menu

স্কুল ব্যাংকিং স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এক ধাপ

মো. হাবিবুর রহমান

  • ঢাকা , শুক্রবার, ১১ জানুয়ারী ২০১৯

আমি আর আমার বন্ধু তুষার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে (স্নাতক) ভর্তি পরীক্ষায় একসঙ্গে অংশগ্রহণ করি। তুষার ব্যবস্থাপনা বিভাগ আর আমি হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। আমাদের দু’জনের বাবাই রেলওয়েতে চাকুরি করেন। সেই সুবাদে আমাদের বন্ধুত্ব অনেক পুরাতন এবং নিবিড়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বাবার কাছ থেকে প্রতি মাসে আবাসিক হলে থাকা, খাওয়া এবং অন্যান্য ব্যয় বাবদ যে খরচ পাওয়া যেতো, সেখান থেকে আমার বন্ধু কিছু টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখত। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় পাঠদান শেষ করে আমরা দু’জনেই ঢাকাতে এসে পৃথক পৃথক কর্মস্থলে যোগদান করি। ছাত্রজীবনে গচ্ছিত টাকার সঙ্গে আরও কিছু টাকা যোগ করে অনেকদিন আগেই ঢাকার আদাবরে একটি ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছিল তুষার। বর্তমানে সে একটি ফ্ল্যাটের মালিক।

‘ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকতা বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল’। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকতা দিয়ে যেমন মহাদেশ এবং বিন্দু বিন্দু জল দিয়ে যেমন সাগরের সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় দিয়েও একটা বড় সঞ্চয় বা মূলধন গড়ে তোলা সম্ভব। আর এই মূলধন দিয়েই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে নিজের সঙ্গে দেশকেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। মানুষ আয় করে ভোগ করার জন্য। ভবিষ্যতের কথা ভেবে বর্তমানে অর্জিত আয়ের পুরোটাই মানুষ ভোগ করে না। আয়ের কিছু অংশ রেখে দেয় কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। এই রেখে দেয়া অংশের নাম সঞ্চয়। ব্যক্তির সঞ্চয় নির্ভর করে দূরদৃষ্টি, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদির উপর। স্কুল ছাত্রছাত্রীদের সঞ্চয়ে আগ্রহী করে তোলার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে তাদের এবং তাদের পরিবার ও সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা আণয়নের লক্ষ্য নিয়ে চালু হয়েছে স্কুল ব্যাংকিং-এর মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ।

স্কুল ব্যাংকিং-এ ছাত্রছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তারা যেন অহেতুক টাকাপয়সা নষ্ট না করে, সঞ্চয়ে আগ্রহী হয়। তাদেরকে গল্পের ছলে, কবিতার ছন্দে বুঝাতে হবে, তাদের ভেতরে সঞ্চয়ের চেতনা জাগ্রত করে তুলতে হবে। স্কুলজীবন থেকেই তারাও যেন তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে বড় সঞ্চয় তৈরি করে ভবিষ্যতের নানা দুর্যোগের হাত থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে রক্ষা করতে পারে। এছাড়া তাদের বুঝাতে হবে, তাদের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় ব্যাংকে জমা হলে, সেগুলো একত্রে বড় সঞ্চয় বা মূলধন সৃষ্টি হবে। সেই মূলধন নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, কলকারখানাতে বিনিয়োগ করলে তাতে কর্মসংস্থান হবে। সঞ্চিত অর্থ যখন উৎপাদন বাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয় তখন তাকে বিনিয়োগ বলে। আবার আয় হতেও সঞ্চয় ও বিনিয়োগ হবে। এভাবে চাকা ঘুরতে থাকবে। একে অর্থনৈতিক চাকা বলে। বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে এবং জীবনের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছাতে হলে সম্পদ বা সঞ্চয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কথায় আছে ‘দারিদ্র্য হলো অপরাধ ও বিপ্লবের জননী’। তাই ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা দিতে হবে, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় অতি আবশ্যক। তাদের বোঝাতে হবে সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দরকার সুন্দর ব্যাংকিং সঞ্চয়।

প্রথমিকভাবে ন্যূনতম ১০০ (একশত) টাকা জমা দিয়ে হিসাব খোলা যাবে। তবে যে কোনো পরিমাণ অর্থ এই হিসাবে জমা দেয়া যাবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ/ব্যাংক অফিসিয়াল/শাখার যে কোনো হিসাবধারী কর্তৃক সত্যায়িত ছবি (কমপক্ষে তিন কপি করে) প্রয়োজন হবে। ছাত্রছাত্রী সম্পর্কে স্কুল কর্তৃপক্ষের সনদ এবং অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা কমিশনার বা চেয়ারম্যান কর্তৃক ইস্যুকৃত নাগরিকত্ব সনদ গ্রহণ সাপেক্ষে হিসাব খোলা যাবে। হিসাব খোলার সময় অবশ্যই নির্বাচন করতে হবে নমিনীর ছবি হিসাব পরিচালনাকারী কর্তৃক সত্যায়িত হতে হবে এবং নমিনীর মৃত্যু অথবা প্রয়োজন অনুসারে নমিনী পরিবর্তন করা যাবে।

সরকার সব শ্রেণি পেশার মানুষকে আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে স্কুল শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাংকিং সুবিধা অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক হিসাব থাকায় ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের মনোভাব গড়ে উঠছে। স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের জনপ্রিয়তা অব্যাহতভাবে বাড়ছে। ফলে বাড়ছে স্কুল ব্যাংকিংয়ের অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ও সঞ্চয় বা জমার পরিমাণ। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকে স্কুল শিক্ষার্থীদের হিসার সাড়ে ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে। একইসময়ে সঞ্চয় ও জমার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা।

স্কুল শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং সুবিধা ও তথ্যপ্রযুক্তিগত সেবার সঙ্গে পরিচিত করানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের ২ নভেম্বর স্কুল ব্যাংকিং বিষয়ে একটি পরিপত্র জারি করে। এরপর থেকেই স্কুল পড়ুয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আকর্ষণীয় মুনাফার নানা স্কিম চালু করে। ২০১০ সালে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ কার্যক্রম শুরু হলেও শিক্ষার্থীরা টাকা জমা রাখার সুযোগ পায় ২০১১ সালে। প্রথম বছরে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয় ২৯ হাজার ৮০টি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৩৭টি হিসাব খোলা হয়। ওই সময় মোট জমার পরিমাণ ছিল ৯৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আর ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৬টি হিসাবের বিপরীতে জমাকৃত সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা।

সুনাগরিক একটি দেশের জাতীয় সম্পদ। সুনাগরিকের সংখ্যা যে দেশে যত বেশি সে দেশ তত বেশি উন্নত। আর সেই ব্যক্তিটিই সুনাগরিক যিনি বুদ্ধি, বিবেক আর আত্মসংযমের অধিকারী। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কার্যাদি সুন্দরভাবে, সুচারুভাবে সম্পাদন করার জন্য বুদ্ধি দরকার। বিবেক হলো সুনাগরিকের জাগ্রত শক্তি। আর আত্মসংযম হলো সুনাগরিকের শ্রেষ্ঠগুণ।

আমাদের সন্তানদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে আমাদের রয়েছে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ ব্যাপারে কখনোই নির্লিপ্ত থাকা উচিত নয়। ছাত্রজীবন থেকেই তাদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কেননা, আজকের ছাত্রছাত্রীরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। অর্থনীতিবিদদের মতে, অধিক সঞ্চয় থেকে অধিক বিনিয়োগ এবং অধিক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি, যা একটি সমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য একান্ত অপরিহার্য। কাজেই আমাদের সন্তানদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের এখন থেকেই সঞ্চয়ী মানসিকতায় গড়ে তোলা আমাদের কর্তব্য।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার)