menu

কৈশোর ও স্বাস্থ্য

বয়োসন্ধিকালের কিছু সাধারণ সমস্যা

ডা. মিনতি অধিকারী

  • ঢাকা , রবিবার, ১১ আগস্ট ২০১৯

র‌্যাশ : ছেলেদের সেভিং এর ফলে মুখে র‌্যাশ দেখা দিতে পারে। সেভিং ফোম ও জেল এর ব্যবহার বা ইলেকট্রনিক রেজরের ব্যবহার র‌্যাশ কমাতে পারে।

পিম্পল : কৈশোরে ছেলে মেয়ে উভয়েরই একটি কমন সমস্যা মুখে পিম্পল। কুসুম গরম জল ও এন্টিসেপ্টিক সাবান দিয়ে মুখ ধুলে উপকার হবে। কিন্তু মুখ স্ক্রাব করা যাবে না। তৈলাক্ত ভাঁজা খাবার পরিত্যাগ, প্রচুর জলপান এসবে উপকার হতে পারে। কখনো খুচবে না, খুটবে না, তাতে ইনফেকশন হতে পারে।

গায়ে দুর্গন্ধ : কিশোর-কিশোরীদের গায়ে প্রচুর ঘামগ্রন্থি থাকে। যার থেকে গন্ধ ছড়াতে পারে। নিয়মিত স্নান করবে, পোশাক পাল্টাবে, ধোবে। বগলে ডিওড্রান্ট ব্যবহার করবে।

একজিমা : একজিমা, এলার্জিক কনটাক্ট ডার্মপটাইটিস হতে পারে-নিকেলএর সংস্পর্ষে। সূর্যের আলোতেও হতে পারে। তবে চিন্তার কারণ নেই; চুলকোবে না, এমনিই চলে যাবে। যা কিছুতে এলার্জি এড়িয়ে চল। সাবান, সেমপো, সূর্যের আলো ।

ফিজিকাল নেগলেক্ট : বয়স অনুযায়ী তারা খাদ্য, পোশাক, বিছানা পায় না। কখনো নির্যাতিত হয় বয়স্কদের দ্বারাèনির্যাতিত বা অবহেলিত হলে কাউকে খুলে বল।

সাইকোলজিকাল : হীনমন্যতাবোধএ ভোগে অনেক সময় -গায়ের রং, সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা নিয়ে, তার প্রতি বিপরীত লিঙ্গের আকর্ষন নিয়ে। দাড়ি না গজানো বা খুব বেশি গজানো, ওজনাধিক্য বা কম ওজন, গায়ের রং নিয়ে সমস্যা, ফেসিয়াল ডিফরমিটি, মুখে পিম্পল, হাত-পায়ের গঠন অসুন্দর, ব্রেস্টসহ সেক্স অর্গানের গঠন অনেক সময় তাদের দিশাহারা করে তোল। তখন সুইসাইডে অধিক আকর্ষন বোধ করে তারা এই হীনমন্যতাবোধ ও দিশাহারা ভাব থেকে মুক্তি পেতে।

শারীরিক বৃদ্ধি : বয়োসন্ধিকালে শারীরিক বৃদ্ধি কারো বেশি কারো কম হতে পারে। কেউ হঠাৎ লম্বা হয়ে যায় ফলে মনোকষ্টে ভোগে কেন এত লম্বা আমি। আবার কেই খুব ধীরে বাড়ে ফলে মনোকষ্টে ভোগে সবাই কেমন লম্বা আমি এত খাটো কেন! একই ভাবে ওজন নিয়েও কিশোর-কিশোরীদের মনোকষ্টের শেষ নেই। একটু ওজন বাড়লেই হুতাশ। যখন একটি মেয়ে তার সমবয়সী ছেলেদের তুলনায় লম্বা হয় সে টিজড হয় ও বিব্রতবোধ করে। যখন একটি ছেলে তার সমবয়সী মেয়েদের তুলনায় খাটো হয় সে টিজড হয় ও বিব্রতবোধ করে। সুসম খাবার গ্রহন কর, পরিমিত ঘুমাও, শরীরচর্চা কর শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক হবে।

সমবয়সীদের সঙ্গে তুলনা : কারও পিউবার্টি আগে আসে, কারো পরে। যার আগে আসে তার কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন দেখা দেয়, দাড়ি মোচ গজায়, সে ভাবে আমার বন্ধুরা সব ঠিক আছে আমার কেন এমন হল! আবার যার দেরিতে পরিবর্তন আসে সে ভাবে বন্ধুরা সবাই কেমন বড় হয়ে গেল, আমি কি কখনোই বড় হব না! তোমাকে বলছি সবারই পরিবর্তন আসবে; কারো পরে, কারো আগে।

ব্রন : কিশোর-কিশোরী উভয়েরই একটি হরমোনজনিত সমস্যা। এক সময় আপনা আপনি চলে যায়।

গাইনোকোমেসিয়া : প্রায় ৫০% কিশোরের এই সমস্যাটি দেখা দিতে পারে। হরমোনজনিত কারণে ছেলেদের ব্রেস্ট বড় হয়ে যায়। ৬-১৮ মাস পর এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।

রক্তস্বল্পতা : মেয়েরা ভুগতে পারে। বিশেষত যাদের ঋতুস্রাব বেশি হয়। যারা শ্লিম থাকার জন্য কঠিন ডায়েটিং করে।

স্কলিওসিস : বাড়ন্ত গড়নের জন্য কিশোর-কিশোরী উভয়েই অনেক সময় সামনে ঝুকে হাটতে চলতে অভ্যস্ত হয়।

মায়োপিয়া : কাছের জিনিস দেখতে অসুবিধা হয় কারো কারো। ধীওে ধীরে ঠিক হয়ে যায়।

হাড্ডি ও মাংসপেশীর আঘাত : অন্যমনস্কতা ও অসাবধানভাবে পথ চলতে গিয়ে আঘাত পায় তারা

অনিয়মিত ঋতুস্রাব : বয়োসন্ধির প্রথম দিকে মেয়েদের ঋতুস্রাব অনিয়মিত হতে পারে। ধীরে ধীরে তা নিয়মিত হয়ে যায়। সাধারনত এক বছর পরে নিয়মিত হয়ে যায়। যদি পেটে ব্যথা হয়Ñ নিয়মিত ব্যায়াম, মেডিটেশন, রিলাক্সেশন করলে সেরে যায়। বেশি হলে ডাক্তারের পরামর্শ নেবে যদি দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়। মাসিকের আগে মুড খারাপ হতে পারে। তবে কাজ স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাবে। তবে ২ বছরের বেশি সময় ধরে মাসিক অনিয়মিত থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

আগাম বয়োসন্ধি : হরমোনজনিত কারণে হতে পারে। ব্রেনে টিউমার, ইনফেকসন বা আঘাত, জেনেটিক প্রভৃতি কারণেও হতে পারে। আবার অধিক আহার ও ক্যালরি গ্রহণ, মানসিক চাপ-বাবা-মায়ের সেপারেষন, যৌন নির্যাতন প্রভৃতি কারণেও আগাম বয়োসন্ধি হতে পারে। কারণ নির্নয় করে চিকিৎসা করালে সেরে যায়।

দেরিতে বয়োসন্ধি : হরমোনজনিত কারণে, ডায়াবেটিস হলে, এথলেট মেয়ে দের দেরিতে পিউবার্টি হতে পারে। আবার নিরামিষ ভোজী, আমিষ কম খেলে, অপুষ্টির কারণে বা অসুখ যেমন- যক্ষ্মা, পেটে কৃমি, ক্ষুধামন্দা রোগ, মানসিক ব্যাধি (সিজোফ্রেনিয়া) প্রভৃতি কারণেও দেরিতে বয়োসন্ধি হতে পারে ।

শিক্ষাগত সমস্যা : পড়াশোনা, পরীক্ষা নিয়ে অধিক সচেতনতা; ফেল করার ভয়, শিক্ষকদের সম্বন্ধে ভুল ধারণা, যেমন শিক্ষকবৃন্দ তার প্রতি যত্নশীল নয়, পরীক্ষায় প্রাপ্র নম্বর দেয় না ইত্যাদি।

কম আই কিউ আছে এমন ধারণা জন্মায় হীনমন্যতা থেকে, আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে।

সামাজিক : ভাই বোন বা বন্ধুর প্রতি অধিক, অকারণ ও অযৌক্তিক কঠোরতা ও বিরক্তিবোধ ভাই বোন বা বন্ধুর প্রতি অধিক ঘনিষ্ঠতা আত্মীয় এবং বন্ধুদের সঙ্গে হতাশাব্যঞ্জক ও বিপজ্জনক সম্পর্ক।

আইনগত সমস্যা : কিছু দুরন্ত কিশোর কিশোরী আইনের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে থাকে ফলে পুলিশি ঝামেলায় পড়ে যায়। তাদের অসুখী ডিস্ট্রেসড মন এজন্য খানিকটা দায়ী।

খাবার সমস্যা : হঠাৎ ওজনবৃদ্ধি বয়েসন্ধিকালীন একটি বাস্তব সমস্যা। আর এজন্য যদি অহরহ তাদের বিদ্রুপ, কটাক্ষ বা বিরূপ সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয় তবে তারা নিজেরা নিজেদের অপছন্দ করতে শুরু করে এবং বিষন্নতায় ভোগে। তারা অবসন্ন বোধ করে, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজকর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কোন কোন ছেলে মেয়ে তখন বিষণœতা কাটাতে আরো বেশি বেশি করে খায় আবার কেহ কঠিন ডায়েটিং শুরু করে দেয়। দুটোই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। কঠিন ডায়েটিং থেকে ক্ষুধামন্দার সৃষ্টি হতে পারে। কারো নঁষরসরধ দেখা দিতে পারে। এমতবস্থায় বাবা-মাকে অতি সাবধানতার সঙ্গে সন্তানকে ট্রিট করতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে মোটা কিংবা শুকনো যা ই হও কিছু যায় আসে না। তুমি সুন্দর। তবে বাড়তি ফ্যাট ঝরে গেলে তুমি আরো অনেক সুন্দর লাগবে দেখতে।

মাদকাশক্তি : কিশোর কিশোরীরা অনেক সময় পরীক্ষামূলকভাবে, বা নিছক কৌতূহলের বশে মদ, সিগ্রেট বা ড্রাগ গ্রহণ শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে ড্রাগের নেশায় আশক্ত হয়। যা তার মানসিক স্বাস্থ্যে আঘাত হানে; ক্রমে সে ংপযরুড়ঢ়যৎবহরধ নামক কঠিন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সে বাবা-মার বারণ শুনবে না। তবে দলের সঙ্গে নেশা করলে বড়ভাইদের বারণ সে অধিক আগ্রহে শুনতে পারে। যখন সন্তানের মধ্যে নাটকীয় আচরণগত ত্রুটি লক্ষ্য করবেন, সে একাকী সময় কাটাতে চায় বাবা-মা বুঝবেন সে মাদকাসক্ত।

অসদাচরণ/নির্যাতন : শারীরিক, মানসিক, বা যৌন (এবিউস )নির্যাতনের শিকার হয়ে বয়োসন্ধি কালে কিশোর কিশোরীরা অনেক সময় অসদাচরন, অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। পিতা-মাতাকে অবশ্যই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজন হলে কোনো কিশোর-নির্যাতন প্রতিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

ভারবাল ও ইমোশনাল এবিউস : কিশোর-কিশোরী মানসিকভাবে আশা করে এসময় সবাই তাদের সাপোর্ট করবে। কিন্তু অনেক সময় চিৎকার করে, শাসিয়ে তাদের ইমোশনালি নির্যাতন করা হয়।

ইমোনাল ডিস্টার্বেন্সের কারণসমূহ : নিরাপত্তার অভাব, অর্থনৈতিক অভাব, ভীতিকর পরিবেশে বসবাস, পারিবারিক কড়াকড়ি, পড়াশোনার চাপ, যৌনশিক্ষার অভাব ইমোনাল ডিস্টার্বেন্সের ফলে কিছু সমস্যা দেখা দেয় যা প্রভূত ক্ষতি সাধন করে কিশোর-কিশোরীর মন ও মানসে-

হতাশা, ইচ্ছাশক্তির অভাব, বিষণ্নতা, হীনমন্যতা, মানসিক অস্থিরতা, খুব দ্রুত পছন্দ-অপছন্দ এর পরিবর্তন হিংসা, ড্রাগ আসক্তি, মানসিক চাপ, কোন ব্যক্তি বা ঘটনাকে ভয়, ভীশণ দুশ্চিন্তা নিজের সমস্যা গোপনকরা, মোটেই মানিয়ে নিতে না পারা, আত্মবিশ্বাসের অভাব বা খুব বেশি আত্মবিশ্বাস সবকাজে অণীহা, আকাশকুশুম কল্পনা, পরনির্ভরতা, ধূমপান ও ড্রাগ এ আসক্তি, চ্যাটিং এর প্রতি আসক্তি দায়িত্বে অবহেলা, ভুলে যাওয়া, বার বার ভুল করা।