menu

এদেশে যানজট নিরসনে ধর্মঘট ডাকতে হয়!

মীর আব্দুল আলীম

  • ঢাকা , বুধবার, ১৬ মে ২০১৮

আজকের (১৪ মে) গণমাধ্যমের রিপোর্ট ‘যানজট নিরসনের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বাস ধর্মঘট ডাক: আশ্বাস পেয়ে প্রত্যাহার’। এদেশে যানজট নিরসনের জন্য সড়ক অবরোধের ডাক দিতে হয়। ৫/৬ ঘণ্টার পথ ১৫/১৬ ঘণ্টায় পাড়ি দিতে হলে মানুষ অবরোধ তো ডাকবেই। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি, ফেনি, মহিপালের যানজট এখন আলোচিত বিষয়। প্রতিদিন মহাসড়কের এসব স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে। এ জন্যই পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা সকাল-সন্ধ্যা বাস না চালানোর ঘোষণা দেন। কুমিল্লায় প্রায় ২০ কিলোমিটার, ফেনীতে প্রায় ২৫ কিলোটার এবং চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডু-মিরসরাই এলাকায় ২০ কিলোমিটার রাস্তায় ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে যাত্রীবাহী বাস থেকে সব ধরনের যানবাহনকে। দীর্ঘ এই যানজটকে স্মরণকালের ভয়াবহ জট বলে মনে করছেন পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট মহল। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডু-মীরসরাই, ফেনীর মহীপাল-ফতেহপুর এবং কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, দাউদকান্দি এলাকায় তীব্র যানজট লেগে থাকে। এই ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে সাধারণ যাত্রী থেকে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সবাই সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেও সুফল পায়নি। পত্রিকার রিপোর্টে দেখেছি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গত ১০ ও ১১ মে ২ দিনে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এ যানজট এতটাই চরম ছিল যে, তা অতীতের যানজটের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। বহুদেশ ঘুরেছি কোন দেশে এমন যানজট আছে বলে আমার জানা নেই। মহাসড়কে একদিকে ফেনীর ফতেহপুর রেলগেট থেকে চট্টগ্রামের মীরসরাই পর্যন্ত ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট। কুমিল্লা থেকে ফেনী পর্যন্ত দু’দিকের দীর্ঘ যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহাসড়কে আটকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের। এভাবে কি চলে?

এদেশের রাজধানী ঢাকার রাস্তা তো বারো মাসই অচল থাকে। বিশেষ করে ভিআইপি চলাচল করলে সেদিন আর গাড়ি নড়তেই চায় না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বলি আর রাজধানী ঢাকা বলি এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটের কোন কারণ নেই। কারণ হলো ট্রাফিক সিস্টেমের সমস্যা। ঢাকার যানজট প্রকট হয় ভিআইপিদের জন্য। কোন ভিআইপি সড়কে চলছেন তো শুধু সড়কের যানবাহন নয় মানুষ পর্যন্ত আটকে রাখা হয়। এটা শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। এ অবস্থায় ভিআইপিরা হেলিকপ্টার ব্যবহার করলেই পারেন। একজন ভিআইপির জন্য ১ কোটি মানুষ কেন দুর্ভোগে পরবেন? প্রশ্ন হচ্ছে, এখন যদি যানজটের এ অবস্থা হয় তাহলে সামনে ঈদুল ফিতরের আগে কি অবস্থা হবে? ঈদে ঘরমুখো মানুষের কষ্ট যে চরম আকার ধারণ করবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। অভিযোগ রয়েছে, দাউদকান্দি টোল প্লাজায় টোল আদায়ের সময় অহেতুক বিলম্বের কারণেও দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে জটিলতা দূর করার জন্য টোল আদায়ে আধুনিক পদ্ধতি চালুসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। টোল প্লাজাগুলোতে দ্রুত টোল আদায়, সেতু, কালভার্টগুলোকে ফোর লেন উপযোগী করা, চলমান নির্মাণ ও সংস্কার কাজগুলো জরুরি ভিত্তিতে দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের স্থায়ী সমাধান করতে হলে এর কোন বিকল্প নেই, নইলে যানজট মহাযানজটে পরিণত হবে। যাত্রীদের অসহনীয় ভোগান্তির কারণ নাকি, ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা, সড়কে অবৈধ পার্কিং, হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজি। দাউদকান্দি টোল প্লাজা, কুমিল্লার পদুয়ার বাজারসহ প্রায় ১৩টি স্থানে মহাযানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকতে হয় এ পথে চলাচলকারী যাত্রীদের। যানজট নিরসনের লক্ষ্যেই মহাসড়কটি চার লেন বিশিষ্ট করা হয়। এর পরও এ মহাসড়কে যাতায়াত নিরবচ্ছিন্ন যানজটে দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে কেন? এ মহাসড়কে প্রতিদিন যানজটে লাখো মানুষের হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। জ্বালানি অপচয় হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। ট্রাফিক আইন না মানা, পরিকল্পনার অভাব, ফুটপাত দখল, পরিবহনের সংখ্যা স্পুটনিক গতিতে বৃদ্ধি পাওয়াও যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে সড়কে গাড়ি থামিয়ে ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজিসহ নানা অনিয়মকে দায়ী করছেন অনেকে। সড়কে যেখানে-সেখানে পার্কিং, ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো ইত্যাকার সমস্যা তো বহু পুরনো। এসব কারণে কিছুতেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

যানজট পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। যানজট সমস্যার সমাধানের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ইতোমধ্যে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। এত কিছুর পরও যানজট সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি এখনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এভাবে পথে আটকে থেকে কত কর্ম ঘণ্টা খোয়াবে মানুষ? আসলে আমাদের দেশটার কোন গতি নেই; আছে দুর্গতি। যানজটের যে অবস্থা তাতে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত ঢাকার মানুষকে মোটমাট কত বছর রাস্তায় আটকে থাকতে হয়? এক হিসাবে তা সাড়ে সাত বছর। অস্ট্রেলিয়ার যাত্রীরা যাতায়াতে সপ্তায় ব্যয় করেন ৩ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট। আমাদের রাজধানী ঢাকায় নাকি প্রতিদিনই লাগে কমপক্ষে ৩ ঘণ্টা। ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে বাড়তি সময় লাগে প্রায় ৪ ঘণ্টা। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৬৮ বছর। এ হিসেবে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত যাতায়াতের সময়ের আনুমানিক যোগফল হবে কমসে কম সাড়ে সাত বছর। এটা গায়েবি গজব নয়, মনুষ্যসৃষ্ট আজাব। যানজটের এ আজাব থেকে আমরা মুক্তি চাই। আমাদের যতটুকু সড়কপথ আছে তাতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নানাবিধ পদক্ষেপ নিলে যানজট ৮০ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব। আমরা বিশ্বের বড় বড় শহর এমনকি হজের সময় মক্কা, মদিনা; অলিম্পিক গেমসহ নানা বড় আসরের সময় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সে সময় কত সহজেই না যানজট নিয়ন্ত্রণ করছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এবং ঢাকা মহানগীরর যানজট, পার্কিং সমস্যা এবং জনদুর্ভোগের পরিপ্রেক্ষিতে আশু করণীয় হলো যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, সড়ক মহাসড়কে অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য জরিমানার ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন জায়গা পাকিং তৈরি ও সময়ের মূল্যানুসারে পার্কিং ফি নেয়া, পার্কিং থেকে প্রাপ্ত অর্থ পাবলিক পরিবহনের মানোন্নয়নে ব্যয় করা। সর্বোপরি আমাদেও ট্রাফিক ব্যবস্থার মানউন্নয়ন করা গেলে যানজট নিরসন সম্ভব।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার থেকে নামার পরই যানজটের শিকার হতে হয়। শনিরআখড়া থেকে কাচপুর ব্রিজ এবং কাচপুর ব্রিজ থেকে মেঘনা ব্রিজ পর্যন্ত ৩০ মিনিটের পথ যেতে ৬ ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে। এর ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বিশেষ করে সপ্তাহের ছুটির দিন বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই শুরু হয় প্রচন্ড যানজট যা শুক্রবার ও শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত থাকে বলে হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা জানান। এছাড়া সড়কের বিভিন্ন স্থানে সংস্কারের নামে রাস্তা কেটে রাখার কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর এলাকায় প্রায় ৮০ মিটার সড়ক খুঁড়ে রাখা হয়েছে কয়েকদিন থেকে। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ থেকে কুমিল্লার দাউদকান্দি পর্যন্ত প্রায় ৩৩ কিলোমিটার অংশজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মহাসড়কের কুমিল্লার অংশের দাউদকান্দি টোল প্লাজা থেকে শহীদনগর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কে প্রতিদিনই শত শত যানবাহন যানজটে আটকে থাকে। এদিকে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর ও মোগরাপাড়া এলাকায় সড়ক সংস্কার কাজের কারণেও

ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মহাসড়কের দু’পাশে হাজার হাজার গাড়ি আটকে থাকে দীর্ঘসময়। ফেনী থেকে ঢাকার দূরত্ব ১৫৫ কিলোমিটার। ফেনী থেকে ঢাকার এ দূরত্ব অতিক্রম করতে অতীতে সাধারণত সাড়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগার কথা। যানজটের কারণে এখন সময় লাগে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা। রাতদিন মেঘনা এবং দাউদকান্দি ব্রিজে জানজট লেগেই থাকে। ব্রিজের আগে পরে ট্রাকের পার্কিং সহজেই চোখে পড়ে। সড়কের পাশে কোনভাবেই ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান দাঁড় করিয়ে রাখা যাবে না। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অপরাধের শাস্তি কি কেউ পায়? এটি প্রয়োগের দায়িত্ব হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের। কখনো কি তারা সে দায়িত্ব পালন করেছেন? ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে গাড়ি অবাধে চলাচলের জন্য। তা হচ্ছে না কেন? মহাসড়কজুড়েই বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে ট্রাকস্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে।

এসব ট্রাকস্ট্যান্ডে সব সময়ই ট্রাক থেকে পণ্য ওঠানামা করা হয়, কোথাও খালি ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এছাড়া কাভার্ড ভ্যান, কন্টেইনারবাহী টেইলার ও রডবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে মহাসড়কটির বিভিন্ন স্থানে। চার লেনের এই মহাসড়কে প্রায় এক-চতুর্থাংশ এসব যানবাহনের দখলে চলে গেছে। বাস থামার জন্য নির্মিত ৩৩টি বাস্তবে নির্মাণ করা হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। বিভিন্ন জনবহুল এলাকা ও বাজারগুলোতে এসব বাস্তবে গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু কোনোটিতেই বাস থামার উপায় নেই। কারণ প্রতিটি বাস্তবে দখল করে ট্রাক, টেম্পো, সিএনজি স্ট্যান্ড তৈরি করা হয়েছে। এসব বাস-বেতে ৪-১০টি পর্যন্ত ট্রাক থেমে থাকে নিয়মিত। ফলে মূল মহাসড়কে থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয় বিভিন্ন বাসে।

এতে মহাসড়কটিতে বিভিন্ন বাজার এলাকায় নিয়মিতই যানজট তৈরি হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের কারণে কোন সময়সূচি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। ৩/৪ ঘণ্টা সময় বেশি লেগে যাচ্ছে। শুধু তাতে মানুষের সময়ই নষ্ট হচ্ছে না, অর্থনীতির জন্য সর্বনাশা প্রভাবও সৃষ্টি করছে এ সমস্যা। প্রতিটি যান্ত্রিক যানবাহনে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল বা সিএনজি ব্যবহৃত হয়, তার প্রায় অর্ধেকটাই অপচয় ঘটে যানজটের কারণে। অথচ চরম বিরক্তিকর এ সমস্যা থেকে যাত্রীদেও রেহাই দেয়ার তৎপরতা নেই বললেই চলে। যানজট নিরসনে হাইওয়ে পুলিশ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাকে গতিশীল করার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। রাস্তায় যত্রতত্র পার্কিংয়ের লাগাম পরাতে হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এ দুঃসহ যানজট থেকে যাত্রীদের মুক্ত করতেই হবে।

[লেখক : সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট]