menu

গ্রাম-গ্রামান্তরে

এপারের দৌলতপুর ওপারের ইন্ডিয়াপাড়া : এক বৃন্তে দুটি ফুল

রুকুনউদ্দৌলাহ্‌

  • ঢাকা , বুধবার, ১৫ মে ২০১৯

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট মহকুমার বাদুড়িয়া থানার কলিঙ্গা গ্রামে আমার জন্ম। সেখান থেকে অতি শৈশবে অভিভাবকদের সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসি। এরপর ‘৭১ সালে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। তাছাড়া যে ক’বার গিয়েছি পাসপোর্ট-ভিসায়। কিন্তু গত ২৭ এপ্রিল গিয়েছিলাম বিনা পাসপোর্টে। ওই যাওয়াটা এমন ছিল যে পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে না গেলেও অপরাধ হয়েছে বলে মনে হয়নি। সে এক মজার ঘটনা। সঙ্গে ছিলেন আমার একমাত্র পেশাগত বন্ধু শাহাদত হোসেন কাবিল ও সংবাদের চৌগাছা প্রতিনিধি আজিজুর রহমান। শাহাদত হোসেন কাবিল বললেন, এ আমার প্রথম ভারতের মাটিতে পা দেয়া। পাসপোর্ট নেই, ভিসা নেই, ইমিগ্রেশনের ঝামেলা নেই, নেই কোন তল্লাশি। দিব্বি গেলাম, ঘুরে ফিরে সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা-বার্তা বললাম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আবার বাধাহীনভাবে ফিরে আসলাম। ভালোই তো লাগলো।

মূলত গিয়েছিলাম যশোরের সীমান্ত উপজেলা চৌগাছার সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তোতা মিয়ার দৌলতপুর গ্রামের বাড়িতে। তিনি ২২ বছর একটানা সুখপুকুরিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ইউপি চেয়ারম্যান দুই টার্ম। তোতা মিয়ার বাড়ি একেবারে সীমান্ত লাগোয়া। জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ গ্রামটি। এর মধ্যে যশোর থেকে চৌগাছা ২০ কিলোমিটার।

চেয়ারম্যানের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনার এক ফাঁকে আসলেন অশীতিপর এক বৃদ্ধ। এত বয়স হলেও গ্রাম্য কথায় এখনও টনটনে আছেন। তার নাম আবুল হোসেন। জানালেন বাড়ি ভারতে।

জানতে চাইলাম এখানে কার বাড়িতে এসেছেন?

তিনি বললেন, কার বাড়ি আবার। আমার বাড়িতে আমি থাকি।

বললাম, এখানে আসলেন কি করে?

হাত ইশারা করে তিনি বললেন, ওই তো আমার বাড়ি। সারা জীবন ইনাদের বাড়িতে আসি। ইনারাও আমাদের বাড়িতে যান। চেয়ারম্যান সাহেবের বাবার সঙ্গে আমার দোস্তি ছিল।

চেয়ারম্যান তার কথায় সায় দিলেন।

আমার যেন সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। বৃদ্ধ বলছেন ভারতে বাড়ি। আবার বলছেন ওইতো বাড়ি, সারা জীবন ইনাদের বাড়িতে আসি। ইনারা আমাদের বাড়িতে যান। এ সব কথা রহস্যঘেরা বলে মনে হচ্ছিল।

আমার মনের অবস্থা বুঝে চেয়ারম্যান তোতা মিয়া এবং আজিজুর রহমান বললেন, এখানে বাংলাদেশ ও ভারত একাকার। বাংলাদেশের অংশের গ্রামটির নাম দৌলতপুর এবং ভারতের অংশের গ্রামটির নামও দৌলতপুর। ১৯৪৭ সালে ভাগাভাগির সময় গ্রামটি দু’ভাগ হয়ে গেছে। সীমান্ত পিলার দিয়ে চিহ্নিত করা আছে মাত্র। ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিলেও এ অংশে এখনও এ বেড়া দেয়নি।

অবস্থানটা এমন যে সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের পশ্চিমাংশ ছুরির ফলার মতো ভারতের ভেতর ঢুকে গেছে এবং তার পরিধিও বেশি না। এ কারণে দৌলতপুরের পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্বপাশে ভারত পড়েছে। বাংলাদেশ অংশে দৌলতপুরের যে রাস্তা সেটি সীমান্ত বরাবর। পূর্বপাশে রাস্তার গা ঘেঁষে সীমান্ত পিলার। এতে দেখা যায় ভারতের কোন গাছ থেকে যদি পশ্চিম দিকে ফল পড়ে সেটি পড়ে বাংলাদেশে। শুধু তাই নয় বাংলাদেশিদের জমির সীমানায় ভারতীয়দের যে জমি তাতে যে গাছটি আছে তার ডালপালা বাংলাদেশিদের জমিতে এসেছে। অনুরূপভাবে বাংলাদেশিদের গাছের ডালপালাও ভারতীয়দের জমিতে গেছে। এ নিয়ে কোন সমস্যা নেই। মিলে মিশে আছে সবাই। মিলমিশটা এমন যে রান্নার সময় যদি দেখা যায় কারও বাড়িতে মরিচ, লবণ ইত্যাদি নেই তাহলে চিরাচরিত প্রতিবেশী জীবনযাপনের মতো বাংলাদেশিরা পাশের ভারতীয়র বাড়ি থেকে চেয়ে আনছে। আবার ভারতীয়রা বাংলাদেশিদের বাড়ি থেকে নিচ্ছে। পরে বাজার থেকে এনে শোধ করেও দিচ্ছে। ক্ষেত-খামারে পাশাপাশি মিলে মিশে সবাই কাজ করছে। এ গ্রামের মানুষ দুটি ভিন্ন দেশের নাগরিক হলেও সেই ৪৭ সালের আগের মতো সবাই মিলেমিশে বসবাস করছেন। দুই দেশের মানুষের মসজিদ, ঈদগাহ এক। সবাই একই স্থানে নামাজ আদায় করেন। আবার অনেকে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ভারতীয় নাগরিকরা অবাধে বাংলাদেশের এ অংশে এবং বাংলাদেশিরাও অবাধে যেতে পারে তাদের অংশে। একই মাঠে বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকরা চাষাবাদ করছেন। চাষাবাদে কৃষি উপকরণ বাংলাদেশ থেকে কিনে ক্ষেতে ব্যবহার করছেন। ক্ষেতমজুর কাজে লাগাচ্ছে। তারা নামেই শুধু ভারতীয়। দেখলে কেউ ভাবতে পারবে না তারা দু’দেশের নাগরিক। আর রাস্তা থেকে পশ্চিম দিকে খুব দূর নয় আনুমানিক ২০০ গজ হবে ভারত সীমান্ত বরাবর কাটা তারের বেড়া।

দূর থেকে কেউ ভাবতে পারে চৌগাছায় বাংলাদেশ-ভারত সীমন্তের অবস্থা যখন এ তাহলে তো চোরাচালান অতি সহজ। ব্যাপক আকারে না হোক স্বল্পমাত্রায় অতি প্রয়োজনীয় জিনিষ তো ইন্ডিয়াপাড়া থেকে আনা যায়। এমন ভাবাটাই স্বাভাবিক। তবে এ সুযোগ সেখানে নেই। কারণ ওই পাড়ায় ভারতীয় কোন জিনিষ পাওয়া যায় না। ভারতের অভ্যন্তর থেকে ব্যাপক পরিমাণ পণ্য ইন্ডিয়াপাড়ার বাসিন্দারা আনতে পারে কি নাÑ তা জানার চেষ্টা করিনি। তবে স্বাভাবিকভাবে মনে হয় আমাদের পারে মাঝে মধ্যে সীমান্ত থেকে ২০-৩০ কিলোমিটার দূরে ইলিশ মাছ যেমন আটকানো হয়, তেমনি সেখানেও এমনটা হতে পারে। সেখানে শুধু পাওয়া গেল কুম্ভী পাতার বিড়ি। কৌতূহল বশত সেটা ৩০ টাকায় দু’প্যাকেট কিনেছিলাম। তবে মজার ব্যাপার হলো ওই বিড়ি শাহাদত হোসেনের কাবিলের ব্যাগে রাখতে গেলে তিনি রাজি হলেন না। বললেন, পথে বিজিবি চেক করার সময় আমার ব্যাগে এ বিড়ি দেখলে আমাকে বিড়ম্বনায় ফেলবে। অবশ্য শেষমেষ তিনি তার ব্যাগে বিড়ি রেখেছিলেন এবং পথে বিজিবির চেকও ছিল না, ঝামেলায়ও পড়তে হয়নি।

বাংলাদেশে ও ভারত সীমান্তের এমন অবস্থার কারণেই সম্ভবত চৌগাছায় মুক্তিযুদ্ধের বড় ঘটনা এখানে ঘটেছিল। বললে অত্যুক্তি হবে না চৌগাছার পথেই দেশের স্বাধীনতা আসে। প্রমাণিত সত্য যে যশোর প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা। আর এই জেলাটি শত্রুমুক্ত হয় চৌগাছার পথে যুদ্ধের মাধ্যমে। চৌগাছা সীমান্ত থেকে যশোর সেনানিবাসের দূরত্ব অন্য সব সীমান্ত থেকে কম। যশোর সেনানিবাসকে টার্গেট করে মুক্তি ও মিত্র বাহিনী চৌগাছার পথে যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। চৌগাছার মাঠে-মাঠে, গ্রামে-গ্রামে মিত্র ও শত্রু বাহিনীর স্থল ও বিমান যুদ্ধ হয়েছিল। হয়েছিল মল্লযুদ্ধও।

আলোচিত ভারতীয় অংশের পরিচিতি এখন ইন্ডিয়াপাড়া বলে। এটি ভারতের মামাভাগ্নে মৌজার অন্তর্ভুক্ত। আমরা গিয়েছিলাম ওই পাড়ায়। যাওয়ার আগে ইতস্তত করছিলাম সেখানে গেলে আইনগত জটিলতায় পড়ব কি না। বিএসএফ এসে ধরবে কি না। বিজিবি বাধা দেবে কি না। এপার ওপারের সবাই বললেন, কোন সমস্যা নেই। তাদের কথায় সাহস নিয়ে গেলাম সেখানে। এই ইন্ডিয়াপাড়ায় বর্তমানে ২০ ঘর লোকের বাস বলে জানালেন, আবুল হোসেন। এ গ্রামের লোকসংখ্যা শতাধিক হবে। সবাই মুসলমান। তারা নিত্যদিনের সব প্রয়োজনে ছোটেন দু’কিলোমিটার দূরের ভারতের বাগদায়। তিনি বয়স্কভাতা ভাতা পান মাসে এক হাজার টাকা করে। তা বাগদায় গিয়ে আনতে হয়। হাসপাতালের চিকিৎসাটাও ফ্রি। তার জন্যও বাগদায় যেতে হয়। তখন তাদের আইডি কার্ড বিএসএফের কাছে জমা দিয়ে যেতে হয়। ফিরে আসার সময় সেটা ফেরৎ আনতে হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে তারা বাংলাদেশের মসজিদ ও ঈদগাহে নামাজ পড়েন। বিয়ে-সাদি হচ্ছে দু’দেশের ছেলেমেয়েদের।

বাংলাদেশের দৌলতপুরে শ’খানেক পরিবারের লোক সংখ্যা তিন শতাধিক হবে বলে জানান, চেয়ারম্যান।

ইন্ডিয়াপাড়ার অনেকে বললেন, অফিস-আদালতের কাজের বাইরের প্রয়োজন বাংলাদেশের বাজার-ঘাট থেকে মেটানো যায়। তবে ভেতরে গেলে এক শ্রেণির লোক আছে তারা ভারতীয় বলে আমাদেরকে ধরিয়ে দেয়। এ কারণে পারতপক্ষে আমরা ভেতরে যাইনে।

ইন্ডিয়াপাড়ায় কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। তারা সংখ্যায় কম বলে অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। লেখাপড়ার জন্য মামাভাগ্নের স্কুল ভরসা বলে জানালেন ইন্ডিয়াপাড়ার নূর ইসলাম। তিনি বলেন, বেশ দূর বলে দু’এক ক্লাস পড়ে সবাই পড়া বাদ দেয়।

ইন্ডিয়াপাড়ার সবাই কিন্তু কথা বলতে চাননি। এটা তাদের অহমিকা নয়। অহেতুক কোন জটিলতায় পড়তে হয় কি না সে ভয়ে অনেকে আমাদের এড়িয়ে যান। ছবি তুলতে চাইলে এক মহিলা প্রশ্ন করেন, আপনারা ভিন দেশের মানুষ, আমাদের ছবি তুলবেন কেন?

ওই মহিলার সঙ্গে বিতর্কে না গিয়ে ছবি তোলা থেকে বিরত থাকি।

অনেকেই জানালেন, ইন্ডিয়াপাড়ার রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ। বিদ্যুৎ নেই। ভোটের সময় ছাড়া এখানে কোন নেতা বা সরকারি কোন লোকজন আসে না। এক দেহের দুটি অঙ্গ, এক অঙ্গ সবল আর এক দুর্বল। এ কথার মতো বলতে হয় ইন্ডিয়াপাড়া দুর্বল আর দৌলতপুর সবল। এখানে বিদ্যুৎ আছে। স্কুল আছে, আছে মসজিদ ঈদগাহ। রাস্তাটি পাকা হতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুযায়ী সীমান্ত রেখার ২০০ গজের ভেতর কেউ পাকা রাস্তা করতে পারবে না। তাই দৌলতপুরের রাস্তা পাকা করতে গেলে বিএসএফ বাধা দেয়।