menu

বাংলা নববর্ষ ॥ প্রাণের উৎসবে

সাইফুজ্জামান

  • ঢাকা , রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৯
image

আজ বাংলা নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি মূল শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মুহূর্তে জীবনাচরণ, বিশ্বাস, উৎস মুখে বিরাজিত বীক্ষণ থেকে বাঙালিত্ব পুনরুদ্ধারে প্রতি বছর একবার হলেও উপলব্ধির সরোবরে অবগাহিত হয়- এ কম কী? আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়ন, জীবনব্যবস্থা ও প্রতিদিন যাপিত দিনে নানা ব্যস্ততার মধ্যে নববর্ষ উদযাপনের কর্মযজ্ঞে শেকড়লগ্ন হওয়ায় টান অনুভব করে বাঙালি প্রতিনিয়ত।

দুই হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায় বাংলা প্রাচীন জনপদ। খনন, লেখামালা, শিলালিপির মাধ্যমে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস অল্প কিছু জানা যায়। গড়ে ওঠা জনপদের একটি অংশ বাঙালির গৌরবময় ইতিহাস সর্বজনবিদিত চতুর্দশ শতকে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ নিজে শাহে বাঙালিয়ান বা বাঙালিদের বাদশা পরিচয় দিয়েছিলেন। সুলতানী আমলে আলাউদ্দীন হোসেন শাহ বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত অনুবাদের উদ্যোগী হয়ে ওঠেন। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দী অবধি আরবীয় বণিকগণ বাংলায় আগমন করলে আরবি-বাংলা সংমিশ্রণে সংস্কৃতি পুষ্ট হয়ে ওঠে। ষোড়শ শতকে মোগল মহামতি আকবর বাংলা দখল করলে বাংলাভাষা, সংস্কৃতি বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। জনশ্রতি আছে আকবর বাংলা সন প্রবর্তন করেন। এ তথ্য সঠিক না হলেও বলা যায় আকবর ইলাহী সন প্রবর্তন করে। ইলাহী সনের পথ ধরে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়।

ইংরেজ শাসনামলে রবীন্দ্র পরিবারে শান্তি নিকেতনে বাংলা নববর্ষ আয়োজনের সূত্রপাত ঘটেছিল। মোগল শাসকেরা ইরানের নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মিলিত হতো। মিনাবাজার আয়োজনে নারীদের অংশগ্রহণ লক্ষণীয়। মুর্শিদকুলী খান, আলীবর্দী খাঁ, বেড়াভাসান, জমিদারদের পুণ্যগৃহ ও হালখাতা আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে খাজনা আদায় করা হতো। হিজরী সন গণনা চাঁদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সম্রাট আকবরের সময় জ্যোাতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌরসন এবং হিজরী সনের ভিত্তিতে বাংলা সন গণনা শুরু করেন। ১৮৫৪ সালের ১০ মার্চ, মতান্তরে ১১ মার্চ বাংলা সন গণনা শুরু হলেও ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর বাংলা সন গণনা কার্যকর শুরু হয় প্রথমে ফসলি সন, বঙ্গাব্দ ও বাংলা নববর্ষ নামে। চৈত্র মাসের শেষদিনে খাজনা পরিশোধ হতো। ১ বৈশাখ ভূমির মালিকেরা প্রতিবেশীদের মাঝে মিষ্টান্ন বিতরণ করতো। ক্রমে নববর্ষ উদযাপন সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়। হালখাতা আয়োজন উল্লেখযোগ্য। এ সময় নতুন খাতায় হিসাব নিকাশ লিপিবদ্ধ করে রাখার রেওয়াজ দেখতে পাওয়া যায়। ১৯১৭ সালে বৃটিশ শাসকদের বিজয় কীর্তন করে হোমকীর্তন ও পূজার আয়োজন করা হয়।

১৯৬৭ সাল থেকে নববর্ষ উৎসব আয়োজন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ক্রমে পূর্ববঙ্গে বাঙালি জীবনাচরণে নববর্ষ উদযাপনে উল্লেখযোগ্য উৎসবে পরিণত হয়। চৈত্র সংক্রান্তির রাতে কিষানি নতুন ঘটে আতপ চালের সঙ্গে আমগাছের কচি নতুন পাতা, মুক্ত ডাল ভিজিয়ে রাখতো, পরের দিন ঘরের চারপাশে পানি ছিটানো হতো।

নববর্ষ উপলক্ষে মেলা, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, হাডুডু, লাঠিখেলা, মোরগ লড়াই, জারিসারি গান, যাত্রা, পুতুলনাচ, সার্কাসের ব্যবস্থা করা হতো।

উৎসব শুরু হতো বৈশাখ মাসের ১ তারিখ থেকে। পুণ্যাহ ছিল রাজস্ব আদায়ের জন্য বার্ষিক বন্দোবস্ত উৎসব। প্রাক-ব্রিটিশ আমলে সরকার জমিদার তালুকদার ইজারাদারদের থেকে বছরের নির্দিষ্ট দিনে রাজস্ব আদায় করতো। এ ব্যবস্থাকে পুণ্যাহ বলা হতো।

এ ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী বছর ও নতুন বছরের রাজস্ব উত্তোলন করা হতো। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে পুণ্যাহ উৎসব ১৯৫০ সালে বন্ধ হয়ে যায়। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানে অবহেলিত বাঙালি আত্মানুসন্ধানে ব্যাপৃত থাকে। ষাটের দশকে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন ও চর্চার ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করা হয়। ‘ছায়ানট’ পঞ্চাশ দশক থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা ও নববর্ষ উদযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

সম্মিলিতভাবে নববর্ষ উদযাপন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন একত্রে ও পৃথকভাবে নববর্ষ উৎসব আয়োজন করে থাকে।

পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার, নিপীড়ন ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে বাঙালি তার জাগৃতি ও মুক্তি সংগ্রামে সংগঠিত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেয়া হয় না।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে আনে। সংগ্রামে বিজয়ে বাংলা কালজয়ী পুরুষদের সাহিত্য অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান অধিকার করে।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর নববর্ষ নানা আঙ্গিকে পালিত হচ্ছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নববর্ষে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। নববর্ষে নতুন পোশাক পরে বাড়িঘর আঙিনা পরিষ্কার করা হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। মেলা আয়োজন করা হয়। মেলায় কুটির শিল্পের বিকিকিনি চলে। ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়। শোভাযাত্রা শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে চারুকলা ইনস্টিটিউটে শেষ হয়। বিভিন্ন রঙিন মুখোশ ও প্রাণীর প্রতিকৃতি মঙ্গল শোভাযাত্রায় স্থান করে নেয়। ১৯৮৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ইউনেস্কো সংস্কৃতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

নববর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীরা নববর্ষ আবাহনের মাধ্যমে বর্ষবরণ করে। সাদাশাড়ি লালপাড় পরিহিত রমণীদের কলকাকলিতে রমনা মুখর হয়ে ওঠে। পুরুষসঙ্গী সাদা পায়জামা, পাঞ্জাবি-শিশু পুত্রকন্যারা রঙিন পোশাকে সাজ্জিত হয়। পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম লেগে যায়। রকমারী ফুল-বেলুন ও খাওয়ার মধ্যে বাঙালি উৎসবে প্রত্যাবর্তন করে।

সোনারগাঁতে বউমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ মেলা বটতলার মেলা নামে অধিক পরিচিত। বটবৃক্ষের নিচে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশরী দেবীর পূজা করতেন। কুমারী নববধূ ও নারীরা তাদের মনোবাসনা পূরণের জন্য পূজা করতেন। সন্দেশ মিষ্টি, ধান দুর্বা, ফলমূল পূজার অর্ঘ্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো। শান্তির জন্য কপোত-কপোতী উড়ানো হতো। একশ’ বছরের পুরনো মেলা জনআদৃত। সোনারগাঁ থানার পেরবা গ্রামে ‘ঘোড় মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়। জনশ্রুতি আছে যামিনী সাধক ঘোড়ায় আরোহণ করে নববর্ষে প্রসাদ বিতরণ করতেন। তার মৃত্যুর পর স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ঘোড়া স্থাপন করে মেলার সূচনা করে। এই মেলায় নৌকায় খিচুড়ি রান্না করে রাখা হয়। সব শ্রেণীর মানুষরা কলাপাতায় খিচুড়ি প্রসাদ গ্রহণ করে খায়। চট্টগ্রামে ডিসি হিল পার্কে নববর্ষ উৎসব আয়োজন করা হয়। ১৯৭৩, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে ইস্পাহানি পাহাড় পাদদেশে নববর্ষ উপলক্ষে মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

নববর্ষ উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ত্রিপুরাদের বৈশুখ মারমা সাংগ্রাই ও চাকমা বিজু উৎসব পালিত হয়। মারমাদের পানি উৎসব প্রসিদ্ধ। ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করা তরুণ প্রজন্মের কাছে নববর্ষ কতটুকু গ্রহণীয় হচ্ছে প্রশ্ন উঠতে পারে। ডিশ এন্টেনা, ইন্টারনেটের অবাধ অনুপ্রবেশের সময় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সমাবেশ ঘটছে সত্য। কিন্তু বাঙালিয়ানা ধরে রাখতে না পারলে সব অর্জন বৃথা হয়ে যাবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ আনন্দের সংবাদ। একদিন উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশে বাংলাদেশের রূপান্তর হবে- এমন আশাবাদ পোষণ অসম্ভব স্বপ্ন নয়। ইতিহাস, ঐতিহ্য সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম থাকা যেমন জরুরি, তেমন প্রয়োজন বীরত্বের গল্পগাথার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। বহু বীর যোদ্ধার রক্তে অর্জিত বাংলাদেশ সম্ভাবনার সম্পদ। এ সম্পদ কাজে লাগাতে হবে। জীবনাচরণে বাঙালি জাতিসত্তার অহঙ্কারকে সমুন্নত রাখতে হবে।

[লেখক : উপ-কিপার, জাতীয় জাদুঘর]

saifuzzaman.bnm@gmail.com