menu

মৃৎশিল্প ও আমাদের লোকজ সংস্কৃতি

কাঞ্চন দত্ত

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯

লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন হলো মৃৎশিল্প। প্রাত্যহিক জীবনের চাহিদ পূরণের জন্যই মৃৎশিল্প বিকাশ লাভ করেছে। মৃৎশিল্প অনেক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত বেশিরভাগই নারী। এরা পাল বা কুমার নামে পরিচিত। এদের মৃৎশিল্পী হিসেবেও অভিহিত করা হয়। বর্তমানে পাল বা কুমার ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষরাও মৃৎশিল্পের কাজ করে থাকে। এ শিল্পের প্রধান উপকরণ মাটি। কাদামাটি দিয়ে বিভিন্ন আকৃতি ও প্রকৃতির হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজের উপযোগী সামগ্রী তৈরি করে। চাকার সাহায্যে কাদামাটি দিয়ে তৈরির পর কাঁচা অবস্থায় তাতে বিভিন্ন দর্শনীয় জিনিষের নকশা করা হয়। কখনও আবার পোড়াবার পর এতে নানা রঙের সমাবেশে ঘটিয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ আকর্ষণীয় নকশা আঁকা হয়। ঘর সাজানোর শৌখিন দ্রব্যও কুমাররা তৈরি করে থাকে।

কুমার পারিবারের নারীরা একাজে অত্যন্ত দক্ষ। ছোট ছোট শিশুরাও একাজে পরিবারের সদস্যদের সাহায্য করে। কুমারদের জীবনটাই কারুকাজময়। তাদের হাতের ছোঁয়ায় নিমিষেই তৈরি হয়ে যায় আসাধারণ শিল্পকর্ম। মাদারীপুর, গাইবান্ধা, নওগাঁ, পাবনা, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পিরোজপুর, খুলনা, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলা মৃৎশিল্পের জন্য এক সময় বিখ্যাত ছিল। বর্তমানে মাটির তৈরি কারখানা থেকে উৎপাদিত গৃহস্থালি সরঞ্জাম বা তৈজসপত্রের ব্যবহার কমে গেছে। তবে এখনও গ্রামে বা শহরের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজের জন্য মাটির জিনিসপত্র ব্যবহার করে। হাঁড়ি, কলসি, হাঁড়ি পাতিলের ঢাকনা, মালশা, পিঠা তৈরির সাজ, খই মুড়ি তৈরির খোলা, ব্যাংক, ফুলদানি, সানকি, বদনা, দইয়ের ভাঁড়, ঘটি, ছাইদানি, বিভিন্ন ধরনের ফল, পাখি, জীবজন্তু ইত্যাদি। শহরের উচ্চবিত্তের লোকেরাও ঘর সাজানোর জন্য মাটির তৈরি সৌখিন দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহার করে থাকে।

মৃৎশিল্পীদের মাটির জিনিজ তৈরির অন্যতম উপাদান হলো ‘চাক’। এই চাক দিয়েই তারা নানা ধরনের আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ জিনিষ তৈরি করে থাকে। আবার অনেক জিনিসপত্র ছাঁচে তৈরি করা হয়। মৃৎশিল্পে প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হয়। তবে পণ্যের উজ্জ্বলতা বাড়াতে মৃৎশিল্পীরা কৃত্রিম রং ব্যবহার করে থাকে। যেমন- ফুলদানি, ওয়ালম্যাট, বিভিন্ন ধরনের মাটির তৈরি গহনা, শো-পিস ইত্যাদি। মাটির তৈরি ব্যাংক এখনও আমাদের দেশে ব্যাপক প্রচলিত। এ ব্যাংকে পয়সা ফেলে ছোট বাচ্চাদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করা যায়।

শীত মৌসুম পিঠা পুলির জন্য উপযুক্ত সময়। এ সময় কুমোরদের ব্যস্ততা বাড়ে। শীতের পিঠা পুলি তৈরিতে মাটির হাঁড়ি না হলেই নয়। শীতের পরই আসে বসন্ত। এ ঋতুতে বাড়তি যোগ হয় বাংলার ঐতিহ্যের মেলা। গ্রাম্য মেলা এবং পহেলা বৈশাখে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিলের কদর বাড়ে কয়েক গুণ। পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতীয় উৎসব। এ উৎসবে শিশুদের কাছে মাটির তৈরি জিনিপত্র না হলেই নয়। শিশুদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু থাকে মাটির তৈরি বিভিন্ন ফল, হাতি, ঘোড়া, হরিণসহ বিভিন্ন জীবজন্তু। এ মৌসুমে কুমোর বাড়িতে একদন্ডও ফুরসত থাকে না। মেলা বসলেই কুমোররা মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে পসরা সাজায়।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের পাশাপাশি মৃৎশিল্প আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। প্রাচীন কাল থেকে এদেশের নারীরা এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। দেশের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের একটি বিরাট অংশ দেশজ অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখে চলেছে। বিশেষ করে কুটির ও মৃৎশিল্পে তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও অবদান অনস্বীকার্য। মৃৎশিল্পীদের তৈরি পণ্যমাসগ্রী বিক্রি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে। এসব পণ্যসামগ্রীর মধ্যে- মগ, ফুলদানি, ফুলের টব, মোমদানি, এ্যাস্ট্রে, কয়েলদানি, নানা ধরনের শিশুর খেলনা, মাটির ব্যাংক, পশুপাখি, কলস ও পুতুলসহ দৃষ্টিনন্দন মাটির তৈরি জিনিষপত্রের বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। স্বল্পপুঁজির মাধ্যমে গড়ে ওঠা এসব কারখানায় অর্ধশিক্ষিত বেকার নারী-পুরুষ-বিধবা অনেকেই কাজ করে।

মাটির পত্রে রান্না করা খাবার নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত। মাটির পাতিলে ও কাঠের চুলার রান্না করা খাবার যতটা সুস্বাদু হয়, সিলভারের পাতিলের রান্না ততটা সুস্বাদু হয় না। পিঠা বানাতে দরকার হয় বাষ্পীভূত তাপ নিয়ন্ত্রণের। মাটির পাতিল সহজেই তাপ শোষণ করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। পিঠা সুস্বাদু করতে মাটির তৈরি পাত্রের জুরি নেই। মাটির তৈরি সামগ্রী ঢাকার ধানমন্ডি, শিশু একাডেমি, শাহবাগ, রাজাবাজার, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ও মেলায় পাওয়া যায়।

বংশ পরম্পরায় পাল বা কুমোর সম্প্রদায়ের মানুষ এ শিল্পের কারিগর। তারাই এ শিল্পটিকে টিকিয়ে রেখেছে। যদিও এ শিল্পের কদর কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছে। মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিলের কদর এখন অনেকটাই কমে গেছে। স্বল্প দামের প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, সিলভার ও মেলামাইনের দাপটে মাটির জিনিসপত্র হারিয়ে যেতে বসেছে। তারপরও বিভিন্ন মেলা, গ্রাম্য উৎসব, শীত মৌসুমে পিঠা বানাতে মাটির পাতিলের দরকার হয়। যে কারণে কিছু কুমোর আজও টিকে আছে। মৃৎশিল্পীদের মতে, বিদেশে মাটির তৈরি পণ্যসামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তারা প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে কারখানা আধুনিকায়ন করতে পারছে না। স্থানীয়ভাবে এসব জিনিস তৈরির উপর্যুক্ত মাটি পাওয়া যায় না। জ্বালানি খরচ ও শ্রমিকের মজুরিও বেশি। তাছাড়া সরকারি ও বেসরকারিভাবে এ শিল্পে পৃষ্ঠপোষকতায় কেউ এগিয়ে আসছে না। তাই সুবিধাবঞ্চিত কুমারদের অনেকেই পৈত্রিক পেশা পরিবর্তন করছে।

বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি ও গ্রামবাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মৃৎশিল্প। এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে জীবন জীবিকা চলছে অনেক পরিবারের। শহর ও গ্রামাঞ্চলের নারীরা অত্যন্ত ধৈর্য এবং নিষ্ঠার সঙ্গে সুনিপুণ হাতে মৃৎশিল্পের পণ্য তৈরি করে আমাদের অর্থনীতিতে আবদান রাখছেন। কিন্তু মাটির জিনিসের কারিগর কুমোররা অর্থাভাবে চাহিদা মোতাবেক জিনিষ তৈরি করতে পারছে না। অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য কুমোরদের সরকারিভাবে মৃৎশিল্পের স্বীকৃতি দিয়ে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা দরকার। এর ফলে এ শিল্পের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে এবং গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে এবং তাদের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রফতানি করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবে।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার)