menu

বর্ষবরণে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী

মিথুশিলাক মুরমু

  • ঢাকা , রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৯

আজ বাংলা নববর্ষ। দেশবাসীর মতোই আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোও নিজ নিজ সংস্কৃতিতে, গান-বাদ্যযন্ত্রের সমাহারে বর্ষবরণের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। দেশের প্রধান প্রধান আদিবাসী জনগোষ্ঠী মূলত সাঁওতাল, গারো, উরাঁও, চাকমা, ত্রিপুরা, মারমারা হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্যকে আঁকড়ে রেখে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীগুলো বর্ষবরণের উৎসবকে সম্মিলিত করে আনন্দকে আরও ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে কয়েক দশক পূর্বেই। শেকড় অর্থাৎ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত বা শিখর পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রত্যয় নিয়ে আয়োজন করে থাকে বর্ষবরণ। চাকমা ভাষায় বৈসাবি উৎসবকে বিঝু, ত্রিপুরা ভাষায় বৈসুক, মারমা ভাষায় সাংগ্রাই, রাখাইন ভাষায় সাংগ্রে, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিষু এবং আহমিয়াদের ভাষায় বিহু নামে সম্বোধন করা হয়ে থাকে। সমতল অঞ্চলের আদিবাসীরা বিশেষ করে সাঁওতালরা বর্ষবরণের উৎসবকে ‘পাতা’, উরাঁওরা ফাগুয়া নামে অভিহিত করেছে। ফাগুয়া শব্দটি তুর্কি শব্দ ফাগ থেকে এসেছে। ফাগ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ আবির, উরাঁওরা উৎসবটি উদযাপন করেন ফাল্গুনী পূর্ণিমায়।

সুদূর অতীতের মতো সাম্প্রতিকালেও আদিবাসী সাঁওতালরা এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকে। খ্রিস্টিয়ান ধর্মে ধর্মান্তরিতের প্রেক্ষাপটে আনন্দের জোয়ারে ভাটা পড়েছে। তবে হ্যাঁ, এখনও রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার ঝালপুকুরে আয়োজিত পাতা উৎসবে সাঁওতালদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতোই হয়ে থাকে। এ পাতা উৎসবকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রী একটি গানের সংলাপ বলেÑ

‘আলে আতো রেকো পাতাএদা

ইদি উটুকাঞমে উইহারএদা

আপে আতো আলম দিসাই, গাতে মায়া ছাডাওমে

হড়মো আলম ঢিলাও দায়াম ঞেলক।’

(বঙ্গানুবাদ : আমাদের গ্রামে পাতা হচ্ছে, চল আমাকে আমাদের গ্রামে দিয়ে আসো; তোমাদের গ্রামকে তুমি স্মরণে আনিও না, বন্ধুত্বের মায়াও ত্যাগ করো; তুমি তোমার শরীরের প্রতি যতœ নাও তাছাড়া তোমাকে দেখতে খারাপ লাগবে)

কোন এক যুবকের সঙ্গে বিয়ের জন্য মান্ডেয়া অর্থাৎ ঘর সাজানো হয়েছে পরের দিন বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে এবং আজকেই পাতা উৎসবও রয়েছে। এরূপ কঠিন মুহূর্তে অষ্টাদশী মেয়েটি তার মাকে অনুরোধের সুরে বলছে-

‘তেহেঞগে মান্ডায়া, তেহেঞগে ছামডা, তেহেঞগে মারাং বুরু পাতা হয়োক

ঞেল ওচোআঞমেগো মারাং বুরু পাতা দ

সেন ওচোআঞমেগো গাতে তুলুচ।’

(বঙ্গানুবাদ : আজকেই ঘর সাজানো, আজকেই নাচ-গান, আজকেই মারাং বুরু’র পাতা উৎসব অনুষ্ঠান। মাগো আমাকে মারাং বুরু’র পাতা উৎসব দেখতে দাও, যেতে দাও আমার প্রিয় প্রিয় সঙ্গীদের সঙ্গে)

এলাকায় পাতা উৎসব হচ্ছে, বড় ভাইয়ের স্ত্রী স্বামীর ছোট ভাইকে অনুরোধ করছে যেন পাতা উৎসবে নিয়ে যায় এবং মিষ্টি কিনে খাওয়ায়। বোঝা যায়, বউদি বহুদিন ধরে মিষ্টি খাওয়ার সুযোগ পাননি।

‘চৈৎ-বৈশাখ দিন পাড়াওএনা

পাতা রাহাড় হুডিঞ সাডেএনা

ইদিইঞ মে হুডিঞ ঝালপুকুর পাতা টানডি

কিরিঞ আঞ মে হুডিঞ জিলি লাডু।’

(বঙ্গানুবাদ : চৈত বৈশাখ দিন পড়েছে, পাতা নাগরার শব্দও শোনা যায়। তুমি আমাকে নিয়ে ঝালপুকুর পাতা স্থানে নিয়ে যাও, তুমি আমাকে মিষ্টি রসগোল্লা কিনে দিও)

আশপাশ গ্রামের যুবক-যুবতীরা পাতা উৎসবের প্রাক্কালে আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে। দেখা যায়, গ্রাম্য সম্পর্কে অনেকেই ভাইয়ের সম্পর্কের হয়ে থাকে। যেহেতু পাতা উৎসব আনন্দের দিন, সেক্ষেত্রে যুবক-যুবতীরা একে-অপরকে বলছে-

‘আডেপাশে ঞেপেল পেড়া

নাপায় নাপায় বয়হা সাগাই

ছাই আমাঞ দাদা আমাঞ

ঝালপুকুর পাতা টানডি দিশম হড়কো তালারে

অনডেদঞ তেঞাং আমা রে।’

(বঙ্গানুবাদ : আশেপাশের পরিচিত আত্মীয়-স্বজন, সম্পর্কে দিকে দিয়ে ভাই সম্পর্ক; আমি তোমাকে দাদা বলে সম্বোধন করতে পারব না। ঝালপুকুর পাতা স্থানে, যেখানে শত-সহস্র লোক থাকে; তাদের সম্মুখে আমি তোমাকে দুলাভাই হিসেবেই সম্বোধন করব)

দুই বন্ধুর মধ্যে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, পরিকল্পনা হচ্ছে তাদের নিজ এলাকার পাতা উৎসবে যোগদান করবে। কিন্তু বাদ সাধে পরিবার। এক্ষেত্রেও গানের কথাগুলোতে প্রকাশ করা হয়েছেÑ

‘ঝালপুকুর পাতা টানডি

যাইতে মন ছিলোরে

তাগাড়-নাচাড়, ঘাচাড়-ঘুচুড়

যাইতে দিলো না।’

(বঙ্গানুবাদ : ঝালপুকুরে আয়োজিত পাতা উৎসবে যেতে চেয়েছিলাম, মনের দিক থেকেও উৎসাহিত হয়েছিলাম। কিন্তু এটা-ওটা অজুহাতে আমাকে পাতা উৎসবে যেতে দিল না)

গোদাগাড়ী থানার আদাড়পাড়ার মি. যতীন মারা-ী আমাকে জানাচ্ছিলেন, একদা এই ঝালপুকুর পাতা উৎসবকে কেন্দ্র করে ‘অর-অপর বাপলা’ অর্থাৎ টানাটানি বিয়ের বেশ প্রচলন ছিলো। এরূপ বিয়ে অবশ্য সাঁওতাল সমাজের সামাজিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৮৫/১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে একবার কোন এক গ্রামের দলবদ্ধ যুবরা পার্শ্ববর্তী খুনাপুকুর কিংবা পাঁচন্দরের স্কুলগামী মেয়েকে জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করচিল। সেই সময় ‘নটর ডেম কলেজ-ঢাকা’ থেকে সদ্য প্রত্যাগত শ্রী যতীন মারান্ডীসহ অত্র এলাকার শিক্ষিত এবং সচেতন যুবক ও জনগণ সমুচিত জবাব দিয়েছিলেন। তারা মেয়েটিকে ছিনিয়ে এনেছিলেন কিন্তু মেয়েটিকে অপ্রাপ্ত বয়সের বিয়ে থেকে রক্ষা করতে গিয়ে এক প্রকার যুদ্ধ করতে হয়েছিল। অনেক মারামারি-কাটাকাটিও সংঘটিত হয়, রক্তরক্ষণের বিনিময়ে সেদিন মেয়েটিকে রক্ষা করা হয়। মৌখিকভাবেই সেদিনই ঘোষণা করা হয়, এ ঝালপুকুর পাতা উৎসব থেকে আর কেউ কোনদিন স্কুলগামী মেয়েদের জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করতে পারবে না। বলা যায়, আজ পর্যন্ত আর তেমন কোন ঘটনা শোনা যায় না।

সাঁওতালদের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ শতাংশই খ্রিস্টিয়ান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। ধর্মীয় যাজক কিংবা গুরুরা অনেক ক্ষেত্রেই বহুমুখী কারণেই এ উৎসবকে নেগেটিভভাবে দেখে থাকেন। ধর্মীয় গুরুরাও এ পাতা উৎসবকে ঘিরে রচনা করেছেন গানের পঙ্ক্তিগুলো-

‘পাতা-ছাতা, দিবি টানডি শয়তান ঝালি

আলে মেনায় তালে বাবাঞচাওইচ।’

(বঙ্গানুবাদ : পাতা-ছাতা কিংবা দুর্গাপূজার স্থান হচ্ছে শয়তানের মানুষজনকে ধরার স্থান, কিন্তু আমাদের বাঁচানোর, রক্ষা বা পরিত্রাণের জন্য রয়েছে প্রভু যিশু খ্রিস্ট)।

এছাড়াও খ্রিস্টিয় বিশ্বাসীদের গানের বইগুলোতে বর্ষবরণের অনেক গান দেখা যায়; তবে হ্যাঁ এ বর্ষবরণের গানগুলো বাংলার্ কিংবা ইংরেজি নববর্ষের উপাসনাতে গেয়ে থাকেন।

পাতা উৎসব অনুষ্ঠানে কতটুকু ধর্মীয় প্রভাব রয়েছে, কতটুকু নির্মল আনন্দ রয়েছে সেটি অবশ্যই বিবেচ্য বিষয়। বর্ষবরণ উৎসব হবে সবর্জনীন। পাতা উৎসবকে সর্বজনীনে পরিণত করতে সমগ্র সাঁওতাল সমাজের সংলাপের প্রয়োজন; প্রয়োজন পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা। একপেশেভাবে পাতা উৎসব বেঁচে থাকতে পারে না। পার্বত্য অঞ্চলের সমগ্র আদিবাসী একত্রে ‘বৈসাবি’ নামকরণ করে বর্ষবরণ আয়োজন করে থাকে। সমতলের আদিবাসীরা কী তাদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না!