menu

কিশোর অপরাধপ্রবণতা আগামীর অশনিসংকেত

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

দেশে কিশোর অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। ভয়ঙ্কর সব ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে উঠতি বয়সের কিশোররা। সামান্য কারণে এক কিশোর খুন করছে তার নিকটাত্মীয় বা বন্ধুকে। অতি সম্প্রতি গাজীপুরে কিশোর গ্যাং চক্রের হাতে নুরুল ইসলাম নামে এক কিশোর খুন হয়েছে। এছাড়া বরগুনার একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডে ছয় জন কিশোরদের জড়িত থাকায় ব্যাপারটি ব্যাপক আলোচনায় আসে। সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের পরিচালনায় নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতের কিশোররা এতটাই বেপরোয়া যে, অপরাধ সংগঠনের আগে এরা ফেসবুক গ্রুপে স্ট্যাটাস দেয়। তুচ্ছ ঘটনায় এরা খুন করে বসে। সম্প্রতি আশুরার একটি ঘটনায়ই এদের বেপরোয়া আচরণের প্রকাশ ঘটে। এ ভাবে সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের অশুভ তৎপরতায় সমাজসচেতন প্রতিটি মানুষ চিন্তিত। যে বয়সে কিশোরদের বই নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা ঠিক সেই বয়সে ছুরি, চাকু হাতে কিশোররা একের পর এক অপরাধমূলক কান্ড ঘটিয়ে চলেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিং, অপহরণ, ধর্ষণ, মাদকসেবন ও বিক্রি এমন কি অস্ত্র বহনসহ নানা অপরাধমূলক কাজে কিশোরদের লিপ্ত থাকার উদ্বেগজনক তথ্য মিলছে। এ সব অপরাধের পেছনে কাজ করে এক শ্রেণীর শক্তিশালী সন্ত্রাসী ও অপরাধীচক্র। কখনো বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়ও কিশোররা অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এক সময় সন্ত্রাসীচক্রের সদস্যরা শুধু দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে নিম্নবিত্ত, ছিন্নমূল পরিবারের কিশোরদের নিজেদের দলে টানতো। সাহসী ও বুদ্ধিমান কিশোরদের অথের্র প্রলোভন দেখিয়ে চুরি, রাহাজানি, ছিনতাইয়ের মতো ছোট খাট অপরাধের বাইরেও মাদক বিক্রি, অস্ত্র ও বোমা বহনের কাজে ব্যবহার করা হতো। এ কাজের জন্য ওদের দেয়া হতো লোভনীয় অঙ্কের অর্থ। সময়ের ব্যবধানে অর্থের প্রলোভনে পড়ে ধীরে ধীরে কিশোররা একসময় অপরাধজগতের স্থায়ী সদস্য হয়ে যেত। আজ শুধু নিম্নবিত্তের বাইরেও মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্তের কিশোররা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। পাড়া, মহল্লা থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে ভয়ঙ্কর সব কিশোর গ্যাং। আধিপত্য বিস্তার, মাদক সেবন ও বিপণনের স্বার্থে ওদের গ্রুপে গ্রুপে মারামারি খুনাখুনি লেগেই আছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় এমনকি গোটা সমাজব্যবস্থায়।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ছোট বড় শহরে দরিদ্র পরিবারের লাখ লাখ কিশোর বড় হয় অযতœ, অবহেলার মধ্য দিয়ে। শিশুকাল থেকে মা-বাবার স্নেহ-মমতা বঞ্চিত হয়ে ওরা পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রতিকূল পরিবেশে অবহেলা, বঞ্চনা এবং নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে এক সময় অপরাধ জগতের অন্ধকারের দিকে পা বাড়ায়। কখনো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে হয়ে ওঠে বেপরোয়া। দারিদ্র্যপীড়িত শিশু-কিশোররাই প্রথমে অপরাধ জগতের নবীণ সদস্য হয়ে কালক্রমে শীর্ষস্থানে চলে যায়। নিম্নবিত্ত ছাড়াও মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের কিশোররাও আজ অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। অর্থাভাব যেমন একটি কিশোরকে অপরাধ জগতে ঠেলে দিচ্ছে তেমনি অর্থের প্রাচুর্যও কখনো অনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাবা-মায়ের অসর্তকতার কারণে এসব কিশোররা অসৎ সঙ্গে মেশার সুযোগ করে নিচ্ছে। কখনো হয়ে পড়ছে নেশাগ্রস্ত। আজকাল ধনী পরিবারের মা-বাবা, অভিভাবক তাদের শিশু-কিশোরদের প্রতি যথেষ্ঠ খেয়াল রাখেন না। তাদের কর্মব্যস্ততার কারণে ঘরের বাইরে অধিকাংশ সময় ব্যয় করে থাকেন। বাবা-মায়ের স্নেহ-আদরের অভাব ও উপযুক্ত পরিচর্যাবঞ্চিত শিশু-কিশোররা একাকীত্বে ভোগে। এ সুযোগে তাদের মনে স্থান করে নেয় বাইরের বন্ধু-বান্ধব। আর সেই সঙ্গীরা অনেক সময় তাদের বিপথে ঠেলে দেয়। নেশাদ্রব্য গ্রহণ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে নানা অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হতে থাকে। আকাশ সংস্কৃতির অবাধ প্রবাহের এ যুগে অশ্লীল ভিডিও, ফেসবুক, ইন্টারনেটের অপব্যবহার তাদের বিপথগামী করে তোলে। মোবাইল ফোন আর কম্পিউটার ব্যবহারে ব্যস্ত কিশোর সময় কাটায় এক পরিবার বিচ্ছিন্ন জগতে। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রভাবে পরিবর্তিত বর্তমান সমাজে কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া শরীর চর্চা, খেলাধুলার সুযোগই বা বর্তমান কিশোররা কোথায় পাবে! সামাজিক-সাংস্কৃতির কর্মকান্ডের সঙ্গে ওদের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ কম। কিশোরের মনোজগতের বিকাশের জন্য অতি প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়ে এরা চলে যাচ্ছে অন্ধকার জগতে। নেশার টাকা জোগাতে ওরা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি থেকে শুরু করে জঙ্গি তৎপরতায়ও তাদের জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। কখনও কিশোর ধর্ষকের রূপে আবির্ভূত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মাদক ও অস্ত্রবহনের মতো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত কিশোররা কালক্রমে হয়ে পড়ে মাদকসেবী। ডান্ডির বদলে সেবন করে দামি সিগারেট, গাঁজা এমনকি ইয়াবা। কখনো প্যাথেড্রিন জাতীয় ইনজেকশন পুশ করে দেহে। নেশায় বুদ হয়ে ঘটিয়ে চলে নানা অপরাধ, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ। মা-বাবা, নিকটাত্মীয়কে খুন করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। অর্থের আড়ালে কখনো এদের অপরাধ লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাচ্ছে। পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ শিথিল হয়ে যাওয়া, সামাজিক অবক্ষয় ও অস্থিরতাকে আজ কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আজকাল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো মানুষের বড্ড অভাব। কিশোর তো দূরে থাক পূর্ণবয়স্করাও অন্যায়, অপরাধ সংঘটিত হতে দেখেও পাশ কাটিয়ে চলে যান। কিন্তু দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে কারো শেষ রক্ষা হয় না। তাই যে যার অবস্থান থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, প্রতিরোধে এগিয়ে আসা প্রতিটি সচেতন মানুষের নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব। তাই শিশু-কিশোরদের প্রতি আমরা সবাই যতœশীল হই, হোক সে নিজের কিম্বা অন্যের। আজকের কিশোর আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। দিনে দিনে বেড়ে ওঠে কিশোর পরিণত বয়স্ক হয়। অনুকূল পরিবেশ পেলে ধীরে ধীরে তাদের মনে চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটে। বিদ্যা-বুদ্ধি-মননে, প্রগতিশীলতায় সমৃদ্ধি লাভ করে। দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা অর্জনেও সক্ষম হয়। সমাজ গঠনে রাখতে পারে সক্রিয় ভূমিকা। তাই দেহমনের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য প্রতিটি শিশুর জন্য প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিক পরিচর্যা, অফুরন্ত আলোকময় পরিবেশ। দেশের অসংখ্য শিশু-কিশোরদের অপরাধ জগৎ থেকে বের হয়ে আলোর পথে ফিরে আনতে রাষ্ট্র দায়বদ্ধ। দেশের অধিকার বঞ্চিত শিশু-কিশোরদের প্রয়োজনীয় খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, বস্ত্র এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। ওদের সামাজিক নিরাপত্তা ও বাঁচার ন্যূনতম অধিকার দিতে হবে। দৃঢ় করে তুলতে হবে পারিবারিক বন্ধন। মাদক থেকে কিশোরদের দূরে রাখার পদক্ষেপ নিতে হবে। মাদকের সঙ্গে অপরাধপ্রবণতার এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু-কিশোর উপযুক্ত শিক্ষা নিয়ে যোগ্যতা অনুসারে কাজ করার সুযোগ পেলে কখনই ওরা অপরাধে জড়াবে না। সমাজের বোঝাও হবে না। বরং দেশ ও জাতি গঠন বাংলাদেশের সব স্তরের কিশোর রাখতে সক্ষম হবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। এ জন্য সর্বস্তরের শিশুর জন্য সুশিক্ষাদানের ব্যবস্থা নিতে হবে। নিম্নবিত্তের শিশুদের জন্য স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে। গ্রাম-গ্রামান্তরে প্রতিটি শিশু-কিশোরের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টিদান নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলা ও বিনোদন সুবিধা দিতে হবে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মা-বাবারা সন্তানের প্রতি যথেষ্ঠ সচেতন হবেন। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, সে বিষয়ে মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে। অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়লে তাকে কাউন্সিলিং করাতে হবে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের ভাবের আদান-প্রদান বাড়িয়ে ওদের চাহিদা বুঝতে হবে। শিক্ষার পাশপাশি সাংস্কৃতিক পরিম-লে উন্নত চিন্তা-চেতনা নিয়ে ওদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাহলেই এ দেশের কোন কিশোর আর অপরাধের দিকে না ঝুঁকে বরং আলোর পথে হাঁটতে শুরু করবে। দেশের একটি কিশোরও যেন অপরাধী হয়ে না ওঠে সে দায়-দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

[লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক]