্যায় ফেরার বাসনা। নদীর ধার দিয়ে হেঁটে, ধুলোর পথ মাড়িয়ে ঠিক দরজায় দাঁড়াবো আর ডাকবো, আমি তো এসেছি খোলামনে তোমাদের দ্বারে, টেনে নাও বুকে, বড়ই তৃষ্ণার্ত। সাজিয়ে গুছিয়ে দাও, সাজাও। চারিদিকে ফাগুনের রাগ দেখি, কোথাও কোনো ভাগ নেই, যোগ শুধু, দেখি শুধু চোখ ভরে নীলাকাশে শাদা ঢেউ হেসে খেলে চলে যায় মিলনের মোহনায়।

অজান্তে বাসনা জাগে খেচর হই, আকাশে হারাই, মনে আশা পাড়ি দিই সাগর পাহাড় শেষে ক্রৌঞ্চদ্বীপে; পাখিদেশ... কূজনের সপ্তরাগ... শুধু শুধু পাখি ডাকে। নিঝুম সন্ধ্যায় ঝাঁকে ঝাঁকে সবুজ পাখিরা ফিরতি আলোয় নীল পাহাড়ে পাড়ি দেয় যেখানে সমবায়ী আয়োজন। আকাশ, পাখি আর পাহাড়ের দোস্তি আর মাস্তি। পাহাড়ি নুড়ির নৃত্যে পাখিরা ওড়ে, ঝরনা ঝাঁপ দেয় সমুদ্রের বুকে। আর অমলের আকুল মন খাঁচাবাঁধা শুয়াচানপাখি... মুক্ত আকাশে ওড়ার যে বড়ো সাধ হয় বৃষ্টিহীন ভাসা-হাসা মেঘে...

আমার ঘর ছিলো, ঢুকটুকে পুতুলের নাকে ছিলো নোলকের বৃত্ত, লাল ডুরে শাড়ি ভাঁজ, টুনটুনি গন্ধ। সাতভাই চম্পা, রাত জাগা যৌথবাস। দিন যায় রাত যায়, ঝরনার জল চলে নিরবধি কলকল, আল ধরে ঝিঁঝিঁ ডাকে সমস্ত সন্ধ্যায়...। বাঁক ফেরা পথে পথে ডাক আসে ডাক নিয়ে, জোয়ারির ক্ষেতি ভরা পোকাদের কান্না। লেখাচিঠি পড়ে যাই সময়ের বিবরণ ভূগোলে-গুগলে জাল বাঁধা, জালপাতা হরফে।

কতোজন দুয়ারে আসে স্বীয় মনোবাসনা নিয়ে অথবা নিজেই আবর্তিত হয়ে দুয়ারে দুয়ারে যাই, বুকে জড়ায় কেউ আবার কেউ কেড়ে নেয় আনন্দের জমা ক্ষণ। ডুব দিয়ে ঘর খুঁজি, পথ খুঁজি- যেতে চাই ভিতরে যেখানে আলোরেখা পথ ধরে নিয়ে যায় ভরহীন শূন্যে; যা শুনি চারিদিকে তাইই জমাই, লিখে রাখি, কারো কানে বলে যাই, নিয়ে যাও ঠিকানায় যেখানে বসে আছে কালের প্রহরী।

দুঃখ নেই। সুখ দেখি চারিধারে। ফুল দেখি, পাখি দেখি, মেঘ দেখি, চাঁদ দেখি জীবনের উঠোনে, সেজে রয় শতাব্দীর শেষে। একদিন পেতে পারি আরাধ্য লগন; তার লাগি আলো মেখে বুক পাতি ধুলোমাখা আঙিনায়। কখনো আঁধার হলে মনে রেখো, ক্ষণকাল মুছে গেলে ভোর হবে! আলো এলে ভালো করে ভুলগুলি ঠিক করে ফিরে যাবো সুন্দরের ঠিকানায়। মঙ্গলের জয়গানে বেদনার অবসান। মাঝে মাঝে ভয় হয়, শরতের ভরা রোদ, বড় বেশি চঞ্চল ঝরনার আবহন। বুক কাঁপে, মনে হয় সবকিছু সাথে করে নিয়ে যাই শূন্যের ওপারে।

উপহাস-অপমান আবরণ, সরে যায়, খসে যায়, অপেক্ষায় ক্ষণ গুনি গোপন আশায়। বহু রং সরে যায়, ধীরে ধীরে ফিকে হয়; কিছু রং রয়ে যায়... ওঠে না মুছে না। ঠিক মতো লেগে থাকে জনম জনম, রক্তকোষ পরম্পরা।

নগরের সিংহদ্বারে ঘণ্টা বাজে; প্রহর গণনা। রাত সাজে; জ্যোৎস্না ঘুম ঘুম ভাব থেকে জেগে উঠে নিঃসঙ্গ ভেলায় পাড়ি দেয় ধ্রুবতারা সকাশে। আকাশের শেষ তারাটির আলো এসে যখন ভাসাবে রাত, তখন কেউ ঘুমে থাকবে আর যারা এখনো ঘুমায়নি তারা দেখবে, স্মরণে রাখবে জনমভর এমন মন্ত্রমুগ্ধ রাতের কাহিনি।

সুধা ডাকে, উঠে যাও ঘুম থেকে, হাত ভরে ফুল দেবো, বুক ভরে শ্বাস দেবো, এসেছি ভরা মনে, ফিরে তো যাবো না। বলে যাই তারাদের, তোমাদের বলে যাই, ভুলি নাই কখনো একবিন্দু এক পলক।

  • পঁচিশে বৈশাখ রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তি স্মরণে

    ‘নেবে নি, নেবে নি প্রভাতের রবি’ করোনাকালে রবীন্দ্র-অনুভব

    newsimage

    ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ মানেই বুঝতাম সঞ্চয়িতা কাব্যগ্রন্থ। কবিতা পড়তে যেয়ে ভাবনা হতো ‘ফাঁকি’

  • রবীন্দ্রনাথের গান

    চিরনূতন চিরপুরাতন

    জামিরুল শরীফ

    newsimage

    আমার মন ভালো নেই, কেন? জানি না। আমি একজনকে ভালোবাসি, সে কে? জানি

  • সাময়িকী কবিতা

    দুটি কবিতা হারিসুল হক দাম্পত্য-খত কথা নেই। কথা যখন থাকে না তখন রুদ্ধবাক প্রজাপতির মতো

  • প্রতীপ রূপান্তর

    সুরাইয়া জাহান

    newsimage

    সেবার বেশ জাঁকিয়ে শীত পড়েছে ঢাকায়। ডিসেম্বর শেষ হয়ে বছরের প্রথম দিন

  • ধারাবাহিক উপন্যাস : তিন

    শিকিবু

    আবুল কাসেম

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) চার. উৎসবের পরপর একটি ভালো সংবাদ এলো মুরাসাকিদের পরিবারে। উৎসব

  • ইতিহাসের সরোবরে অবাধ অবগাহন

    জোবায়ের মিলন

    newsimage

    ‘দিব্যপুরুষ’ কথাসাহিত্যিক পলাশ মজুমদারের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। পূর্বে তাঁর গল্প পড়ার সৌভাগ্য

  • পুরাণ ও নদীবর্তী জীবনালেখ্য

    অপূর্ব কুমার কুন্ডু

    newsimage

    সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে মুকিদ চৌধুরীর কর্ণপুরাণ ও গোমতীর উপাখ্যান। মহাভারতের মূল কাহিনির বীজ