menu

বাসযোগ্য ঢাকা এবং ড্যাপ বাস্তবায়ন

অলোক আচার্য

  • ঢাকা , বুধবার, ১৫ মে ২০১৯
image

তিলোত্তমা নগরী ঢাকা এখন বহুমুখী সমস্যায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে বারবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও কোনটারই সুষ্ঠু বাস্তবায়ন না হওয়ায় সমস্যাগুলো এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এগুলোর তালিকা তৈরি করলে অনেক লম্বা হবে এবং কোনটির আগে কোনটি সমাধান করা হবে তা নিয়েই ভজঘট লেগে যাবে। এসব সমস্যা কার্যত এ শহরটাকে অকার্যকর করে ফেলছে। এ শহরে থাকা মানুষগুলো প্রতিদিন সমস্যা নিয়েই বাসা থেকে বের হচ্ছে আবার সমস্যার মাঝেই বাড়ি ফিরছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবিকার সন্ধানে ঢাকামুখী হচ্ছে। এদের অনেকেই আবার সেখানে স্থায়ী বসবাস করার জন্য চেষ্টা করছে। অনেক আগেই ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে মেগাসিটি হয়েছে। সে জনসংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কয়েক দিন আগেই ওয়াসার পানিতে ময়লা থাকা নিয়ে যে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ হয়েছে তা দেখেছি। এটা কি শুধু সেই এলাকার চিত্র। বাইরে বের হয়েই প্রথম যে সমস্যায় পড়তে হয় তা হলো যানজট। ঢাকার মানুষ দৈনিক রাস্তায় চলতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করছে রাস্তায় গাড়িতে। প্রতিদিন যানজটে পড়ে ঢাকার মানুষের লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এত কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এক জরিপে দেখা গেছে ঢাকায় বর্তমানে ঘণ্টায় গড় গতি ৬ কিলোমিটার। আর কিছুদিন পর এই গতি ৪ কিলোমিটারে নেমে আসবে। যানজট কেবল ঢাকার সমস্যা নয় বরং এশিয়ার কয়েকটি দেশসহ অনেক বিশ্বেই যানজট মারাত্মক সমস্যা হয়ে বসে আছে। বিশেষ করে যেসব শহরের জনসংখ্যা ধারণক্ষমতা অতিক্রম করেছে এবং শহরটি ঢাকার মতো অপরিকল্পিত। যার যেভাবে খুশি বড়বড় বিল্ডিং তৈরি করে রেখেছে। রাস্তার ভেতর গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়। তবে ঢাকার মতো এত প্রকট আকার ধারণ করা শহরের সংখ্যা এত নেই। কিছু কিছু এলাকায় তো গাড়ির গতির চেয়ে মানুষের হাঁটার গতিই বেশি।

তাহলে এক সময় কি ঢাকা স্থবির হয়ে যাবে? যানজট নিরসনে বহুবার বহু উদ্যোগ নেয়া হলেও কার্যত তা ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিদিন ঢাকায় গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। ব্যক্তিগত গাড়ির চাপে ঢাকার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। দেখা যায় এক পরিবারে একটি গাড়ি হলেই চলছে, সেখানে একাধিক গাড়ি কিনে রাস্তায় নামাচ্ছে। এসব টাকার কুমিররা নিজেদের আরাম-আয়েশের জন্য জনগণের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। যানজটের এ অবস্থার জন্য ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স ২০১৯-এ প্রকাশিত তথ্যে আমরা আছি প্রথম অবস্থানে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে কলকাতা। গত বছর ও তার আগের বছর এই অবস্থান ছিল যথাক্রমে ২য় ও ৩য়। ২০১৫ সালে এ অবস্থান ছিল অষ্টম। আমরা খুব দ্রুতই নিজেদের জায়গা পরিবর্তন করেছি। যানজট ছাড়াও এ শহরের পানি, বাতাস সবকিছু যেন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ওয়াসার পানি নিয়ে একজন সাধারণ নাগরিকের অভিনব প্রতিবাদ আমাদের নজর কেড়েছে। আর যে বাতাস আমরা গ্রহণ করছি তাতে ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। বায়ু দূষণের মাত্রা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। ঢাকার মানুষের জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো দূষিত বায়ু। ডব্লিউএইচওর মানদন্ড অনুযায়ী, বিশ্বের যেসব দেশের শতভাগ মানুষ মাত্রারিক্ত বায়ুদূষণের মধ্যে বাস করছে তার একটি বাংলাদেশ। আর বলাই বাহুল্য যে আমাদের দেশের অন্য শহরের তুলনায় রাজধানীর বায়ু দূষণের মাত্রা বেশি। ঢাকার বাতাসে মাত্রারিক্ত ক্ষতিকর পদার্থ রয়েছে যা নিঃশ্বাসের সঙ্গে দেহের অভ্যন্তরে পৌঁছে নানা রোগের জন্ম দিচ্ছে। অথচ প্রতিদিন ঘর থেকে বের হয়েই বিষাক্ত বাতাস টানতে হচ্ছে এ শহরের মানুষকে। একদিকে ইট কাঠের শহর থেকে গাছের সংখ্যা একেবারে কমে যাওয়া অন্যদিকে ক্রমাগত বৃদ্ধিপাওয়া যানবাহনের ধোঁয়া, আশেপাশের ইটভাটার ধোয়া এসব মারাত্বকভাবে বাতাসে ক্ষতিকর পদার্থের জন্ম দিচ্ছে। বায়ু দূষণের সঙ্গে নোংরা এবং পানের অযোগ্য পানির কথা না বললেই নয়। ওয়াসার সাপ্লাই দেয়া পানি নিয়ে একজন সাধারণ নাগরিকের অভিনব প্রতিবাদের কথা গণমাধ্যমের কল্যাণে আজ সবারই জানা। এ ঘটনা কেবল একজন নাগরিকের ক্ষেত্রে নয় বরং এরকম নোংরা দুর্গন্ধ পানির অভিযোগ বহু। পানি মানুষের নিত্যদিনকার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান। অথচ সেই পানির এই অবস্থা। এর কারণ ঢাকার আশপাশের নদীগুলোকে আমরা প্রায় মেরে ফেলেছি। যেখান থেকে আমাদের পানি সরবরাহ হয়। নিজেদের পেতে রাখা ফাঁদে আজ নিজেরাই পড়ে গেছি। বোতলজাত পানি নিরাপদ মনে করার কোনো কারণ নেই। মাঝে মধ্যেই এসব বোতলজাত মিনারেল ওয়াটারের কীর্তিকলাপ ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। মাটি দূষণের কথা বাদই দিলাম। কারণ দূষণ হওয়ার মতো মাটিই ঢাকায় অবশিষ্ট নেই। সব জায়গায় বিল্ডিং গড়ে উঠেছে। পুকুর, জলা ভরাট করে এসব বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির হার সবচেয়ে বেশি ঢাকায়। অধিকাংশ ভবনই ঝুঁকিতে রয়েছে। রাস্তায় বের হলেই মৃত্যু থাবা মেলে আছে জেনেও বের হতে হয়। এতসব সমস্যা নিয়ে রাজধানী কতদিন তার নাগরিকের কাছে তিলোত্তমা নগরী হিসেবে থাকবে তা সময়ই বলে দেবে। ইতিমধ্যেই যান্ত্রিক শহরের খেতাব পেয়ে গেছে। মানুষই এখানে যন্ত্র। এতসব সমস্যার কারণে ঢাকা ক্রমেই একটি বসবাসের অযোগ্য শহরের পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এসব সমস্যা থেকে বাঁচতে এবং ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তুলতে প্রণীত হচ্ছে নতুন ড্যাপ।

পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ঢাকাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে ২০ বছর মেয়াদি বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রণয়ন করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এরই মধ্যে প্রকল্প প্রণয়নের কাজও শেষপর্যায়ে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ঢাকা পরিকল্পিত, বাসযোগ্য ও আধুনিক নগরী হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। রাজউকের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরের জুনের মধ্যে নতুন ড্যাপ চূড়ান্ত করা হবে। এর আগেও একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে রাজউকের আওতাভুক্ত ৫৯০ বর্গমাইল এলাকার জন্য ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান (১৯৯৫-২০১৫) এবং আরবান এরিয়া প্ল্যান (১৯৯৫-২০০৯) এর পলিসির আলোকে সমগ্র রাজউক এলাকার জন্য ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু ওই পরিকল্পনায় নানা অসঙ্গতি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি ছিল বাস্তবতা বিবর্জিত। ড্যাপ প্রণয়নকারীরা গুগল ম্যাপ দেখেই ওই ড্যাপ প্রণয়ন করাসহ নানা অভিযোগ ওঠার পর এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে তা রিভিউ করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে আবারও ড্যাপ সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফলে বাস্তবে রূপ পায়নি ওই পরিকল্পনা। প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি এলাকায় আবাসিকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক এলাকারও চাহিদা থাকে। এজন্য ড্যাপের মহাপরিকল্পনায় কোনো এলাকাকে শুধু আবাসিক বা বাণিজ্যিক হিসেবে চিহ্নিত করা হবে না। এজন্য এলাকাভিত্তিক মিশ্র ব্যবহারকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে না।

দেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব সর্বাধিক। ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রমইে তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে। ক্রমাগত দখল, দূষণ আর ভরাটের ফলে চারদিক থেকে সমস্যাগুলো চেপে বসেছে। ফলে একটি সমস্যা থেকে বের হতে গিয়ে নতুন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে অথবা সমস্যার সমাধান কোনোভাবেই হচ্ছে না। সমস্যার আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে পরিকল্পনাবিদরা। এমন একটি শহর গড়ে তুলতে হবে যেখানে সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাবলিক বাসে বসে সময় কাটাতে হবে না। শহরবাসী যে নিঃশ্বাস নেয় তাতে বিষাক্ত কোন উপাদান থাকবে না। শহরবাসীকে নিরাপদ পানির জন্য রাস্তায় নামতে হবে না। ঘরে বসেই নিরাপদ পানি পান করতে পারবে। চারিদিকে সবুজ গাছপালায় ছেয়ে থাকবে। ড্যাপ বাস্তবায়নে যদি এত দীর্ঘ সময় না নিত তাহলে আরও আগেই ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তোলা যেত। বাস্তবায়িত হতে যাওয়া পরিকল্পনা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হবে কিনা, তা অপেক্ষার বিষয়। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা গেলে ঢাকাকে একটি সত্যিকারের পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তোলা যাবে। এমন একটি শহরে ঢাকাকে রূপান্তর করা কি সত্যি সম্ভব?

[লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট]

sopnil.roy@gmail.com