menu

করোনাকালে নারী ও শিশুর প্রতি বেড়েছে সহিংসতা

ফারিহা হোসেন

  • ঢাকা , বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২০

প্রাণঘাতি করোনার এ বৈশ্বিক মহামারী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সব হিসাব-নিকাশ-রুটিন বদলে দিচ্ছে। বদলে যাচ্ছে মানুষের মানসিকতা, মানবিকতা। পিতা-পুত্রে, স্বামী-স্ত্রীতে, ভাইবোনের মধ্যে চিরন্তন ভালোবাসার যে বন্ধন তাতেও যেন ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিরন্তন এই সম্পর্কে, ভালোবাসার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে ফাটল ধরেছে। করোনায় মৃত প্রিয় স্বজনকে একনজর দেখা, তার চিরবিদায়ের আয়োজনে থাকছে না আপন কেউ। এতেই প্রমাণ হয়, করোনায় কেড়ে নিয়েছে মানুষের মানবিকতা, অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসার সবটুকুই। এ পর্যায়ে পুলিশ, আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানেই অধিকাংশ করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির লাশ দাফন, সৎকারের উদ্যোগ নিতে হচ্ছে। এর ব্যতিক্রমও আছে তবে তা সংখ্যা খুবই নগণ্য। আবার এই করোনাকালে অনেক সময় পুরুষ, কর্মক্ষম ব্যক্তিকে বাসা, বাড়িতে থাকতে হচ্ছে বলে এই সময় নারী, শিশুর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, নীপিড়ন বেড়েছে। এমন কি এ সময় স্ত্রী শুধু টেলিফোনে অন্যের সঙ্গে কথা বলার অপরাধে স্বামীর নির্যাতনে প্রাণ দিতে হয়েছে-এমন নজিরও রয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক অভাব অনটনে পড়ে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক অপ্রাপ্ত, অল্প বয়স্ক মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

নারী, শিশু নিয়ে কাজ করে এমন ২৪টি সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে দেশের ২৭ জেলার ৫৮ উপজেলার ৬০২টি গ্রাম ও ৪টি সিটি করপোরেশনের ১৭ হাজার ২০৩ জন নারী ও শিশুর সঙ্গে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিচালিত জরিপে এ ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। কিন্তু এটা কখনো সভ্য সমাজের জন্য, সভ্য মানুষের জন্য কাম্য হতে পারে না। করোনার এই মহাদুর্যোগে নারী, শিশু, মা, বয়স্কদের ক্ষেত্রে একটু মানবিক, উদার, বন্ধুবৎসল, বন্ধু সুলভ আচরণণই কাম্য। কারণ আজ যে শিশু আগামী দিনে সেই হবে আমাদের সমাজ, দেশের কা-ারী।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮৪৮ নারী, মানসিক নির্যাতনের শিকার দুই হাজার আট, যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৫ জন, এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক হাজার ৩০৮ জন নারী। এর বাইরে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন চারজন নারী, হত্যা করা হয়েছে এক জনকে এবং যৌন হয়রানি করা হয়েছে ২০ জন নারীকে। উত্তরদাতা চার হাজার ২৪৯ শিশুর মধ্যে ৪২৪ জন শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। বাল্যবিয়ে হয়েছে ৩৩টি এবং অন্যান্য হিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২টি। চারটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ১৬ জনকে ধর্ষণ চেষ্টা করা হয়, অপহৃত হয়েছে দুজন, যৌন হয়রানির শিকার ১০ জন এবং ত্রাণ নেয়ার সময় ১০ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। জরিপে অংশ নেয়া এক হাজার ৬৭২ নারী এবং ৪২৪ শিশু আগে কখনও নির্যাতনের শিকার হয়নি। শিশুদের মধ্যে শতকরা ৯২ ভাগ তাদের বাবা-মা ও আত্মীয়দের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে।আর নারীরা বেশিরভাগই স্বামীর হাতে। যৌতুক না পেয়ে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার করেছেন তার শশুরবাড়ির লোকজন। জমি লিখে না দেয়ায় ঠাকুরগাঁয়ে নাসিম উদ্দিন নামে এক জনের বিরুদ্ধে তার বৃদ্ধা মাকে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্যাতন সইতে না পেরে ছেলের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করেন।

আবার সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (যেমন : ফেসবুক, টুইটার), নারীর প্রতি বিদ্বেষ, বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য চোখে পড়ছে। চোখে পড়ে তরুণী, যুবতী নারীদের অশ্লীল ছবি আপলোড করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিতে। বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের এ সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতি কটূক্তি, হয়রানি, ঘৃণা এবং বিদ্বেষের মাত্রাও বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে।

আবার করোনার মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রায় ২০০ মামলা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ধর্ষণ সংক্রান্ত, তার পর রয়েছে যৌতুক, অপহরণের মতো অপরাধমূলক ঘটনা। অবশ্য মনোবিজ্ঞানীদের মতে করোনায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আয় রোজগার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় নারী, শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। কারণ এই সময়কালে কর্মহীন পুরুষ বেশিরভাগ সময়ে ঘরে থাকায় এসব ঘটনা ঘটছে। আবার করোনাকালে দেশে ৬৫ শতাংশ পরিবারে নারী ও শিশু পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ঘরে আটকে পড়া, কাজ না থাকা, আয় কমে যাওয়া, খাবারের সংকট, ঋণের চাপসহ নানা কারণে পরিবারে বাড়ছে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। ফলে বাড়ছে পারিবারিক নির্যাতন। এর বেশিরভাগই ঘটছে শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারে।

আমাদের দেশে নারী, শিশু নির্যাতন নতুন কোন ঘটনা নয়। কিন্তু করোনার এ মহাদুর্যোগে এর মাত্রা বেড়েছে। কারণ এ সময় দীর্ঘ প্রায় তিন মাস টানা প্রায় সব কিছুই বলতে গেলে বন্ধ ছিল। এই সুযোগে পুরুষ বাসায়, ঘরে অবস্থান করায় নানা ছলছুতায় রাগ ঝেড়েছে আপন স্ত্রী, মা, বোন, শিশু সন্তানের ওপর। আবার হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নারী, শিশু, বয়স্ক, বয়োজ্যেষ্ঠদের ক্ষেত্রেও হাসপাতালে ভর্তি করানো, চিকিৎসায়, অবহেলা, অযত্ন, অথবা বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার খবরও নতুন নয়। তবে করোনাকালে এই চিত্র বেড়েছে ভয়াবহ রকমে। এটাও কাম্য নয়। বরং করোনা কালে করোনায় আক্রান্ত অথবা সন্তান সম্ভবা মা, নারী, শিশু হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য গেলে বিশেষ নজর দেয়া দরকার। কারণ একটি পরিবারকে সুরক্ষার জন্য, সন্তান লালন পালনে এখনও মায়ের বিকল্প নেই। একজন মা সুস্থ হলে সুস্থ সন্তান জন্ম দিয়ে মূলত: একটি সুস্থ জাতি গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

করোনা পরিস্থিতিতে দেশে গত ২৬ মার্চ থেকে ‘সাধারণ ছুটি’ ঘোষণা করে মানুষকে ঘরে রাখার কার্যক্রম শুরু হয়। এটি দফায় দফায় বাড়িয়ে শেষ হয় গত ৩০ মে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) গত ৬ মে এক প্রতিবেদনে বলেছে, এপ্রিল মাসে দেশে নতুন করে গর্ভধারণ করেছেন ২৪ লাখ নারী। সংস্থাটির আশঙ্কা, করোনাকালে জন্মকালীন পরিচর্যা এবং অন্তসত্ত্বা মা ও শিশুর জীবন রক্ষার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পরে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়িতে কাজের চাপ নারীকে সামলাতে হচ্ছে। বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে যে কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা মিলছে না, এর প্রভাব সবার ওপর পড়ছে। তবে নারীকে এর বড় ঝক্কি সামলাতে হচ্ছে। বাসায় কোভিড রোগী থাকলে নারীদের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকছে। আর নারী আক্রান্ত হওয়ার পর তার যতœ কে করবে, সেটা একটা বড় সমস্যা। এই লকডাউনে অনেকে গর্ভধারণ করেছেন। এখন এসব মায়ের প্রসবপূর্ব, প্রসবের সময় এবং পরবর্তী সময়ের যতেœর বিষয়গুলো চিন্তায় রাখতে হবে। হাসপাতালে কোভিড-১৯ ছাড়া অন্য রোগীদের পরিষেবা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরিষেবা কমায় আরও অতিরিক্ত ৩৮ শতাংশ প্রসব হচ্ছে বাড়িতে। এতে মাতৃমৃত্যু এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে।

আবার দেশে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ব্যক্তির হাতে সন্তান হওয়ার হার কম। তাই অপরিপক্ব হাতে সন্তান হওয়ার নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, এতে মা, শিশু দুজনেরই স্বাস্থ্য ঝুঁকি, জীবন ঝুঁকি থেকে যায়। আছে নারী, শিশুদের পুষ্টিহীনতার সমস্যা। নারী ও কিশোরীদের ওপর করোনাকালীন প্রভাব কেমন এর ওপর এক সমীক্ষা করেছে ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি বিভাগ। ব্র্যাক ১১টি জেলায় তাদের কর্ম এলাকার ৫৫৭ জন নারী-পুরুষের ওপর এ জরিপ করে। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই নারী। দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ পুরুষ ও ৮৬ শতাংশ নারী করোনার জন্য সতর্কতামূলক বার্তা পেয়েছেন। কিন্তু সুরক্ষাসামগ্রীগুলো পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীর চেয়ে পুরুষ অনেক এগিয়ে। ৭০ শতাংশ পুরুষ মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।

বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, লকডাউনে সারা বিশ্বে নারী নির্যাতন, বিশেষ করে পারিবারিক নারী নির্যাতন বেড়েছে। বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) গত মে মাসে দেশের ২৭টি জেলায় নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপ অনুসারে ২৭টি জেলায় মে মাসে ৪ হাজার ২৪৯ জন নারী এবং ৪৫৬টি শিশু নিজ ঘরেই সহিংসতার শিকার হয়েছে। এ ধরনের সহিংসতায় নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়ছে।

আয় কমে যাওয়ার কারণে সৃষ্টি হবে অপুষ্টি সমস্যা। নিম্ন আয়ের পরিবারের মা ও শিশুর অপুষ্টির বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে। অপুষ্টি পংগুত্ব থেকে শুরু করে আরও অনেক সমস্যা সৃষ্টি করে। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো যেন নজরে থাকে। করোনাভাইরাসের বিস্তারে দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষেই অভিযোগ, অসন্তোষ রয়েছে। তবে নারীদের অবস্থা আরও নাজুক। এরই মধ্যে গত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে সেখানে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় আগের বারের চেয়ে বেড়েছে। তবে এর প্রত্যাশিত ফল নারী-শিশুদের কাছে পৌঁছাতে প্রয়োজন এখন থেকে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। তবেই সরকারের উদ্দেশ্যে সাধন হবে। মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশু স্বাস্থ্য এ দুটো বিষয় করোনাকালে গুরুত্বসহ দেখা দরকার। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় সরকার, সুশীলসমাজ, চিকিৎসক, সংবাদকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সমাজপতি, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, জনপ্রশাসন আরো দায়িত্বশীল, যত্নবান, মানবিক হবেন এ প্রত্যাশা।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক]

  • করোনাকাল : বদলাচ্ছে জীবন-জীবিকা

    অলোক আচার্য

    বিশ্বে করোনার মহামারি চলছে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্য ঘিরে ধরছে পৃথিবীকে। উল্লেখযোগ্য হারে মানুষ চাকরি হারাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে