menu

খাদ্যপণ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে চাই শূন্য সহিষ্ণুতা

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

  • ঢাকা , সোমবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

ভেজাল খাদ্য তালিকায় অতি সম্প্রতি প্লাস্টিকের চাল যুক্ত হওয়ার খবর পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে। গাইবান্ধার এক ব্যক্তি বাজার থেকে চাল কিনে রান্না করার পর তার সন্দেহ হওয়ায় তিনি চাল পুড়িয়ে প্লাস্টিক বলে সন্দেহ করেন। পরে তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শরণাপন্ন হলে সেই চাল জব্দ হয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংস্থার হাতে যায় চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য। ব্যাপারটি সত্যি হলে মাছে-ভাতে বাঙালির জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম প্রধান। খাদ্য গ্রহণ ছাড়া মানুষসহ কোন প্রাণীই বেঁচে থাকতে পারে না। তবে সে খাবার অবশ্যই হতে হয় বিশুদ্ধ। দূষিত বা ভেজালমিশ্রিত খাদ্য মানুষের জন্য স্বাস্থ্যহানিকর হয়ে থাকে। অথচ আজকের বাংলাদেশে সেই বিশুদ্ধ খাবার খুঁজে পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজার থেকে কেনা কোন খাদ্যই যেন আর বিশুদ্ধ নেই। এমনিতেই বাজারের ৮৫ শতাংশ মাছে মরমালিন মিশিয়ে মাছের পচন রোধ করে বিক্রি হওয়া মাছ খেতে খেতে দেশের মানুষ অনেকটা তাজা মাছের স্বাদ ভুলেই গেছেন। প্রকৃতি প্রদত্ত সাকসবজিতে বিষাক্ত স্প্রে, সব ধরনের ফলমূল দ্রুত পাকিয়ে রঙিন বানাতে সর্বত্রই কার্বাইড, ইথোফেন, আর ফরমালিন প্রয়োগ করা হচ্ছে। নকল ও ভেজাল ওষুধে ছেয়ে গেছে বাজার। অপারেশনের কাজে ব্যবহৃত প্যাথেডিনসহ নানা ধরনের জীবন রক্ষাকারী ওষুুধ বাজারজাত করে চলেছে ভেজালচক্র। জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য পানিও আজ দূষিত। জারের পানির মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশই জীবাণুপূর্ণ বলে ইতিপূর্বে জানা যায়।

রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের খাবারের দোকানে, রেস্তোরাঁয় ভেজালমিশ্রিত খাদ্যের ছড়াছড়ি। অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে ভোক্তাদের অখাদ্য-কুখাদ্য পরিবেশন করা হয়ে থাকে। খাবার রান্নার জন্য ব্যবহার করা হয় পুরনো পোড়া নিম্নমানের তেল। খাদ্য প্রস্তুতের উপাদান মসলায়ও থাকে বিষাক্ত রংসহ নানা ধরনের ভেজাল। রাস্তার পাশের কম দামের খাবারের দোকানগুলোর অবস্থা আরও করুণ। সম্প্রতি রাজধানীর কিছু রেস্তোরাঁর পরিবেশ ও খাবারের মানভেদে বিভিন্ন রঙের স্টিকার লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। খারাপ মানের রেস্তোরাঁকে সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে তাদের মানোন্নয়ন করে স্টিকারের রঙ বদলের। তাতে কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয় না। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহকৃত ৪৩ ধরনের খাদ্যপণ্যের মোট ৫ হাজার ৩৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে ২ হাজার ১৪৭টি নমুনাতেই মাত্রাতিরিক্ত ভেজালের উপস্থিতি ধরা পড়ে। মহাখালীস্থ পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের খাদ্য পরীক্ষাগারে দেশের ৫৪ ভাগ খাদ্যপণ্য ভেজাল ও দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করা হয়। দেশের ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশের খাবারের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। পোলট্রি ফার্মের ডিমে ট্যানারি বর্জ্যস্থিত বিষাক্ত ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। আটায় মেশানো হচ্ছে চক পাউডার বা ক্যালসিয়াম কার্বনেট। আনারসে হরমোন প্রয়োগ করে দ্রুত বৃদ্ধিও প্রক্রিয়া চলে আসছে। আম গাছে মুকুল ধরা থেকে শুরু করে আম পাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে রাসায়নিক ব্যবহার এখন ওপেনসিক্রেট। মিষ্টি জাতীয় খাবারে ব্যবহার করা হয় বিষাক্ত রং, সোডা, সেকারিন, মোম। মসলায় কাপড়ের বিষাক্ত রং, ইট ও কাঠের গুঁড়া মেশানো হয়।

বিশ^ সাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, প্রতি বছর বিশে^র প্রায় ৬০ কোটি মানুষ ভেজাল ও দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়। এর মধ্যে মারা যায় চার লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এ ছাড়াও দূষিত খাবারজনিত কারণে ৫ বছরের কম বয়সের আক্রান্ত হওয়া ৪৩ শতাংশ শিশুর মধ্যে মৃত্যুবরণ করে ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু। পরিবেশ বাঁচাও অন্দোলনের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতি বছর দেশে ৩ লাখ লোক ক্যানসার নামক মরণব্যাধিতে, ২ লাখ লোক কিডনি রোগে, দেড় লাখ লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ ১৫ লাখ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মদান করেন। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে হেপাটাইটিস, কিডনি, লিভার ও ফুসফুস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। ২০১৫ সালে দিনাজপুরে কীটনাশক মিশ্রিত লিচুর বিষক্রিয়ার ৮ এবং ২০১২ সালে ১৪ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটে। বিষাক্ত প্যারাসিটামল খেয়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ২০১৩ সালে সালে দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে বিষাক্ত খাবার গ্রহণের ফলে ১৪ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ২০০৯ সালে ধামরাইয়ে ৩ শিশু মারা যায় বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া ও ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ১৪ বছরের কারাদন্ডেরও বিধান রয়েছে সে আইনে। ২০১৫ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও গঠন করা হয়েছে। মাঝে মধ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলেও ভেজাল দানকারী চক্রকে দমন করা যাচ্ছে না। খাদ্যপণ্যে ভেজাল প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব বিএসটিআইয়ের। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বাস্থ্য অধিদফতর, জেলা প্রশাসন, র‌্যাব, পুলিশসহ ৬টি মন্ত্রণালয়ের ১০টি বিভাগ ভেজাল বন্ধের দায়িত্বে নিয়োজিত। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার স্বাস্থ্য বিভাগেরও এ ব্যাপারে ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অভাবে ভেজাল প্রতিরোধ কার্যক্রম সফল হচ্ছে না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামান্য জেল, জরিমানার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভেজাল পণ্য উদ্ধার ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতায় ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা আজ থমকে গেছে। খাদ্যকে বিষমুক্ত রাখতে ‘ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ বিল-২০১৫’-এ ফরমালিনের ব্যবহার রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং সর্বোচ্চ ২০ লাখ ও সর্বনিম্ন ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান হয়েছে। এ আইনে ফরমালিন বিক্রয়ের দোকান সাময়িকভাবে বন্ধসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। আইন অনুসারে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ছাড়া ফরমালিন উৎপাদন, আমদানি, মজুদ, বিক্রয়, পরিবহন এমনকি ব্যবহার বা দখলে না রাখার নির্দেশনা দেয়া আছে। কিন্তু এ সবের কার্যকারিতা খুবই সামান্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি নিরাপদ খাাদ্য দিবস-২০১৯ উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণমানুষের জীবন রক্ষার্থে খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রদান বন্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য একটি কর্তৃপক্ষ করে দিয়ে লোকবল সমস্যা সমাধানের ও আ্‌বাস দিয়েছেন। দেশের সর্বত্র যেন নিয়মিত ভেজাল প্রতিরোধে ব্যবস্থা গৃহীত হয় সে ব্যাপরেও তার অভিমত ব্যক্ত করেছেন। দেশের মানুষের জন্য ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে অসাধু ব্যবসায়ীদের দমনে অভিযান নিয়মিত থাকলে তাদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমে যাবে। এ জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ভেজালের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি। ভেজালের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে অতি মুনাফালোভী, অসাধু খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে পারলে ভেজালের বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহিষ্ণুতার সুফল দেশের আপামর জনগণ ভোগ করতে সক্ষম হবে।

[লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক]