menu

গুপ্তচরবৃত্তি না প্রেস বিজ্ঞপ্তি?

শরীফুর রহমান আদিল

  • ঢাকা , শুক্রবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়ায় গত দু’দিন ধরে আলোচনার শিরোনামে ছিল মন্ত্রিসভা থেকে সদ্য অনুমোদনপ্রাপ্ত ডিজিটাল সুরক্ষা আইন-১৮। এই আইনটি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের স্বস্তি পাওয়ার জায়গায় উল্টো জনসাধারণের মনে ভয়ের সঞ্চার করলো। কেননা, ৫৭ ধারা শেষ হলো কিন্তু ৫৭ ধারার পরিপূরক হিসেবে আরও ৪টা ধারা ডিজিটাল আইনে-১৮ সংযুক্ত করা হয়েছে। এই অর্থে বলা যায় যে, ৫৭ ধারা শুধু বাদই হলো না বরং এই আইনটিকে অন্যভাবে আরও সুসংহত করা হলো।

মূলত: সরকার এই আইনের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা- কর্মচারীদেও সুরক্ষা দেয়ার জন্যই এই আইন করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে এর আগেও সরকার সরকারি কর্মচারী আইন ২০১৫ প্রণয়ন করেছে আর ডিজিটাল আইনের কিছু ধারার মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শুধু সুরক্ষাকে মজবুত করাই হলো না বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে নির্বিঘেœ দুর্নীতিপরায়ন মনোভাব নিয়ে ৯৯ শতাংশ মানুষের সম্পদ পুঞ্জিভূত করার পথ সহজ হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে এই আইন বাস্তবায়নের ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বলে আর কিছু থাকবে কি-না? যদিও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য এ আইন হুমকি নয় কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন- প্রকাশিত সংবাদটি যদি সত্য হয় তবে কোন সমস্যা নেই তার মানে মিথ্যা হলে এই আইন বাস্তবায়িত হবে? আর সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের পূর্বেই ৩২ নং ধারা মোতাবেক সেই সাংবাদিককে পুলিশ গ্রেফতার করে বিভিন্ন নির্যাতন করে আদালতে স্বীকারোক্তি নিয়ে নিবে। সুতরাং সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি কালো আইন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউন, সমকাল ও বিভিন্ন পত্রিকার উদ্ধৃতি থেকে জানতে পারি যে বাণিজ্যমন্ত্রী এই আইন সম্পর্কে বলেছেন- ‘নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মর্যাদাশীল। অথচ তাদের বিরুদ্ধে যেভাবে লেখা হয়, তাতে তাদের মান-ইজ্জত থাকে না। কখনো সংসদ সদস্যদের প্রতিপক্ষ, কখনো দলেরই বিরোধী গোষ্ঠীর কেউ সাংবাদিকদের নানা তথ্য দিয়ে থাকে।’ এটি যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে বলা যায় যে ইংরেজি দৈনিক অবজারভারের বিরুদ্ধে গত কয়েকদিন আগে নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান উই আর ড্রাগ ডিলার প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে যে বিষোদাগার করেছিলেন এ আইনটি করতে তার বক্তব্য কি প্রভাবিত করেছে?

বাণিজ্যমন্ত্রীর কথা থেকে সাধারণ মানুষের পক্ষে অনুমান করা সহজ হচ্ছে যে বর্তমান সংসদ সদস্যদের চরিত্র ও তার প্রকৃতি! এটি যদি সত্যিই হয়ে থাকে তবে তা আওয়ামী লীগের জন্য অবশ্যই কলঙ্কজনক হবে। কেননা, তখন প্রশ্ন জাগবে- আওয়ামী লীগ কি শুধু স্বচ্ছ ও চরিত্রবান রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে দুর্নীতিবাজদেরই মনোনয়ন দেয়? অথবা মনোনয়োন দেয়ার মতো আওয়ামী লীগে ঐ রকম চরিত্রবান সৎ ব্যক্তি নেই! আর যদি থেকেই থাকে তবে বাণিজ্যমন্ত্রী ডিজিটাল আইনের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে সংসদ সদস্য সদস্যদের দুর্নীতির পক্ষে এভাবে সাফাই গাইবেন কেন? অথচ ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দিন বদলের সনদ হিসেবে এমপি-মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব নেয়ার কথা বলে জনগণের প্রশংসা ও ভোট পেয়েছিল অথচ সেই ইশতেহার বদলে এখন কেন এ ধরনের আইন প্রণয়ণ?

ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এবং তা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এটা সত্য, তবে সেই আইন যদি জনগণের জন্য নিগ্রহমূলক হয় এবং মন্ত্রী-এমপিকে দুর্নীতি করতে উৎসাহ কিংবা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতিবাজ হতে সহায়তা করে তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য নয়।

দিন বদলের সনদ ঘোষণা দেয়ার পর বাংলাদেশের জনগণ আশা করছিল সব জায়গায় স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা আরও জোরদার হবে কিন্তু সরকারের নিত্যনতুন এই ধরনের আইন সেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পথকে রুদ্ধ করে দেবে। এবং সহজ-সরল জনগণ কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর দ্বারা জিম্মি ও নিপীড়নের শিকার হতে পারে।

ডিজিটাল আইনে সবচাইতে আলোচিত সমালোচিত ধারার নং ৩২ ধারা। যেখানে বলা হয়েছে- ‘কোন ব্যক্তি বেআইনিভাবে প্রবেশের মাধ্যমে সরকারি, আধা-সরকারি সায়ত্ত্বশাসিত বা বিধিবদ্ধ কোন সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য- উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ষন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ, ধারণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন তাহলে সেই কাজ হবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবুত্তির অপরাধ এবং এই অপরাধের শাস্তি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারদ- কিংবা ২৫ লাখ টাকা কিংবা উভয়দ-। এ ধারা নিয়ে সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার শঙ্কা। কেননা, এই ধারা প্রত্যাবর্তনের মধ্যদিয়ে বাক-স্বাধীনতা হরণ ও সাংবাদিকদের জায়গা অনেকটা সংকুচিত হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ৩২ নং ধারায় যা বলা হয়েছে তার সবটা দিয়ে সাংবাদিকরা তাদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পরিচালনা করেন। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে জনগণকে বেশ কিছু বিষযে সচেতন এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে ভয়ের সঞ্চার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এ ডিজিটাল আইনের ৩২ নং ধারা বাস্তবায়িত হলে সাংবাদিকদের এ প্রবণতা কিংবা এ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। সুতরাং তখন সাংবাদিকরা প্রেস বিজ্ঞপ্তি ছাড়া অন্য কিছু ছাপাতে তারা শঙ্কাবোধ করবে। ফলে সাংবাদিকতা পেশাটির অপমৃত্যু হতে পারে! সাংবাদিকরা এখন চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে গুপ্তচরবৃত্তি করবে নাকি শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তি ছাপাবে। মাত্র একটি ধারার কারণেই কি বৈধ পেশাটি অবৈধ হয়ে যাবে? যদিও বিভিন্ন মন্ত্রীরা বলে বেড়াচ্ছেন এই আইন ও ধারা নিয়ে সাংবাদিকদের কিংবা মতপ্রকাশকারীদের শঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই কিন্তু যে ৫৭ ধারা নিয়ে এত সমালোচনার সৃষ্টি হলো সেই ৫৭ ধারা যখন প্রবর্তিত হচ্ছিল তখনও বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এ নিয়ে বলেছিল ৫৭ ধারা নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কোন কিছু নেই কিন্তু এর বিভিন্ন অপপ্রয়োগের পরে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল যে এটি একটি কালো আইন। এই কালো আইনের অপপ্রয়োগের ফলে ৭৪১টি মামলা হয় যার অধিকাংশগুলোই ছিল হয়রানিমূলক। সুতরাং ৫৭ ধারা থেকে আরও শক্তিশালী ৩২ নং ধারার মাধ্যমে যে অপপ্রয়োগ হবে না তার গ্যারান্টি কি? যে পুলিশের অপেশাদারিত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রভৃতি নিয়ে গত কয়েক মাস আলোচনা হচ্ছে এবং পুলিশের দেশের রাজা মনোভাব পরিবর্তনে কথা হচ্ছে সেখানে এই আইনের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে অন্যায়ভাবে কাউকে বেআইনিভাবে গ্রেফতার করতে আরও শক্তিশালী করা হয়নি কি?

প্রতিটি গ্রাম, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড়, কিংবা উপজেলাতে অথবা বিভিন্ন সংস্থা, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দফতরে ইলেকট্রিক কিংবা প্রিন্ট মিড়িয়ার প্রতিনিধি নিয়োগ করা সম্ভব নয় কিন্তু এইসব মিড়িয়ার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ ধরে বর্তমানে সিটিজেন সাংবাদিকতার প্রবর্তন হয় ফলে অধিকাংশ সংস্থায় সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির চিত্র ৩২ ধারায় উল্লেখিত ডিভাইসের মাধ্যমে জানতে পারি কিন্তু ডিজিটাল সুরক্ষা আইন-১৮র ৩২ নং ধারা প্রর্বতনের ফলে এই ধরনের সিটিজেন সাংবাদিকতা কিংবা পেশাগত সাংবাদিকরা তাদের পুরনো জায়গায় ও অনুসন্ধানী মন নিয়ে সাংবাদিকতা করতে পারবেন না। অন্যভাবে বলা যায় এটি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে পথে বাধা হিসেবে এই আইন শক্তিশালী হয়ে কাজ করবে। কেননা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের অধিকার ও তড়িৎ সেবা নিশ্চিত করার জন্যই সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘোষণা দেয় কিন্তু এই আইন প্রণয়নের মধ্যদিয়ে সরকার পক্ষান্তরে তার প্রণীত ডিজিটাইলেশনের বুকে পেরেক ঢুকাল! অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ছাড়াও এই আইন বাস্তবায়ন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যাবে কেননা, তারা সরকারি কোন কর্মকর্তার দুর্নীতি প্রমাণে তেমন কিছু উপস্থাপন করতে পারবে না। এই আইন বাস্তবায়ন হলে আইনজীবীরা কিছুটা হলেও বিপাকে পড়তে পারেন কেননা, তারা তাদের মক্কেলকে বাঁচাতে এখন কোন আইনে উল্লেখিত কোন ডিভাইস ব্যবহার করে মামলার বাদী কিংবা বিবাদীর তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করতে পারবে না!

এই আইনের ফলে সংবিধানে স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হবে অন্যদিকে, সাক্ষী সুরক্ষা আইন ও তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। এছাড়াও সম্প্রচার নীতিমালা এই ডিজিটাল নিরাপাত্তা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

এছাড়াও আইন অনুযাযী মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে ফলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্বাধীন গবেষণার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল! বিভিন্ন প্রয়োজনে সরকার আইন প্রণয়ন করবে এটাই স্বাভাবিক তবে সেই আইন প্রণয়েনের উদ্দেশ হবে অবশ্যই জনগণের সেবা, অনৈতিকতার পথ রুদ্ধ করা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু এর পরিবর্তে জনগণকে নিগ্রহ করা কিংবা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে দেশের পুরো সম্পত্তি ১% লোকের হাতে পুঞ্জিভূত করার মানসিকতা নিয়ে আইন প্রণয়ন করলে তা অবশ্যই নিন্দনীয়। সুতরাং ডিজিটাল আইনের যেসব ধারা অস্পষ্ট তা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা দিয়ে, তা গণশুনানির মাধ্যমে মতামত নিয়ে সংসদে পাস করলে জনগণ সর্বোপরি দেশ উপকৃত হবে।

[লেখক : শিক্ষক]

adil_jnu@yahoo.com