menu

শিশু-কিশোরদের নাগালে সোস্যাল মিডিয়া : কী পাচ্ছি কী হারাচ্ছি

ড. মোহাম্মদ হান্নান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

‘সোস্যাল মিডিয়া’ নামক জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইতিহাসে সর্বশেষ (বিবিসি, ১২ জুলাই ২০১৯) খবরটি হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ‘ফেসবুক’ কর্তৃপক্ষকে ৫০০ কোটি টাকা জরিমানা করেছে সামাজিক গণমাধ্যমটিতে মূলত ব্যক্তিগত তথ্যাদির গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি বলে। ‘ফেসবুক’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই জন্ম নিয়েছিল। ২০০৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মার্ক জাকারবার্গ প্রথম ‘ফেসবুক’ নেটওয়ার্কটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুরুতে হার্ভার্ড-এর ছাত্ররাই এটা ব্যবহার করত। কিন্তু খুব দ্রুতই এটি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বে এখন দুইশত কোটিরও বেশি মানুষের ‘ফেসবুক’ একাউন্ট রয়েছে। বাংলাদেশের দুই কোটিরও বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে থাকে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমতো শুধু ফেসবুকই নয়, এর আওতায় রয়েছে ইউটিউব, হোয়াটস অ্যাপ, মেসেঞ্জার, উইচ্যাট ইত্যাদিও। বিশ্বব্যাপী এদেরও কোটি কোটি গ্রাহক ও সদস্য রয়েছে। দেখা যাচ্ছে মোবাইল, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহারকারীর বেশিরভাগই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে কোন না কোনভাবে জড়িয়ে আছে। আর তাই এ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিরুদ্ধে আমরা কখনই উচ্চকণ্ঠে জোর গলায় কিছু বলতে পারব না। সোস্যাল মিডিয়াখ্যাত এ প্রযুক্তি আমাদের দুনিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম সব প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মেলবন্ধনে যুক্ত করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। মানুষে মানুষে সামাজিকভাবে যে দূরত্ব ছিল, তা কিন্তু সোস্যাল মিডিয়া নিরঙ্কুশভাবে দূর করে দিয়েছে। বন্ধু তৈরি করে দিচ্ছে, মতামত ‘শেয়ার’ করা যাচ্ছে। এ মিডিয়া যেন এক নতুন বিশ্ব তৈরি করে ফেলেছে!

কিন্তু সমস্যা তৈরি হলো সেখানে যখন মানুষ হয়ে গেল প্রযুক্তির দাস! প্রযুক্তিকে মানুষ এখন আর যেন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। অথচ কথা ছিল, প্রযুক্তিই মানুষের দাস হয়ে থাকবে, মানুষ যখন ইচ্ছা তা ভালো কাজে ব্যবহার করবে। কিন্তু মানুষ, বিশেষ করে শিশু-কিশোর-তরুণ-যুবকরা সোস্যাল মিডিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এখন দাবানলের মতো বিশ্বের সব দুয়ারে আঘাত করছে। এ বিষবাষ্প পুড়ে ছাই করে দিচ্ছে সব সৃজনশীলতা, মননশীলতা এবং চিন্তাশীলতা। মেধার বিকাশ ও বুদ্ধিজীবিতায় একটা শূন্যতা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে দেশে দেশে, বাংলাদেশেও।

সোস্যাল মিডিয়া নিয়ে প্রধান সমস্যাটা আসক্তির। যে কোনো কিছুরই আসক্তি ক্ষতিকর। আমরা শিশু-কিশোরদের পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে অন্যান্য গল্প-প্রবন্ধ ও জ্ঞানের বই পড়তে বলি, অথচ যখন কিশোরটি শুধু গল্পের বই নিয়েই পড়ে থাকে, পাঠ্যবইয়ে নজর দেয় না, পরীক্ষায় খারাপ করে বসে, তখন কিন্তু এটাকে আমরা আসক্তি বলি। এটা আমাদের জন্য ক্ষতি বয়ে আনে। আমরা এমনটা চাই না। আমরা চাই আমাদের সন্তানরা প্রথম পড়ুক পাঠ্যবই, তার সঙ্গে সহায়ক জ্ঞানের বইও। অথচ শুধু প্রযুক্তি নিয়ে পড়ে থাকলে প্রযুক্তির গোলাম হয়ে যায় মানুষ। আসক্তি আমাদের প্রকৃত আনন্দ ও বিনোদন থেকেও দূরে রাখে। ২ জুলাই ২০১৯ এবং ৫ জুলাই ২০১৯ ছিল বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-পাকিস্তানের বিশ্বকাপ খেলা। এ দুটো খেলাতেই খুবই উত্তেজনা ছিল, ছিল লড়াকু মোজাজের আনন্দ। অথচ দেখা যাচ্ছে মহল্লায় অনেক কিশোর-তরুণরাই খেলা দেখা বাদ দিয়ে মোবাইল চ্যটিং-এ নিমগ্ন। কোনো সুস্থ কিশোর-তরুণ এ দেশপ্রেমমূলক খেলা দেখা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে, এটা কল্পনার বাইরে। এ থেকেই বোঝা যায় প্রযুক্তিতে আসক্তি কতটাই আগ্রাসী।

একবার আমি আমার এক পরিচিত মানুষের বাসায় গিয়েছি। সেখানে কম্পিউটারটি রয়েছে ড্রইং রুমেই। বাসার কিশোর-সন্তানটি কোনো এক স্যোসাল মিডিয়ায় লাইক, শেয়ার বা চ্যাটিং-এ ব্যস্ত। কে ঘরে ঢুকল, কে বের হয়ে গেল তার প্রতি ওর কোন আগ্রহ বা উৎসাহ নেই। কিশোরের মা অস্বস্তিতে পড়লেন, বললেন, ‘বাবু তোমার চাচু এসেছেন, সালাম দাও’। বাবু খুব গম্ভীরভাবে মাথা নিমগ্ন রেখেই উত্তর দিল, ‘ডযড় রং ঃযব মটু’। সবাই বিব্রত হয়ে গেল। পরিস্থিতি এখন এমনই। শিশু-কিশোর-তরুণরা গভীর রাত পর্যন্ত জাগছে, কখনো সারারাত। ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে বলে এর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের নিয়মিত লেখাপড়ায়ও। এভাবে শারীরিক-মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে আমাদের শিশু-কিশোররা।

কলেজ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নায়েম ‘সোস্যাল মিডিয়া পার্টিসিপেশন অব দ্য সেকেন্ডারি স্কুলস ইন ঢাকা সিটি’ শিরোনামে এক গবেষণা জরিপ করেছে সম্প্রতি। প্রতিবেদনটিতে বের হয়ে এসেছে, ঢাকা শহরের শতকরা ৩০ ভাগ স্কুল-ছাত্র স্কুলের আঙিনায় বসেই সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে থাকে। শতকরা ১৩ ভাগ স্কুল-ছাত্র ক্লাসে পাঠদানকালে শিক্ষকের উপস্থিতিতেই ফেসবুক বা চ্যাটিং-এ নিজেকে ব্যস্ত রাখে। শতকরা ১৪ ভাগ শিক্ষার্থী ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় প্রতিদিন সোস্যাল মিডিয়ায় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমাদের শিক্ষকরা, আমাদের অভিভাকররা এর সবই জানেন। এসব কর্মকান্ডের প্রতি আবার মিডিয়ারও অনেক উসকানি আছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে একটি বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে যে, একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে না এসে রাস্তায় রিকশা থেকেই রোল কলের সময় ক্লাসে হাজির। বন্ধুর মোবাইলের মাধ্যমে ‘উপস্থিতি’ দিচ্ছে। দেশের কোন এক বন্ধ করা মোবাইল কোম্পানির বিজ্ঞাপন এটি যা কিনা ক্লাসে অনুপস্থিতির মতো এক সাংঘাতিক অপরাধকে সমর্থন করছে। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, এমন করে ক্লাসে না গিয়ে রাস্তা থেকেই ক্লাসে উপস্থিত থাকা যায়, উত্তর দেয়া যায়, এমন একটা ভুল ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে দেশে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে।

শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিতে আসক্ত হয়ে লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়ছে। হারিয়ে ফেলছে সামাজিক মূল্যবোধ। খেলাধুলায় আর নেই তারা। তারা লেখাপড়ার গ্রুপস্টাডির বাইরেই থাকছে। ঘন্টার পর ঘন্টা প্রযুক্তিতে ডুবে থেকে ঘাড়ও বাঁকা হয়ে যাচ্ছে এসব কিশোর-তরুণদের। মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ওজনিয়াক সম্প্রতি ফেসবুক নিয়ে কতগুলো চরম কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষের প্রাইভেসি নষ্ট করে ফেসবুকের সুবিধা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু আমার পরামর্শ হচ্ছে কীভাবে ফেসবুক ছাড়া যায়, তা খুঁজে দেখা। মানুষ মনে করে, এসব সাইটে তাদের প্রাইভেসি আছে। কিন্তু আসলে প্রাইভেসি নেই। আমার জীবনে ইতিবাচক কিছু আনার চেয়ে ফেসবুক নেতিবাচকতা বয়ে এনেছে বেশি। ফেসবুকে মানুষ এখন তার জীবনের সবকিছুই দিয়ে দিচ্ছে। অথচ মানুষের দেয়া তথ্য কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞাপন থেকে প্রচুর অর্থ আয় করছে ফেসবুক। আমাদের সবকিছু, এমনকি হৃদয়স্পন্দন পর্যন্ত নানা ডিভাইস ব্যবহার করে শুনতে পাচ্ছে এসব মাধ্যমে। [১১ জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ওয়াশিংটনে টিএমজেডকে সাক্ষাৎকার দানকালে অ্যাপলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ওজনিয়াক এসব কথা বলেন। সূত্র : ইন্টারনেট]।

কথাগুলো কে বলেছেন খেয়াল করুন। তিনি প্রযুক্তি সম্বন্ধে আমাদের চেয়ে নিশ্চয় অনেক বেশি জানেন! তবে এটাও সত্য যে, আমরা প্রযুক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেব না। শুধু প্রযুক্তি যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, বরং প্রযুক্তিই থাকে আমাদেরই নিয়ন্ত্রণে, সেদিকে খেয়াল রাখব। প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে আমরা থাকব নিরাপদ এবং তা আমাদের সবাইকেই আসক্তি থেকে বাঁচিয়ে রাখবে।

প্রযুক্তিতে আসক্তি, এ সমস্যা এখন আর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটা যুগপৎ জাতীয় এবং বৈশ্বিক সমস্যা। ফলে এর সমাধানও সেভাবেই আসবে। আমেরিকান সরকারের ফেসবুককে ৫০০ কোটি ডলার জরিমানা করার মতো শাস্তি অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের শিশু-কিশোরদের রক্ষার্থে জাতীয়ভাবে যেসব পদক্ষেপ আছে, তা আগে কার্যকর করে তুলতে হবে। ২০১৭ সালে শ্রেণীকক্ষে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার আদেশটি বাস্তবায়নে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। শুধু স্কুলের শিক্ষক কড়াকড়ি করবেন, এমন ভাবনায় থাকলে চলবে না। পরিবার ও অভিভাবকরা সে ডিভাইসগুলো কখনোই আমাদের সন্তানদের সরবরাহ করবে না, যা দিয়ে তাদের অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

ফ্রান্সের সরকার পার্লামেন্টে আইন পাস করেছে যে, ১৫ বছরের নিচে কোনো শিশু-কিশোরের হাতে স্মার্টফোন, ট্যবলেট বা ইন্টারনেট সংযুক্ত ডিভাইস বা এ ধরনের কাজ করতে পারে এমন মোবাইল নয়। আমাদের এটা করার জন্য আইন হওয়ার অপেক্ষা আর নয়, আমরা উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ায় সন্তানদের বোঝাব কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ। জোরজবরদস্তি বা চাপ নয়, মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, এমন কোন আচরণ দ্বারাও নয়, আমরা আমাদের শিশুদের বোঝাব তাদের মতো করে এসব থেকে বিরত থাকতে।

বাবা-মা তাদের ছোটোবেলার গল্প সন্তানদের শোনাবেন। সন্তানদের তারা প্রিয় বইগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন। ভ্রমণকাহিনী পড়তে বলবেন। ভ্রমণেও নিয়ে যাবেন। সমাজে কোনগুলো ভালো কাজ, কোনগুলো মন্দ, তা সন্তানদের কাছে তুলে ধরবেন। সমাজের বড় ও গুণী মানুষদের জীবন ইতিহাস তুলে ধরবেন। সামাজিক মূল্যবোধ কী তা বুঝিয়ে বলবেন। বোঝাতে বোঝাতে এক সময় সন্তানরা নিজেই নিশ্চই সুস্থ জীবনধারায় ফিরে আসবে এবং তা হবেই।