menu

ভেজাল প্রবণতায় মানবতা ও নৈতিকতা

আবু আফজাল সালেহ

  • ঢাকা , বুধবার, ১৫ মে ২০১৯

বাঙালির চরিত্রগত খারাপ দিকগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে কোনো কিছু সামনে রেখে কাজ করা এবং নিজের স্বার্থ বা মুনাফা (আর্থিক বা বৈষয়িক উভয়) লক্ষ্য স্থাপন করে এগিয়ে যাওয়া। আর সংকটাপন্ন অবস্থা বা উপলক্ষ্যকে সামনে রেখে মুনাফা অর্জনের জন্য সারাবছর কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। এ দিকটি মানবতাবিরোধী এবং নিষ্ঠুরও বটে। খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল। এমনকি শিশু খাদ্যেও ভেজাল করতে পিছপা হচ্ছি না! এবং সেটার পরিসর আরও মারাত্মক ও অনৈতিকতার জাল অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

রোগীর চরম অবস্থায় আমরা ব্যবসা খোঁজার চেষ্টা করি। রিকশাচালকেরা পর্যন্ত দালালিতে জড়িত। এন্টোবায়োটিক বা জীবাণুনাশক ওষুধেও সমানহারে ভেজাল করছি। নিম্নমানের ওষুধে উন্নতমানের ওষুধের দাম নির্ধারণ করছি! বল যায়, যে যার অবস্থানে মুনাফা লাভের জন্য উপলক্ষ্য করে মুখিয়ে থাকি। প্রয়োজনে মিষ্টি কথা বলি; নিজের স্বার্থের জন্য। চারিত্রিক ভেজালও একই অবস্থায়। নিজের স্বার্থে ছুটছি। নিজের লাভের জন্য কাছে টানি আবার দূরেও ঠেলে দেই। ব্যতিক্রম যে কিছু নেই তা কিন্তু নয়! তবে তার পরিমাণ অনেক কম এবং তা আণুবীক্ষণিক যন্ত্র দিয়ে দেখতে হবে। তাই জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত!

যেমন ধরা যেতে পারে, রমজান মাস। মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশ পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে নিত্যনৈমিত্তিক জিনিসপত্রের দাম কমায় বা সহনীয় পর্যায়ে রাখে। আর আমাদের দেশে হয় ঠিক উল্টা। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা এ মাসকে সামনে রেখে সারাবছর ব্যবসায়িক মুনাফার জন্য পরিকল্পনা আঁটে। মুমূর্ষু রোগীর ক্ষেত্রেও ব্যবসাটাই আগে দেখি। আমরা যারা বড় বড় নৈতিকতার কথা বলি তাদের অনেকাংশও অন্ধকারে মুনাফার জন্য (সুনাম বা ব্যবসায়িক মুনাফা) নিবেদিত। আলোর চরিত্রটা ধরা পড়ে সুসময়ে। নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে আসল চেহারা বেরিয়ে আসে। দালালি বা তোষামোদী বেড়ে গেছে। চারিত্রিক ভেজালও বাড়ছে দ্রুত গতিতে।

ওয়াটার লুর যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর নেপোলিয়নকে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বন্দি রাখা হয়। কথিত আছে যে, প্রতিদিন খাবারের সঙ্গে অল্প পরিমাণে আর্সেনিক মিশিয়ে নেপোলিয়নকে খেতে দেয়া হতো। এভাবে স্লো-পয়জনিংয়ের মাধ্যমে ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়নকে হত্যা করে তাদের চিরশত্রু ব্রিটিশরা। কিন্তু আজ আমরা নিজেরা নিজেদের স্লো-পয়জনিং করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি। খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম, খাদ্য ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। কিন্তু পচা, বাসি, ভেজাল বা বিষাক্ত দ্রব্য মানুষের খাদ্য হতে পারে না। এটা মানবদেহের জন্য বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় শিশুদের। কারণ তাদের পক্ষে ক্ষতিকর উপাদানের প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধ করার ক্ষমতা খুবই কম। অনেক সময় এ ধরনের দূষিত খাবার মানবদেহে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যা মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে। অথচ দিন দিন আমাদের দেশে খাদ্যে ভেজালের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। নোংরা পরিবেশ আর নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যের লেবেল লাগিয়ে ভেজাল পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। বাজার, দোকান, সুপারশপ কোথাও ভেজালমুক্ত খাদ্যপণ্য মিলছে না। মাছেও ফরমালিন, দুধেও ফরমালিন। ফলফলাদিতে দেয়া হচ্ছে কার্বাইডসহ নানা বিষাক্ত কেমিক্যাল। খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানোটা রীতিমতো অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ভেজালের বেপরোয়া দাপটের মধ্যে আসল পণ্য খুঁজে পাওয়াই কষ্টকর। এছাড়া এমন জটিল ও সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় খাদ্যে ভেজাল দেয়া হয়, যা সাধারণ ক্রেতা বা খুচরা ব্যবসায়ীদের পক্ষে অনুমান বা শনাক্ত করাও কঠিন। খাদ্যে ভেজাল, খাদ্যে বিষক্রিয়ার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি এর ব্যাপ্তি যে হারে বাড়ছে তাতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ। দেশি-আন্তর্জাতিক সব গবেষণায় দেশে খাবারের বিষক্রিয়ার বিষয়টি বারবার উঠে আসছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত হোটেল-রেস্টুরেন্ট বা নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যও এখন ভেজালমুক্ত নয়। গবেষণা থেকে শুরু করে ভেজালবিরোধী অভিযানে এসব প্রমাণ মিলছে। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে ভেজালের কারণে বর্তমানে মানবদেহে ক্যান্সারের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা আগে দেখা যেত না।তারা বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে এসব ক্যান্সারের মূল কারণ খাদ্যে ভেজাল মেশানো, প্রিজারভেটিভ ও বিভিন্ন ধরনের রঙের ব্যবহার। দেশে দূষিত খাবারের ব্যাপ্তি কী পরিমাণে বাড়ছে পরিসংখ্যানেই তার প্রমাণ মিলছে। এছাড়া একাধিক গবেষণায় বারবার খাবারে ভেজালের বিষয়টি উঠে এসেছে। কিছুদিন আগের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দূষিত খাবারের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মৃত্যু হচ্ছে ৪ লাখ ২০ হাজার জনের। ভারত-বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে প্রতি বছর দূষিত খাবার খেয়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যায়। আর অসুস্থ হয় ১৫ কোটি মানুষ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ শিশুর তিনজনই ডায়রিয়ায় ভোগে। রোগটি এ অঞ্চলের শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী সবচেয়ে ভয়াবহ রোগগুলোর একটি। ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী, বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান ইত্যাদির মাধ্যমে খাবার দূষিত হয়। সেই অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে বমিভাব, ডায়রিয়ার মতো প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হয়। আর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হিসেবে ক্যান্সার, কিডনি ও যকৃৎ বিকল হয়। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর বিভিন্ন অসুখ হয়। কম বয়সি শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রবীণরা খাবারে দূষণের শিকার হন সবচেয়ে বেশি। টাইফয়েড জ্বর এবং হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের আক্রমণে বিশ্বে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার অর্ধেকের বেশি ঘটনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে অবিলম্বে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয় অনিরাপদ খাবারের ছড়াছড়ি বেশি। সেখানে রান্নাবান্নার কাজে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা হয় না। তাই খাবারবাহিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও ওই অঞ্চলে বেশি।

বিভিন্ন সমীক্ষায় ভেজালের ভয়াবহতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিষাক্ত সাইক্লোমেট দিয়ে তৈরি হচ্ছে টোস্ট বিস্কুট, বিষাক্ত ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে পাকানো হয় কলা, আনারস। রুটি, বিস্কুট, সেমাই তৈরি করা হচ্ছে বিষাক্ত উপকরণ দিয়ে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে। ফরমালিন দেয়া হচ্ছে মাছ-সবজিতে, মবিল দিয়ে ভাজা হচ্ছে চানাচুর, হাইড্রোজ মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে মুড়ি ও জিলাপি। এছাড়া ক্ষতিকর রং দেওয়া ডাল, ডালডা ও অপরিশোধিত পাম অয়েল মিশ্রিত সয়াবিন তেল, ভেজাল দেয়া সরিষার তেল, রং ও ভেজালমিশ্রিত ঘি, পাম অয়েল মিশ্রিত কনডেন্সড মিল্ক, ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি প্যাকেটজাত জুস, মিনারেল ওয়াটার, মরা মুরগির গোশতও অবাধে বিক্রি হয়। ভেজালের এসব উপকরণসহ অভিযানে হাতেনাতে ধরা পড়েছে ব্যবসায়ীরা। এরপরও ভেজালের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। টেক্সটাইল রং মেশানো হচ্ছে বেকারি পণ্য, জুসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে। তেল, ঘি, আইসক্রিম, মিষ্টি, দই, ললিপপ, চকোলেট, কেক ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্যেও ক্ষতিকর রং, ফ্লেভার ব্যবহার করা হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের ব্যবহার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্যপণ্য তৈরি, হোটেল রেস্টুরেন্টে বাসি, মরা মুরগি, গরু, মহিষ, ছাগলের গোশত খাওয়ানোর ঘটনাও ঘটছে। আবার মিনারেল ওয়াটারের নামে বোতলজাত করে বাজারজাতকরণের ঘটনাও ঘটছে।

ফেব্রুয়ারি-২০১৫ থেকে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ কার্যকর হয়েছে। ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’-এর অধীনে নিরাপদ খাদ্য, খাদ্যদ্রব্য জব্দকরণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ পদ্ধতি বিধিমালা-২০১৪ প্রণীত হয়েছে। এতে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদন্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা করার বিধান রাখা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্যের মান নিশ্চিত করতে ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা’ ও ‘বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত’ গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে আইনে খাদ্যে ভেজালকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান অন্তর্ভুক্তির জন্য জোরালো চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ আইনে আমরা কয়েকটি ধারা দেখে নিই।

(১) কোন ব্যক্তি বা তাহার পক্ষে নিয়োজিত অন্য কোন ব্যক্তি, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অথবা বিষক্রিয়া সৃষ্টিকারী রাসায়নিক দ্রব্য বা উহার উপাদান বা বস্তু (যেমন-ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, সোডিয়াম সাইক্লামেট), কীটনাশক বা বালাইনাশক (যেমন-ডিডিটি, পিসিবি তৈল, ইত্যাদি), খাদ্যের রঞ্জক বা সুগন্ধি, আকর্ষণ সৃষ্টি করুক বা না করুক, বা অন্য কোন বিষাক্ত সংযোজন দ্রব্য বা প্রক্রিয়া সহায়ক কোন খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণে ব্যবহার বা অন্তর্ভুক্ত করিতে পারিবেন না অথবা উক্তরূপ দ্রব্য মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ মজুদ, বিপণন বা বিক্রয় করিতে পারিবেন না।-(ধারা-২৩)

(২) কোন ব্যক্তি বা তাহার পক্ষে নিয়োজিত অন্য কোন ব্যক্তি, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, প্রবিধান দ্বারা বা আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনের অধীন নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত পরিমাণ তেজক্রিয়তাসম্পন্ন বা বিকিরণযুক্ত পদার্থ অথবা প্রাকৃতিক বা অন্য কোনভাবে থাকা কোন সমজাতীয় পদার্থ বা ভারী-ধাতু কোন খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণে ব্যবহার বা অন্তর্ভুক্ত করিতে পারিবেন না। -(ধারা-২৪)

(৩) কোন ব্যক্তি বা তাহার পক্ষে নিয়োজিত অন্য কোন ব্যক্তি, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, মানুষের আহার্য হিসাবে ব্যবহারের জন্য প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত মান অপেক্ষা নিম্নমানের কোন খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে উৎপাদন অথবা আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বা বিক্রয় করিতে পারিবেন না। -(ধারা-২৬)

(৪) কোন ব্যক্তি বা তাহার পক্ষে নিয়োজিত অন্য কোন ব্যক্তি, খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণে কোন ভেজাল দ্রব্য মিশ্রিত করিবার উদ্দেশ্যে, শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত তৈল, বর্জ্য বা কোন ভেজালকারী দ্রব্য তাহার খাদ্য স্থাপনায় রাখিতে বা রাখিবার অনুমতি প্রদান করিতে পারিবেন না।-(ধারা-২৮)

ধারা ৩২ অনুসারে -কোন ব্যক্তি বা তাহার পক্ষে নিয়োজিত অন্য কোন ব্যক্তি, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে -(খ) খাদ্যদ্রব্যের গুরুত্ব বৃদ্ধি করিতে, পরিমাণ ও পুষ্টিগুণের বিষয়ে, দফা (ক)-তে উল্লিখিত লেবেলে কোন মিথ্যা তথ্য বা দাবি বা অপকৌশল অথবা মোড়কে বিভ্রান্তিকর তথ্য বা রোগ নিরাময়কারী ওষুধি বলিয়া দাবি অথবা উৎসস্থল সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর কোন বক্তব্য লিপিবদ্ধ করিতে পারিবেন না;

(গ) প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে মোড়কাবদ্ধভাবে বিক্রয় করিবার এবং মোড়ক গাত্রে উৎপাদন, মোড়কিকরণ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং উৎস-শনাক্তকরণ তথ্যাবলী ¯পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করিবার শর্ত প্রতিপালন ব্যতিরেকে প্যাকেটকৃত কোন খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ উৎপাদন, বিতরণ বা বিক্রয় করিতে পারিবেন না; এবং

(ঘ) প্যাকেটকৃত কোন খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণের মোড়কে লিপিবদ্ধ তথ্যাবলী পরিবর্তন করিয়া বা মুছিয়া কোন খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ বিক্রয় করিতে পারিবেন না।

কিন্তু এ আইন আমরা মানছি কতটুকু? আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি কী! রমজানে ভেজাল আরও বেশি হয়। শুধু আইন করে এ অবক্ষয় রুখে দেয়া কঠিন। সরকারের পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বস্তরের বিবেক আগে জাগ্রত করতে হবে। আইন প্রয়োগকারীকেও নিরেপেক্ষ ও অধিক দায়িত্বশীল হতে হবে। তাহলেই সরকারের সিদ্ধান্ত গতি পাবে। আইনে মোটামুটি সব কিছুই আছে। সময়ের প্রয়োজনে সংশোধন করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতামত নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদের মতামত নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

এটা এমন এক বিষয় যে, নিজে থেকে ব্যবসায়ীরা-মালিকরা সচেতন না হলে বন্ধ করা কঠিন। নৈতিকতার জায়গাটা জাগাতে হবে আমাদের! আর একটা বিষয় হচ্ছে, ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত হওয়া। সরবরাহকারী সব জায়গায় আইন করে বা পাহারা দিয়ে রুখে দেয়া কখনই সম্ভব নয়! আর সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ভেজালকারীকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে! খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করার জন্য শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে না থেকে সাধারণ জনগণকে স¤পৃক্ত করে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মিডিয়া এবং সুশীল সমাজকে এক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করতে হবে। অনেক মিডিয়া এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো মিডিয়া খাদ্যে ভেজালসংশ্লিষ্ট সংবাদ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে। শুধু আইন প্রণয়ন করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ অনেক ব্যবসায়ী জানেই না সে যে ভেজাল মেশাচ্ছে এর প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়ংকর। আবার অন্যদিকে ভোক্তারাও যে সবসময় সচেতন তা-ও কিন্তু নয়।

[লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট]

abuafzalsaleh@gmail.com