menu

কৃষিশুমারির গুরুত্ব

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯

নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ও উদ্যোগ রয়েছে। তার মধ্যে কৃষিশুমারি অন্যতম। এতদাঞ্চলে ১৯৬০ সালে প্রথমবারের মতো নমুনা আকারে কৃষিশুমারি অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭৭ সালে প্রথম কৃষিশুমারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছর, ১৯৯৬ সাল এবং ২০০৮ সালে সর্বশেষ কৃষিশুমারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ৯ থেকে ২০জুন পর্যন্ত সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের কৃষিশুমারি। দেশের ইতিহাসের ষষ্ঠ এ কৃষিশুমারি-২০১৯ এর স্লোগান হলো, ‘কৃষিশুমারি সফল করি, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ি’। এতে পল্লী এলাকায় গড়ে ২৪০টি খানা (পরিবার), পৌরসভা এলাকায় গড়ে ৩০০ খানা, সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৫০টি খানা নিয়ে একটি গণনা এলাকা গঠন করা হয়েছে। এভাবে সারাদেশে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ২১১ জন গণনাকারী কাজ করছেন। নির্ভুলভাবে তাদের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য তিন স্তরের প্রয়োজনীয় সংখ্যক সুপারভাইজার, তদারককারী ও সমন্বয়কারী নিযুক্ত করা হয়েছে।

কৃষিশুমারিতে কৃষিখানার সংখ্যা, খানার আকার, ভূমির মালিকানা, কৃষির প্রকার, শস্যের ধরন, চাষ পদ্ধতি, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগির সংখ্যা, মৎস্য খামার, কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত জনবল সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাছাড়াও দেশের কৃষি ক্ষেত্রে ভূমির ব্যবহার, চাষযোগ্য জমির প্রকার, ফসলের বৈচিত্র, কৃষি উপকরণ, সেচ যন্ত্রপাতি সম্পর্কিত পরিসংখ্যান, কৃষিবিষয়ক নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ, কৃষি ও পরিবেশ উন্নয়ন, সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তথ্য সরবরাহ করার লক্ষ্যে এ কৃষিশুমারির বিকল্প নেই। এর মধ্যে কৃষি জোনাল অপারেশন কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন জোনের গঠন চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তাছাড়া জিও-কোড তালিকা, মৌজা ও মহল্লা ম্যাপ যাচাইপূর্বক হালনাগাদকরণ, গণনা এলাকা নির্ধারণ ও ম্যাপে তা যাচাই-বাছাই করে চিহ্নিত করা হবে। এতে প্রথম জোনাল অপারেশন কার্যক্রমের ভুলত্রুটি সংশোধনেরও উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানা যায়।

অর্থনীতিতে কৃষির প্রকৃত অবদান নির্ণয়ে কৃষি শুমারির আয়োজন করা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে শস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের পর্যায়ক্রমিক যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। মানুষের স্বাস্থ্যের অবস্থা জানার জন্য যেমন স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজন হয় ঠিক তেমনি অর্থনীতির স্বাস্থ্যের অবস্থা জানার জন্যও তেমন কৃষিশুমারি করা হয়। এ শুমারির মাধ্যমে শুধু ধান ও পাটই নয়, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল ইত্যাদি সব কিছুরই তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস’ (বিবিএস) এ শুমারিটি পরিচালনা করছে। ছয়টি প্রধান ফসল যথা- আউশ, আমন, বোরো, গম, আলু ও পাট এবং ১২০টি অপ্রধান ফসলের হিসাব এতে নেয়া হচ্ছে। অতীতে কৃষিশুমারিতে শুধু অস্থায়ী ফসলের হিসাব নেয়া হতো, কিন্তু এবার স্থায়ী ফসলের হিসাবও নেয়া হচ্ছে।

চলতি সংসদ অধিবেশনেই (১১ জুন ২০১৯ তারিখ থেকে শুরু হওয়া) পেশ করা হচ্ছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। এ বাজেট পেশের পূর্বে কৃষিশুমারির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যাদি দিয়েই প্রণীত বাজেট বাস্তবায়ন করা সহজ ও ফলপ্রসূ হবে আগামীতে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বয়ং পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বাংলাদেশের এক নম্বর নাগরিক মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হমিদের খানা জরিপের মাধ্যমে ৯ জুন তারিখে তা উদ্বোধন করেন। দেশের যেকোন কিছুর উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন। আর পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত তথ্য। আর সেই তথ্য পাওয়ার জন্য শুমারির বিকল্প নেই। কাজেই ক্রমঅগ্রসরমান অর্থনীতির জন্য সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তদানুযায়ী বাজেট বাস্তবায়নের জন্যই এ ষষ্ঠ কৃষিশুমারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, তথ্য সংগ্রহের কাজটি কতটুকু নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হবে তার ওপর অনেককিছু নির্ভর করে। যদি তথ্যের গরমিল থাকে তাহলে পরিকল্পনা সঠিকভাবে কার্যকর করা যায় না। আরও যে বিষয়টি এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে তাড়াতাড়ি নির্ভুল একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা। দেশে বিভিন্ন সময়ে অনেক জরিপকার্য সম্পন্ন হলেও সঠিক সময়ে তার প্রতিবেদন প্রকাশিত না হওয়ার কারণে এর সুফল পাওয়া যায় না। এখানে বলা হয়েছে যে, শুমারি সম্পন্ন করার তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে। এ তথ্যপ্রযুক্তি যুগে যদিও ছয় মাস অনেক সময় তারপরও এগুলোকে আরও সহজীকরণ করে একটি স্থায়ী ডাটাবেজ তৈরির উদ্দেশ্যে পুরো বিষয়টিকেই সফটওয়্যারের আওতায় নিয়ে নির্ভুল ও কম সময়ের মধ্যে করা উচিত। আশাকরি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ ব্যাপারে যথাযথ ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন- তেমনটাই প্রত্যাশা। আর আমাদেরও উচিত সঠিক তথ্য দিয়ে তথ্য গ্রহণকারীদের সহযোগিতা প্রদান করা। তাহলেই কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ কৃষিতে আরও এগিয়ে যাবে।

[লেখক : কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়]

kbdhumayun08@gmail.com