menu

জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার ঐতিহাসিক রায়

মোতাহার হোসেন

  • ঢাকা , শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

ইতিহাস কখনও কাউকে ক্ষমা করে না। ইতিহাসের এ সত্য কেউ কখনও মাথায় রেখে কাজ করে না। মানুষ যখন তার কর্মকা-ে সতর্ক হয় না, প্রতিহিংসাবশতঃ কাজ করে পরে পরিনাম তার শুভ হয় না। হয়তো আপাতত কিছুটা লাভ পাওয়া যায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকারীদের ইতিহাস ক্ষমা করেনি। ক্ষমা করেনি ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেল অভ্যন্তরে সংঘটিত ৪ জাতীয় নেতা যথাক্রমে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এসএম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করে হত্যাকারীরা পার পায়নি।

অনুরূপ পার পায়নি ১৯৯৬ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে আওয়ামী লীগের সমাবেশ প- ও দলের নেতাকর্মীদের হত্যার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় বর্বারোচিত হামলা। সেদিন পাখির মতো গুলি করে ২৪ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। এ হত্যায় সরাসরি নেতৃত্ব দেন তৎকালীন চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদা। ওই হত্যাকারীরাও বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। একই ভাবে বিশ্বের রাজনৈতিক হত্যাকা-ের ইতিহাসে চরমতম ঘৃণ্য এবং জঘন্যতম হত্যাকা- সংঘটিত হওয়া ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা। এ হামলায় নিহত হন মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিল্লুর রহমানের স্ত্রী বেগম আইভী রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী। আর স্পিøন্টারে আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন আরও প্রায় কয়েকশ’ নেতাকর্মী।

এ হত্যাকা- পৃথিবীর ইতিহাস জঘন্যতম এ কারণে যে, ১৯৭৫ সালে শুধু ঘাতকচক্র হত্যা করেছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের ও নিকটজনদের। কিন্তু ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের মতো এশিয়ার প্রাচীনতম দল এবং স্বাধীনতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের পরিকল্পিত এবং পরিচালিত এ হত্যাকা- সংঘটিত হয়। তখন ওই সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, বিশেষ বাহিনীর শীর্ষকর্তা এবং একটি বিশেষ ভবন থেকে নীল নকশা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয় এ হত্যাকা-। এ হত্যাকা- নিয়ে থানায় মামলা নেয়া, আহতদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া বা এ পৈশাচিক হত্যার বিচারের উদ্যোগ নেয়নি তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার। এমন কি মামলার সব আলামত নষ্ট করে জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে। ওই যে বলাম, ‘ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।’ এর প্রমাণ হলো গত ১০ অক্টোবর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে। এ মামলায় সাবেক বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বারবসহ ১৯ জনের ফাঁসি এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৮ জনের যাবজ্জীবন দ-াদেশ দেয়া হয়।

সরকারি মহল বলছে, এ মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে একদিকে ২১ আগস্ট সংঘটিত কলঙ্কজনক হত্যার কলঙ্ক থেকে জাতি মুক্তি পেল। অন্যদিকে দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হলো। বিচার বিভাগের প্রতি, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।

অথচ বিগত ১৪ বছর জাতির ইতিহাস এক ভয়াবহ কলঙ্কের কালিমা নিয়ে, ক্ষত নিয়ে চলেছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বুকে যা ঘটেছিল, তা মনে করলেও শরীর শিউরে ওঠে, বিবেক হয়ে পড়ে যন্ত্রণাদগ্ধ। কারণ সেদিনের সেই নারকীয় ঘটনার সময় আমি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগ অফিসের পাশে থেকে অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করছিলাম। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং সে সময়ের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে জনসভায়। শেখ হাসিনাসহ অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের একসঙ্গে খতম করে আওয়ামী লীগ তথা তৎকালীন বিরোধী দল তথা জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করে দেয়ার জন্যই ভয়াবহ এ উদ্যোগ, নীলনকশা, ষড়যন্ত্র, গ্রেনেড জোগাড়, হামলা, অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করা হয়। তারপর সংসদে এ নিয়ে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগকে কথা বলতে দেয়া হয়নি। বরং তৎকালীন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা তার ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড এনে সমাবেশস্থলে নিক্ষেপ করেছেন। এ গ্রেনেড আনা হয়েছে ভারত থেকে।’ এবং এ ঘটনার দায় খোদ আওয়ামী লীগ এর কাঁধে চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের সে দিনের সেই দুর্বিষহ স্মৃতি আজও ওই যারা ঘটনার শিকার, যাদের পরিবারের আপনজন নির্গত হয়েছে, আহত হয়েছে তারা অনুভব করছেন হাড়ে হাড়ে। আমরা যারা সংবাদ কর্মী হিসেবে উপস্থিত ছিলাম, তারা সেই দুঃসহ স্মৃতি স্মরণে আনলে রীতিমতো শিহরিত হয়ে ওঠি। কারণ রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ওই গ্রেনেড হামলায় ঢলে পড়লেন আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভী রহমান। মৃত্যুর আগে উড়ে গেছে তার শরীর নিচের দিক; তিনি শূন্য চোখে এ পৃথিবীর দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন, এ চিত্র যখনই মনে আসে ভয়ে আঁতকে উঠি। আর নিজেকে প্রশ্ন করি, এ কি কোন মানুষের কাজ? রাজনীতি এত নিষ্ঠুর হতে পারে? মানুষ এত নৃশংস হতে পারে? সেদিন এ হামলায় ২৪ জন নিহত হন। আহত হন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েকশ’ নেতাকর্মী। তাদের অনেকে আজও শরীরে গ্রেনেডের স্পিøন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন।

শরীরে স্পিøন্টার নিয়ে আহত ব্যক্তিরা তাকিয়ে ছিলেন বিচারের দিকে। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন, ১৪টা বছর। কিন্তু শুধু কি তারাই? জাতির বিবেকেই যেন স্পিøন্টারবিদ্ধ হয়ে ছিল। পুরো জাতিই চেয়েছে এ কলঙ্কের দায় থেকে মুক্তি। রায়ের মধ্য দিয়ে সেই কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেল দেশবাসী।

কথায় আছে ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।’ তবে এ বিচারপর্ব শুরু হয়েছে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। নিম্ন আদালতকে, হাইকোর্টে, সুপ্রিমকোর্টে সময় গেছে ১৪ বছর। ১০ অক্টোবর মামলার রায় হলো। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদ- দিয়েছেন আদালত। এ মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, সাবেক সাংসদ কায়কোবাদসহ ১৮ জনের যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়েছে।

এ বিচার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়া জাতির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এবং তার সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। স্বয়ং শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য সংঘটিত হামলার বিচারও আদালতের মাধ্যমে হয়েছে। যেমন আইনানুগ বিচারের মাধ্যমে বছরের পর বছর বিচারকার্য পরিচালনা করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় হয়েছে, রায় কার্যকর করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও প্রকাশ্যে আদালতে হয়েছে এবং হচ্ছে। আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যে ন্যায়বিচার সম্পন্ন করা যায়Ñ এ রায় তার অনন্য উদাহরণ। এজন্য আমরা অবশ্যই শেখ হাসিনার সরকাকে ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন জানাই। শেখ হাসিনার সরকার জাতিকে কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এখন প্রত্যাশা থাকবে দ্রুত এ রায় কার্যকর করা, পাশাপাশি বিদেশে পালিয়ে থাকা দ-িত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাদেরও আইনের আওতায় আনা।

১০.১০.২০১৮

[লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট]

motaherbd123@gmail.com

  • বিশ্ববিদ্যালয় জীবন

    মুহম্মদ জাফর ইকবাল

    শেষপর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকতা জীবন শেষ হতে শুরু করেছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি চব্বিশটি বছর কাটিয়ে দিয়েছি।