menu

চৈত্র সংক্রান্তির আবাহনে পহেলা বৈশাখ

সেলিম রেজা

  • ঢাকা , রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৯
image

(ক) দেশে দেশে কালে কালে এসেছে নববর্ষ। মানুষ তার জীবন চারিতায়, বাঁচার তাগিদে শস্য উৎপাদনের বিশ্বাসে, মনের জগতে জোর বাড়াতে, অসাম্প্রদায়িক এই আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে, নিজের অধিকার বাস্তবায়নে, নতুন বছরকে নানান রঙে, নানাভাবে, বহুমাত্রায় বরণ করে নিয়েছে। বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে লেখক-গীতিকার ফরিদুর রহমান লিখেছেন, ষড়ঋতুর গান- তার প্রথম স্থায়ী।

এসো নতুন বছর এসো তুমি, প্রদীপ জ্বালো মনে,

গ্রীষ্মকালে সাজিয়ে দেবো, আম কাঁঠালের বনে।

বাংলার নববর্ষ বৈশাখ মাস, গ্রীষ্মকাল। ৬ ঋতুর দেশ ১২ মাসের সম্পর্ক। এই ১২ মাসের সঙ্গে বাংলার প্রকৃতি মাটি ও মানুষের সম্পর্ক। সুখে দুঃখে ঋতুর পরিবর্তনে বাঙালি তার বেঁচে থাকার প্রত্যয়, প্রেরণায়, যুগে যুগে নানান কর্মসৃষ্টির উন্মাদনায় গড়ে তুলেছে বিভিন্ন পর্বে-শিল্প-সাহিত্য, ছড়া-কবিতা, লোকজ নৃত্য এবং ১২ মাস ধরে ১৩ পার্বণের বিভিন্ন কর্মের গান।

জাগরণের কবি, কবিয়াল রমেশ শীল লিখেছেন, ১২ মাসের গান। এখানে তার প্রথম মাসের গানের স্থায়ী।

প্রথম বৈশাখ মাসে, তুমি গেলা কোন দেশে,

দুধের সঙ্গে আমের রস, খায় পায় কত রস,

যেই নারীর সোয়ামি ঘরে আছে॥

প্রান্তিক জনপদে খেটে খাওয়া মানুষের প্রশান্তিতে, গ্রাম বাংলার অন্যতম আকর্ষণ মেলা উৎসব। চৈত্র সংক্রান্তি, পৌষ মেলা, রথযাত্রা, মাঘী পূর্ণিমা, ঈদ উৎসব, মহরমের মেলা, বিভিন্ন পূজা পাবর্ণ ইত্যাদি। এই বিশেষ দিনগুলোতে শত অভাব অনটনের মধ্যেও গ্রাম বাংলার মানুষ আনন্দ উৎসবে, আতিথেয়তায়, আত্মীয়তায় মেতে উঠে। মুখরিত হয় গ্রাম-গঞ্জ, মাঠ-ঘাট, হাট-বাজার।

(খ) ফসল তোলার মাসকে কেন্দ্র করে, খাজনা আদায়ের প্রয়োজনে সম্রাট আকবর চান্দ্র বৎসরের হিসাবকে সৌর বৎসরের গণনায় রূপান্তরিত করেন। এই হিসাব হিজরী ৯৬৩ সন থেকেই বাংলা সনের উৎপত্তি হয়। ভিন্নমতে বলা আছে স্বাধীন বাংলার সুলতানেরা এর সূচনা করেন।

(গ) আদি ছড়ায় আমরা পাই ১২ মাসের ছড়া তেমনই একটি -

মেঘের ডাকে আকাশ কাঁপে, চমকে ওঠে বিজড়ী,

অঝোর ধারে বৃষ্টি নামে - ভাবনা তো নেই কিছুরই -

দমকা হাওয়ায় গন্ধ আসে আম কাঁঠাল আর লিচুরই।

ঘরের ভিতর আমরা বসে- কখন হবে খিঁচুড়ি।

কারুশিল্প, চারুশিল্প এবং বিভিন্ন হস্তশিল্পকে জীবনের প্রয়োজনে তাঁতী, কৃষক, কামার, কুমার, জেলে, শিল্পী হাজার বছরের বাঙালি সত্ত্বাকে ধারণ করে, পালন করে, ধরে নিয়ে যায় নবান্নে, পালাগানে, কবিগানে, চলে আসে পুঁথিগীতে পিঠা পুলির উৎসবে।

বিরহ-বিচ্ছেদী, ঢপ-কীর্তন, ভাটিয়ালী, গম্ভীরা, ভাওয়াইয়া, মুরশেদী-মারফতি, আউল বাউলের রাতের পর রাত জাগার আসরে। টেনে নিয়ে যায় যাত্রাপালায়, সুখ দুঃখের কিচ্ছা কাহিনীতে, যেখানে তার শেকড় ভাষা, বর্ণ, হৃদয়ের অনুভূতি, সত্তা লুকায়িত।

উৎসব পার্বণকে সামনে রেখে সারা বছর ধরে চলে এই আয়োজন, কর্মযজ্ঞ। তৈরি হয় তামা, পিতল, কাঁসা, মাটি, লোহার-ঘরকন্নার সামগ্রী। কাঠের তৈরি লাঙ্গল, জোয়াল, দরজা, জানালা, খেলনা, বিভিন্ন আসবাবপত্র। শামুক, ঝিনুক, মাটি, শোলা, কাঠ, ইত্যাদির পুঁতির মালা। ছোটদের টমটম গাড়ি, বাঁশের বাঁশি, ঢোল-করতাল, কাগজের মুখোশ। খাবারে জিলাপী, বাতাসা, মুড়কী, মোয়া, লাঠি বিস্কুট ইত্যাদি। মেলার মজায়-নাগরদোলা, চরকগাছ, হাতি-ঘোরায় চড়া, বায়াস্কোপ দেখা, রঙ বেরঙের ঘুড়ি-লাটাই, লাড্ডু কেনা। ছাঁচে তৈরি চিনির- হাতি, ঘোড়া, মাছ, বাটি, ফুল ইত্যাদি খাওয়া।

অঞ্চলভিত্তিক প্রতিযোগিতার আয়োজনে- দাঁড়িয়াবান্ধা, কাবাডি, মোরগের লড়াই, ষাঁড়ের লড়াই, নৌকাবাইচ, ঘুড়ির প্রতিযোগিতা ও অন্যান্য খেলা। এই আনন্দ এই উৎসব চিরায়ত বাংলার লোক ঐতিহ্যের আসল রূপ।

(ঘ) ঘটনার কিছু ধারাবাহিকতা- ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবি। এ সময় ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক বাংলা নববর্ষের ছুটি ঘোষণা করেন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর আইয়ুব খানের সামরিক শাসনে তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬৪ সালে বাঙালি জাতির তীব্র আন্দোলনের চাপে আবার বাংলা নববর্ষ উৎসবে রূপ নেয়। ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয় ১৯৬৭ সালে, পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যা আজও রমনার বটমূলে চলমান। ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে বহুভাষাবিদ জ্ঞানসাধক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বাংলা পুঞ্জিকা গঠন করা হয় এবং একই সময় ১৪ এপ্রিলকে পহেলা বৈশাখ নির্ধারনের সুপারিশ করা হয়।

পরবর্তীতে ‘বাংলা বর্ষপুঞ্জি সংস্কার কমিটি’ নামে আরেকটি কমিটির সুপারিশের আলোকে বাংলা একাডেমিতে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ১৯৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর (বাংলা ২৮ ভাদ্র ১৪০১) অনুষ্ঠিত সভায় ১৪ এপ্রিলকে পহেলা বৈশাখ ধার্য করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৩ আগস্ট ১৯৯৫ থেকে এটি কার্যকর। এভাবেই পহেলা বৈশাখ (শুভ নববর্ষ) আমাদের মাঝে হাজির হয় ১৪ এপ্রিল।

(ঙ) আবহমানকাল ধরে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় কত ঋষিজন লিখে গেছেন ষড়ঋতুর গান, রচনা করে সাজিয়েছেন এই লোকমেলাকে, এই বাংলাকে। সংস্কৃতি মঞ্চের জাগার গানে আমরা গেয়ে চলেছি-

এসো/মঙ্গলদীপ জ্বালি, সারাবেলা সারাক্ষণ,

এই/সত্যের পথে অন্তর রথে, জাগরণে ঋষিজন।

২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর জাতিসংঘের (UNESCO) সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় নিয়ে আসে, এই বাংলা নববর্ষ বরণের বর্ণিল উৎসব ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।

পেছনের ইতিহাস, ১৯৮৫ সালে যশোরের ‘চারুপীঠ’ বর্ষবরণে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে। ঢাকায় প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে। ১৯৯৫ সালে চেতনার সংগঠক, শিল্পী ইমদাদ হোসেন আনন্দ শোভাযাত্রার নতুন নামকরণ করেন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা।

  • মাদ্রাসার অধ্যক্ষের কামুকতা

    জিয়াউদ্দীন আহমেদ

    যৌন হয়রানির অভিযোগে ফেনীর ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে মামলা