menu

অরিত্রীকে ক্ষমাও করা যেত

অলোক আচার্য

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

ভিকারুননেসা নূন স্কুলের ছাত্রী অরিত্রী পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করার অভিযোগে তার সামনে তার বাবাকে অপমানজনক কথা বলার জন্য অভিমান করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। মেয়েটি হয়তো একটি অপরাধ (প্রমাণ সাপেক্ষ) করেছে এটা যেমন ঠিক তেমনি এ অপরাধের জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের নেয়া সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিপূর্ণ সেটাও ভাববার বিষয়। তাছাড়া তাকে প্রথম এরকম একটি ভুলের জন্য ক্ষমা করা যেত। অন্তত লঘু কোন শাস্তি দেয়া যেত। কারণ অরিত্রি শিক্ষকের পা ধরে তার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। এমনকি তার বাবাও ক্ষমা চেয়েছে মেয়ের ভুলের জন্য। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষের মন গলেনি। মেয়েটার মানসিক বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে তারা হয়েতো রেপুটেশনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অরিত্রীর মতো এ ভুল কেউ যাতে আর না করে তা দেখাতে চেয়েছে। শুধু মেয়েটাকেই কেউ বুঝতে চায়নি। তাকে স্কুল থেকে টিসি দেয়ার মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। স্কুলের ডিসিপ্লিন ভঙ্গ করলে শাস্তি হবে কিন্তু কোন কাজের জন্য কোন শাস্তি দেয়া উচিত তা প্রয়োগের আগে আরও ভাবতে হবে। কারণ সেই শাস্তি কাকে দেয়া হচ্ছে বা সেই ভুল সহজেই যদি সংশোধন করা যায় তাহলে বড় শাস্তির কি দরকার। অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে লঘু কোন দ- দিয়ে আরেকটা সুযোগ দেয়া যেতে পারত। এমন হতে পারত মেয়েটি জীবনে নিজেকে শুধরে নিত। কিন্তু এসব বলে আর লাভ নেই। মেয়েটি ভুল শোধরানোর জন্য আমাদের মাঝে নেই। সবার মাথায় প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে যে, একটা মেয়ে কতটা মানসিক যন্ত্রণা পেলে আত্মহননের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শিশু আর শিশুদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের আচরণে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। এ বয়সে তাদের মন অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হয় এবং ছোটখাটো অনেক বিষয়েও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। তাদের অভিমান বা রাগ বেশি হতে পারে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অরিত্রির মতো অনভিপ্রেত সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয় না।

বড়রাই সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে? যেমনটা পারেনি অরিত্রীর শিক্ষকরা। এমন কারণ তো অবশ্যই ঘটেছে যা অরিত্রির মনকে মারাত্মক আঘাত করেছে। কারণ তাদের এই একটা সিদ্ধান্ত বা আচরণ অরিত্রিকে আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আমরা যেটুকু জানতে পারি তা হলো, মোবাইল ফোন ব্যাবহার করে পরীক্ষায় নকল করার অপরাধে স্কুল কর্তৃপক্ষ অরিত্রির বাবাকে ডেকে পাঠায় এবং তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কারসহ অপমানসূচক কথা বলে। বিষয়টি অরিত্রি সহ্য করতে পারেনি এবং সে তার বাবার এ অপমানের জন্য নিজেকেই দায়ী মনে করে। যতটুকু বুঝতে পারি, বিষয়টিতে সে আত্মগ্লানিতে ভোগে। সেই আত্মগ্লানি থেকে আত্মহত্যার মতো সম্পূর্ণ অনাকাক্সিক্ষত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে ঠেলে দেয়। এ সময় তার এতদিনের পরিচিত শিক্ষকদের সম্পর্কে বহু স্মৃতি মনে আসছিল এবং আমার মনে হয় এক ধরনের অভিমান তার মনে জমা হয়েছিল। কারণ শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীর অনেক চমৎকার সময় কাটে। তার ছোট্ট এ ভুলের কারণে যে তার বাবাকে অপমানিত হতে হবে বা তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হবে তা হয়তো সে ভাবতে পারেনি। আবার এটাও হতে পারে, বিষয়টি এতদূর যেতে পারে এ নিয়ে অরিত্রি এতটা গভীরভাবে ভাবেইনি। কারণ অরিত্রির এ বয়সটা ঠিক গভীরতার বয়স নয়। এ বয়সটা আনন্দ আর উল্লাসের বয়স এবং ভুল করারও বয়স। অভিভাবক হিসেবে এটা আমরা সবাই জানি। এমনকি যারা অরিত্রিকে লেখাপড়া করিয়েছেন তারাও জানেন। অরিত্রি এ ভুল আগে কখনও করেনি এবং এটা ছিল তার প্রথম ভুল। পরীক্ষায় অসদুপায় করা যেহেতু অপরাধ তাই অরিত্রীও অপরাধ করেছিল কিন্তু তার মূল্যটা অনেক বেশি হয়ে গেল। সে তার অপরাধ সংশোধনের সুযোগটাই পেল না।

স্বাভাবিকভাবেই অরিত্রীর মৃত্যুর ঘটনাটি তার সহপাঠীরা মেনে নিতে পারেনি। তারা এ ঘটনায় দোষীদের বিচার চেয়ে আন্দোলনে করেছে। এ ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে হাইকোর্ট থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অরিত্রীর মৃত্যুর ঘটনাটি যদি আমরা একটু খতিয়ে দেখি তাহলে বুঝতে পারব সেখানে তাকে লঘু অপরাধে গুরু দন্ড দেয়া হয়েছে। অরিত্রির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দেশের একটি বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে শৃঙ্খলা রক্ষায় আইন একটু কঠিন। কিন্তু ছোটখাটো ভুলের জন্য অরিত্রীর মতো কাউকে চূড়ান্ত শাস্তি দেয়াটা ঠিক শাস্তি দেয়ার মধ্যে পড়ে না। অরিত্রীর ভুলটা ছিল এ বয়সী একটি শিশুর ভুল। স্বাভাবিকভাবেই মেয়েটিকে সতর্ক করা যেত অথবা তাকে নকল করার ক্ষতিকর দিক নিয়ে বোঝানো যেত। তাকে সেই পরীক্ষা থেকে বাদ দিয়ে শাস্তি দেয়া যেত। সাধারণত এটাই অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটে। কিন্তু দেখা গেল মেয়েটির বাবাকে ডেকে আনা হয়েছে এবং মেয়েটির সামনেই বাবাকে অপমানসূচক কথা বলা হয়েছে। এটা নিশ্চয়ই মেয়েটির প্রাপ্য ছিল না। তার অপরাধের জন্য তারা বাবাকে কথা শুনতে হবে এটাই মেয়েটি মেনে নিতে পারেনি। এর সঙ্গে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত। সব মিলিয়ে অরিত্রির মনের ওপর পাহাড়সম চাপ পড়েছিল। যা সহ্য করার ক্ষমতা তার ছিল না। অরিত্রির এ সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না। কিন্তু সময় ও পরিস্থিতি তার অনুকূলে ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই তার এ পরিণতিতে তার সহপাঠীরা অত্যন্ত মর্মাহত এবং ক্ষুব্ধ। আমি বিশ্বোস করি, অরিত্রির মৃত্যুর জন্য তার শিক্ষকরাও অত্যন্ত মর্মাহত। কারণ শিক্ষক আর মা-বাবা তো একই। তাই সম্পর্কটাও সেরকম হওয়া বাঞ্ছনীয়। এ মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। এর পেছনে দোষী শিক্ষিকাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনাটি এখানেই হয়তো শেষ হয়ে যাবে। অরিত্রীকেও ভুলে যাবে সবাই। কিন্তু শিক্ষকদের দায়িত্ব এবং ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আচরণ আরও নমনীয় করতে হবে। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মাঝে যে ব্যবধান তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষক একজন সত্যিকারের জাদুকর যাদের থাকে সহজেই আকৃষ্ট করার ক্ষমতা। আবার একদিক থেকে শিক্ষকরা খুব সাধারণ একজন মানুষ যারা তৈরি করেন অসাধারণ সব মানুষ। শিক্ষা কোন পেশা নয় বরং একটি সেবা। সমাজে অনেক সেবামূলক কাজ রয়েছে। এর মধ্য শিক্ষা অন্যতম। শিক্ষা হচ্ছে একটি ব্রত। যে ব্রত দিয়ে তিনি তার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটান। শিক্ষকের এই কাজটির সফলতা ও ব্যর্থতার মধ্যে রয়েছে দেশ ও জাতির ভবিষ্যত। তবে বর্তমানে গুটিকয়েক শিক্ষকের কর্মকান্ডে প্রায়ই এ পেশা সমালোচিত হয়। কিন্তু গুটিকয় উদাহরণ থেকে সার্বিক মূল্যায়ন করাটা বোকামি। শুধু পেশায় নিয়োজিত হলেই শিক্ষক হওয়া যায় না। শিক্ষক হতে হলে তার সম্পর্কিত গুণাবলী অর্জন করতে হবে। শুধু পোশাকে বা পেশায় শিক্ষক হয়ে কি লাভ? বাবা মা যেমন সন্তানের বুকের ভেতর বেঁচে থাকে ঠিক তেমনি করেই শিক্ষক বেঁচে থাকেন তার শিক্ষার্থীর মধ্যে। আমার অনেক শিক্ষক যেমন আজও বেঁচে আছেন আমার মধ্যে। একজন শিক্ষার্থী শিক্ষক সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করার সুযোগই পাওয়া উচিত নয়। অরিত্রীর চলে যাওয়ার পর আমরা আমাদের ভুলগুলো বুঝতে পারছি। কিন্তু অরিত্রীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু অরিত্রীর মতো আর কাউকে যেন অভিমান করতে না হয় সে বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।

[লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক]

sopnil.roy@gmail.com