menu

সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা চাই

সামসুল ইসলাম টুকু

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯
image

রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের ৫টি মৌলিক চাহিদা রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান।

অন্ন বা খাদ্য এবং চিকিৎসা যা আমাদের জীবন রক্ষার জন্য জরুরি। আর শরীর রক্ষার জন্য আমরা প্রতিদিন যে খাদ্য খাই সেটা কতটা নিরাপদ ও চিকিৎসা হিসাবে যা পাই তা প্রয়োজনের তুলনায় কতটা কম এবং কতটা বিজ্ঞানসম্মত তা জানার অধিকার আছে প্রতিটি নাগরিকের। পাশাপাশি যেটা জানা আরও জরুরি তাহলো ওই খাদ্য ও চিকিৎসার দীর্ঘস্থায়ী ফলাফল কী? আমরা গোটা জাতি হিসাবেই কোন পর্যায়ে অবস্থান করছি। খাদ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায় একটা ভয়ঙ্কর চিত্র। খাদ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে যে সংকট বিরাজ করছে অবিলম্বে সে সংকট থেকে মুক্ত হতে না পারলে জাতি হিসেবে আমরা আমাদের অসুস্থ ও দুর্বলের পরিচয় বহন করতে হবে। একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার বলেন, মুখ থেকে মলদ্বার পর্যন্ত জীবাণুমুক্ত ও নিরাপদ রাখা যায় তাহলে একজন মানুষ সুস্থ ও সতেজ থাকতে পারে। মুখ থেকে মলদ্বার পর্যন্ত যে সিস্টেম আছে সেখানে জীবাণুমুক্ত ও নিরাপদ খাবার দেয়া যায় তাহলে পাকস্থলি ঠিকমতো কাজ করতে পারে এবং ওই সিস্টেমের সঙ্গে সম্পর্কিত লিভার, গলব্লাডার, অগ্নাশয় ও প্লিহা তাতে সহযোগিতা করে এবং তাহলেই শরীরের অন্যান্য অন্ত্রগুলো অর্থাৎ কিডনি, হার্ট, ফুসফুস, ব্রেন ও রক্ত সঞ্চালন সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে সক্ষম হয় এবং সবল সতেজ দেহ গঠন সম্ভব হয়। জীবন হয় রোগবালাই মুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে আমরা মুখ দিয়ে পাকস্থলিতে কেমন খাবার দিচ্ছি। অর্থাৎ নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাবার দিচ্ছি কিনা সেটাই বিচার্য। বর্তমানে এমন কোন খাদ্যশস্য, সবজি, ফলমূল নেই যা রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক বিষমুক্ত। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ফর্মুলায় প্রস্তুত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া আজ কোন খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়না। শুধু তাই নয় ওইসব সার ও কীটনাশক উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং যাতে আমাদের দেশের কৃষকরা দীর্ঘকাল ধরে অভ্যস্ত। যেখান থেকে ফিরে আসার কোন পথ আছে বলে মনে হয় না। অর্থাৎ রোগবালাই দমন করে উৎপাদন বৃদ্ধির লোভে কৃষকরা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। প্রতিনিয়ত তার কুফলের শিকার হচ্ছে গোটা জাতি। যতই বলুক না কেন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এবং তার সুরে সুর মিলিয়ে কৃষিবিদ ও কৃষি বিজ্ঞানীরা যে ওই বিষ ক্ষতিকারক নয় এবং সেটা গ্রহণযোগ্য মাত্রাই ব্যবহার করা হয়। তবুও বিষ বিষের কাজ করেই। হয়তো খুব ধিরে কিন্তু ক্রমশ তা জীবনীশক্তিকে দুর্বল করে এবং একপর্যায়ে মানব জীবনকেই অথর্ব পঙ্গু করে দেয়। রোগমুক্ত সুস্থ মানুষের প্রচন্ড অভাব বর্তমান সমাজে। প্রতিটি বাড়িতে হার্টের রোগী, ডাইবেটিসের রোগী, শ্বাসকষ্টের রোগী ও গ্যাসের রোগী আছেই। বিষ যুক্ত খাবার তো খেতেই হচ্ছে, তার সঙ্গে ভেজাল খাবারও খেতে হচ্ছে। বিষযুক্ত খাবার খাই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সৌজন্যে এবং ভেজাল খাবার খাই দেশি কোম্পানির সৌজন্যে। তেলে ভেজাল, দুধে ভেজাল, ঘিয়ে ভেজাল, হলুদ-মরিচ-ধনে-জিরার গুঁড়োতে ভেজাল। এমনকি স্বচ্ছ পানির বড় অভাব যা ‘জীবন’ নামে পরিচিত। সাপ্লাইয়ের পানি মোটেও স্বচ্ছ নয়, টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক না হয় আয়রন। পানি ব্যবসায়ীদের বিশুদ্ধ পানিও সবসময় নিরাপদ পাওয়া যায় না। সেখানেও মাঝে মাঝে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। আমরা প্রতিনিয়ত ভেজাল খাবার খাচ্ছি। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন ভেজালমুক্ত নিরাপদ পানি ও খাদ্য খেতে কিন্তু তার সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি আজও। সরকারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছে। এদিকে ফাস্টফুডের ব্যবসা জমজমাট হয়েছে। আমাদের সন্তানরা সেই খাবারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। সেগুলো কোনটাই দেহের জন্য ভালো নয়। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে ভেজাল ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। রোজার মধ্যে বেশ কিছু ভেজাল ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছে। বিএসটিআই নামক খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠনটি বেশ কিছু বড় বড় কোম্পানির ৫২টি খাদ্য স্থগিত করে। এর মধ্যে ৯টি বাতিল করে, ৪টি স্থগিত করে এবং বাকিগুলোকে মান নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিয়েছে। মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা সারা বছর কেন বছরের পর বছর ধরে ভেজাল খাদ্যে সয়লাব করে রেখেছে দেশটাকে। তাহলে নামধারী বিএসটিআই এত বছর ধরে কী করেছে? তাহলে আজ সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের উল্লেখিত কার্যক্রম। তারপরেও কি ভেজাল ব্যবসায়ীদের মনে ভয়ের উদ্রেক হয়েছে? তাদের যে জরিমানা করা হয়েছে তা পুনরায় ব্যবসা করে পূরণ করে নেবে। কিন্তু ভেজাল ব্যবসা বন্ধ করবে না। কারণ এদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আইনের ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। এক্ষেত্রে আইন পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। কারণ ভেজাল খাদ্য খাবার জন্য আমাদের শরীরে যে রোগ বাসা বেঁধেছে তা আমাদের ক্রমশ অথর্ব, পঙ্গু ও মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এ অপরাধে কি কোন বিচার হয়েছে বা আগামীতে হবে? হয়তো লঘুদন্ড আছে যা বেপরোয়া ভেজাল ব্যবসায়ীদের জন্য যথেষ্ট নয়। সর্বোপরী খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ভূমিকা যথেষ্ট নয় তথাপি তাদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা নাই।

এবারে আসি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রোগের বিস্তার ঘটছে। পূর্বেই বলেছি রোগমুক্ত বাড়ি বা পরিবার আছে কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অন্যদিকে রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা নিতান্তই কম। যদিও বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে কয়েক দফায় বেশকিছু সংখ্যক ডাক্তার নিয়োগ দিয়েছে চিকিৎসা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। কিন্তু পরিস্থিতির তেমন কোন উন্নতি হয়নি। কারণ অনিরাপদ খাদ্য ও অপচিকিৎসার ফলে রোগীর সংখ্যা গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, এমবিবিএস, পাস করা হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদি চিকিৎসকের সংখ্যা এতই কম এবং তাদের ফি এর পরিমাণ এত বেশি যে ৯০ ভাগ মানুষই এদের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে এই ৯০ ভাগ মানুষ যায় কোথায়। জেলা থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যেসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে সেগুলোতে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ মানুষ সেবা পায়। এসব স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডাক্তারের স্বল্পতার কারণে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যায় প্রায় অর্ধেক মানুষ। ফলে বাকি ৫০-৬০ ভাগ মানুষ শরণাপন্ন হয় গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পল্লী চিকিৎসক ও হাতুড়ে ডাক্তার, কমপাউন্ডার, অ্যালোপ্যাথি ও হোমিওপ্যাথি ওষুধ বিক্রেতা তাদের কর্মচারী, জিনের কবিরাজ, তেলপড়া-পানিপড়া কবিরাজ, পীরের দরগা, হঠাৎ করে স্বপ্নে দেখা কবিরাজের কাছে। চিকিৎসা বিজ্ঞাননির্ভর করে শরীর বিজ্ঞানের ওপর। মানবদেহ এবং তার অভ্যন্তরে অন্ত্রগুলো ও এর গতি প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকলে রোগীর চিকিৎসা করা যেমন সম্ভব নয় তেমনি উচিতও নয়। শুধু তাই নয় রোগের লক্ষণ, উৎপত্তি, চিকিৎসার জন্য ওষুধ নির্ণয় ও ওষুধের মাত্রা ও পরিমাণ প্রভৃতি ঠিকমতো নির্ধারণ করতে না পারলে চিকিৎসা ঠিক হবে না। যা হবে তাহলো পুরোপুরি অনুমানভিত্তিক বা অপচিকিৎসা। আর এ অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে দেশের ৫০-৬০ ভাগ মানুষ। অপচিকিৎসার ফলে এ মানুষগুলোর জীবনী শক্তি ও রোগ প্রতিরোধ শক্তি হারিয়ে ফেলে। জীবন হয়ে উঠে ক্ষণস্থায়ী। অর্থাৎ তার যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন দুর্বিসহ জীবন নিয়ে বেঁচে থাকবে এসব কথা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের। তারা আরও বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার মানুষরা আমাদের দেশের মানুষদের মতো রোগ নিয়ে বেঁচে থাকে না; কারণ সে দেশগুলোতে ভেজাল খাদ্য ও অপচিকিৎসা নেই। তাদের জীবনকালও দীর্ঘ। অপচিকিৎসা যে শুধু এসব পাসহীন ডাক্তারদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে তা নয়। পাস করা ডাক্তাররা অপচিকিৎসা করেন না তা কিন্তু নয়। তাদের অধিকাংশ ডাক্তাররাই ১০ থেকে ১২টি ওষুধের তালিকা দেন রোগীদের হাতে; যা কোনক্রমেই সঠিক চিকিৎসা নয়। অনেক রোগের একসঙ্গে চিকিৎসাপত্র দেন। অর্থাৎ আসল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করতে ব্যর্থ হওয়া। প্রতিটি ওষুধেরই বিরূপ প্রতিক্রিয়া আছে। সুতরাং অতিরিক্ত এই ওষুধের কুপ্রভাব রোগীর শরীরে পড়াটাই স্বাভাবিক। এছাড়া তাড়া দ্রুত নিরাময় করার জন্য ও সুনাম কেনার জন্য রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ প্রয়োগ করেন; যা এতদিনে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয়েছে। তারপরও প্রয়োগ চলছেই। আর গত ৫০ বছর ধরে তো চলছেই। ফলে রোগীদের শরীরে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়েছে এবং রোগ জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। এর কোন প্রতিকার নেই। অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ মানুষের শরীরে রোগপ্রতিরোগ শক্তিকে ক্রমশ নিঃশেষ করে দেয়। বিষয়টি পত্রপত্রিকায় বারবার আসে। কিন্তু প্রতিকারের ব্যবস্থা মুখে মুখে থেকে যায়। বাস্তবে আজও প্রতিকার হয়নি। কিছু কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আছে যেগুলো পাড়া-গ্রামে মুদিখানা দোকানে পাওয়া যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স রোগীদের যন্ত্রণা যখন সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছায় তখন ডাক্তাররা স্টেরয়েড ওষুধ ব্যবহার করেন; যার কুফল আরও ভয়ংকর। এছাড়া শহরে গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে উত্তেজকর নারকোটিকস ড্রাগস। এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার যৌনশক্তিকে শেষ করে দেয়। ফলে দাম্পত্য জীবনে দেখা যায় কলহসহ অসংখ্য সমস্যা। অপচিকিৎসা ও ওষুধের অপব্যবহার মানুষের জীবনকে অসহায়ত্বের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। আইনগতভাবে এর কোন প্রতিকার নেই। এবং এজন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না। এদিকে আমাদের দেশে কিছু সংক্রামক ব্যাধিও আছে। যেমন- যক্ষা, এইডস, ক্যান্সার, মুখে ঘা, চর্মরোগ। এসব রোগ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য যে সচেতনতামূলক শিক্ষার প্রয়োজন সেটার অভাব রয়েছে। ফলে স্বাস্থ্য বিভাগের এসব রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকলেও জনসচেতনতা সেই মাত্রায় উন্নীত না হওয়ায় রোগ ও রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। খাদ্য ও চিকিৎসা এই দুটি মৌলিক অধিকার পূরণের ক্ষেত্রে সরকারের প্রাণান্তকর চেষ্টা থাকলেও ভেজাল ও বিষযুক্ত খাদ্য এবং ভুল ও অপচিকিৎসা গোটা জাতিকে পঙ্গু ও দুর্বল জাতিতে পরিণত করেছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকারের সঠিক ব্যবস্থা ও নীতিমালা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

[লেখক : সাংবাদিক]