menu

এবার বিজয়ের মাসে আমাদের প্রত্যাশা

ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। এবারের মাসটি একটু ভিন্ন। কারণ এ মাসেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একদশ জাতীয় নির্বাচন। এ নির্বাচনে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি জোট বেঁধেছে। বিজয়ের মাসে দেশবাসিকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে ভোটযুদ্ধে জয়ী করে আবার বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। আমরা জানি যে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী পরাজিত শক্তি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এদেশের হাজার হাজার বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে।, ২৫ মার্চের রাত থেকেই শুরু হয় বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ এবং ১৪ ডিসেম্বর সেটার চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায়। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ সম্ভব হয়নি। তবে বাংলাপিডিয়ার সূত্রমতে, এদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ জন শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিৎসক, ৪২ আইনজীবী, ৯ সাহিত্যিক ও শিল্পী, ৫ প্রকৌশলী এবং অন্যান্য দুজন। হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এদেশীয় রাজকার আলবদর ও নেপথ্যে থাকা তাদের মদতদানকারীরা বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরও হত্যা করে। একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের কারণ উদ্ঘাটন করতে হলে পাকিস্তান আমলের সেই ২৫ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অনুধাবন করতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র শুধু যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে তা নয়, এরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যার নেপথ্যেও কাজ করেছে। তারা বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকেও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। বিরোধী চক্র বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধে স্বপক্ষের দল এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছে বারবার। দুঃখের বিষয় হলো যে, তাদের মুখেই আবার রাজনীতির নানা সেøাগান ও বক্তব্য- ভাষ্য শুনতে পাই, রাজনীতির চর্চাও দেখতে পাই। যখন আমরা এরূপ ‘স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি’ বলে কিছু দেখি তখন মনে মনে হলেও ‘স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি’ বলে যে কিছু একটা আছে তার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেই। স্বীকার করা না করার প্রশ্নও ওঠে না আবার কারণ এটি বাংলাদেশে অত্যন্ত প্রকট রূপেই বিদ্যমান আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তিকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়ে দেশে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার দাবিদার গোষ্ঠীটি রাজনীতির মাঠকে এক ভিন্নতর কৌশলের কুরুক্ষেত্র বানিয়ে ছেড়েছে! দলটির প্রতিষ্ঠাতা নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করলেও দল ভারি করার লক্ষ্যে, সমর্থন বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে, ভোট বাড়ানোর লক্ষ্যে, এক কথায় নিজেকে ক্ষমতার শীর্ষে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের সেসব বিতর্কিত ব্যক্তি ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে নিজের সেনা-ছত্রছায়ায় এনে দাঁড় করায়। এটিই বাঙালি জাতির এক বিষাদাত্মক ঘটনা- চরম বিপর্যয়। এ ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার মেরুকরণ। তার দলের লোকেরা অদ্ভুত এক ফতোয়া নিয়ে জাতির সামনে উপস্থিত হলো। বলল- ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বিপক্ষের কথা বলে বিভেদ সৃষ্টি না করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে’ (আশ্চর্য!)। এদের দেয়া ফতোয়া প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি তথা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষই অবলম্বন করেছিল। শুধু পক্ষাবলম্বনই নয়, জামায়াত, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীকে রীতিমতো ‘প্রমোট’ও শুরু করেছিল। এক পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধীদের বাড়িতে ও গাড়িতে পতপত করে উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। যে পতকা ও রাষ্ট্রটি অর্জনের জন্য ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন প্রায় চার লাখ নারী নির্যাতিত হয়েছেন। বিজয়ের ৪৬তম বার্ষিকীর প্রাক্কালেও আমরা দেখছি স্বাধীন দেশ। তবুও দেশটি এ এক অদৃশ্য মেরুকরণে আজও বিভক্ত! রাজনৈতিক মেরুকরণের পাশাপাশি সর্বজনস্বীকৃত, দেশের আইন ও সংবিধান কর্তৃক গৃহীত এবং মীমাংসিত কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য নানারূপ ‘কু-তর্ক’ উসকে দিতে দেখি। এমনকি একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ নির্বাহীর পদে আসীন থাকার পরও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধে এদেশের শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জনসমক্ষে তির্যক বক্তব্য প্রদান করেন। অথচ ২৫ মার্চ পরিচালিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এ এক রাতেই নিহত হয়েছিল ৮০ হাজারের বেশি বিভিন্ন শ্রেণীপেশার বেসামরিক বাঙালি। আর জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে অল্প সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। ২৫ মার্চের পর থেকে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে নরপিশাচের দল। মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, ৭ মার্চের ভাষণকে কটাক্ষ করে যে রাজনীতির চর্চা তা যে কখনই বর্ণিত ‘স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি’ নয় সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এভাবে ওই রাজনৈতিক দল এবং তার সঙ্গে জোটভুক্ত অন্যরাও যে প্রগতিশীল চিন্তার ধারক তা কোনভাবেই বলা যাবে না। জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ এবং তাদের আদর্শ অনুসারী কিছু সংখ্যক দল বিএনপির সঙ্গে ‘বিশ দলীয়’ নামে গোত্রভুক্ত হয়েছে। এদের কীভাবে জাতি ‘স্বাধীনতার পক্ষ’ শক্তি বলে শনাক্ত করবে? যেসব রাজনৈতিক দল আদর্শগতভাবে জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, বুদ্ধিজীবী শহীদের সংখ্যা প্রভৃতি বিষয় স্বীকার করতে চায় না তারা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিরূপে নিজেদের প্রকাশ ও প্রমাণ করবে তাও সাধারণের বোধগম্য নয়। ১৬ ডিসেম্বর সবাই যার যার মতো বিজয়ের আনন্দে মেতে উঠবে সন্দেহ নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করে এভাবে বিভিন্ন জাতীয় দিবস আর কত উদ্‌যাপন করা হবে? সুতরাং এ দ্বিধাবিভক্তি নিয়েই এবারের বিজয় দিবসের আনন্দের দিনটিও অতিক্রান্ত হয়ে যাবে। পরিশেষে বলতে চাই যে, এবারের বিজয়ের মাসে আরেকটি বিজয় চাই। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দেশের জনগণ স্বাধীনতা ও মুক্তিযোদ্ধের পরাজিত শক্তিকে ভোটযুদ্ধে পরাজিত করে আরেটি বিজয় ছিনিয়ে আনবে।

[লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধ, সাবেক কর কমিশনার ও চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন]