menu

পাট থেকে পরিবেশবান্ধব পলিব্যাগ

নিতাই চন্দ্র রায়

  • ঢাকা , শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, মাংস, চাল, ডাল, লবণ, চিনি, হলুদ, মরিচসহ সব নিত্যপণ্য বিক্রিতেই ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যাগ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বাংলাদেশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির মূল কারণ হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পলিথিনের ব্যবহার। সস্তা ও অন্য বিকল্প না থাকায় নানা সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব ব্যবহৃত পলিথিন সুয়ারেজ পাইপ, ড্রেন, নদী-নালা, খাল-বিলে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ সারা দেশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া এ পলিথিন ব্যাগ মাটির উর্বরতা শক্তি বিনষ্ট করছে এবং ভরাট করছে নদীর তলদেশ। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের মতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় এক হাজার ২০০ কারখানায় নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরি হচ্ছে। এগুলোর বেশিরভাগই পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক। ঢাকা শহরের একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। সে হিসেবে শুধু ঢাকা শহরেই প্রতিদিন ২ কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেয়া হয়।

সরকার পোলট্রি ফিডসহ, চাল, ডাল, লবণ, চিনি, সার, গমসহ বেশ কয়েকটি পণ্যে পাটজাত ব্যাগের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আইন প্রণয়ন করেছে। এ ব্যাপারে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, পলিথিন ছাড়া পাটের ব্যাগের মাধ্যমে প্রোলট্র্রি ফিড, চিনি, লবণ ও সার মোড়কজাত করলে পাটের ব্যাগের সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে বাতাস প্রবেশ করে ওই সব পণ্যের মান তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এতে ব্যবহারকারী ও উৎপাদনকারী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া পলিথিন ব্যাগের চেয়ে পাটের ব্যাগের দাম ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি হওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ ও খুচরা মূল্য বেড়ে যাবে।

এসব অসুবিধা বিবেচনা করে পাট থেকে সাশ্রয়ী মূল্যের পলিব্যাগ উৎপাদন করার জন্য অনেক দিন ধরে গবেষণা করে আসছেন আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা। অবশেষে বাংলাদেশ আণবিক কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমদ খান উদ্ভাবন করেন পাট থেকে পরিবেশবান্ধব পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনের এক নতুন প্রযুক্তি। পাটের সেলুলুজ থেকে পচনশীল পরিবেশবান্ধব পলিথিন ব্যাগ তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করে ইতোমধ্যে তিনি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের প্রধান বৈজ্ঞনিক উপদেষ্টাও তিনি। তার তত্ত্বাবধানে বিজেএমসির আওতাধীন লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে পরীক্ষামূলকভাবে স্বল্পপরিসরে উৎপাদন হচ্ছে এ পরিবেশবান্ধব পলিথিন ব্যাগ। এখন যে মেশিনে ব্যাগ তৈরি হচ্ছে তার পুরো ডিজাইনও করেছেন ড. মোবারক আহমদ খান। তার ২০ বছরের গবেষণার ফল এ সোনালি ব্যাগ। এ পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি এই বিজ্ঞানীকে ২০১৫ সালে স্বর্ণপদক প্রদান করেছে। এর বাইরেও তিনি পাটের সঙ্গে পলিমারের মিশ্রণে ঢেউটিন জুটিন, টয়লেটের সø্যাব, চেয়ার টেবিল, হেলমেটসহ নৈমিত্তিক ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেছেন।

লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে ফেলে দেয়া পাটের অংশ থেকে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে এক হাজারের মতো ব্যাগ। বর্তমানে এক কেজি পলিথিন ব্যাগের দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। আর নতুন উদ্ভাবিত এ প্রতি কেজি পলিথিন ব্যাগের দাম পড়বে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। এরই মধ্যে দেশের রফতানিমুখী শিল্প মালিকেরা এ ব্যাগ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিদেশ থেকে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এ ব্যাগ কেনার চাহিদা আসছে।

ড. মোবারক আহমদের যুগান্তকারী উদ্ভাবন কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিকভিত্তিতে পাট থেকে পলিথিন উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন। সম্প্রতি (২.১০.১৮) সচিবালয়ে পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এবং পাট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরীর উপস্থিতিতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পাট মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ওই সমঝোতা স্মারক অনুষ্ঠানে বিজেএমসির পক্ষে বিজেএমসির সচিব একেএম তারেক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ফুটামোরা কেমিক্যালের পক্ষে কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার প্রিমি কোউলহার্ট সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সমঝোতা স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিজেএমসির চেয়ারম্যান ড. মাহামুদুল হাসান, বিজেএমসির বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ও পাট থেকে পলিথিন তৈরির উদ্ভাবক ড. মোবারক আহমদ খান উপস্থিত ছিলেন। চুক্তি অনুয়ায়ী পলিথিনের বিকল্প সোনালি ব্যাগ উৎপাদনে সব ধরনের মেশিনারিজ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম আশা প্রকাশ করেন, আগামী ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে বাণিজ্যিকভিত্তিতে দেশে পাট থেকে পলিথিন উৎপাদিত হবে।

বর্তমান সরকার কাঁচা পাট ও বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, পাটজাত পণ্য রফতানি, অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন বর্জনের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পাটকে বিশ্ব বাজারে তুলে ধরতে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারে ২৩৫ প্রকার পণ্যের স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র চালু করেছে। পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যবহার বহুমুখীকরণ ও উচ্চমূল্য সংযোজিত পাটপণ্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারকোল, ভিসকোস, পাটপাতার পানীয়সহ নতুন নতুন বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাট থেকে তৈরি এ পলিথিন ব্যাগের নাম দেয়া হয়েছে ‘সোনালি ব্যাগ’। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের পছন্দের দেয়া নাম। সারা বিশ্বে এ নামেই পরিচিত হবে পাটের তৈরি পরিবেশবান্ধব পলিথিনের ব্যাগ। পলিথিন ব্যাগ ছাড়াও পাট থেকে অনেক কিছু উৎপাদন করছে বাংলাদেশ। পাট থেকে বিমানের ইন্টেরিয়র তৈরি হয়। বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন পাট থেকে উৎপাদিত পণ্যের সংখ্যা ছিল ৩৫টি। বর্তমানে পাট থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ২৮৫টি রকমের পণ্য। এক সময়ের সোনালি আঁশ (গোল্ডেন ফাইবার) নামের পাট ভবিষ্যতে সোনার দ- (গোল্ডেন বার) হিসেবে পরিচিত হবে, সেই সময় আর বেশি দূরে নয়।

দেশ-বিদেশে সোনালি ব্যাগের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশে প্রতিদিন ৫০০ টন সোনালি ব্যাগ উৎপাদন হলেও তা বাজারজাতকরণে কোন অসুবিধা হবে না। পাট থেকে পলিথিন তৈরির উদ্ভাবক ড. মোবারক আহমদ খান জানান, এ সোনালি ব্যাগ পরিবেশবান্ধব এবং এটাকে পুনরায় ব্যবহার করা যায়। জানা যায়, নতুন উদ্ভাবিত পলিথিনের বিকল্প পচনশীল সোনালি ব্যাগ দেখতে প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের মতোই হালকা, পাতলা ও টেকসই। পাটের সূক্ষ্ম সেলুলুজকে প্রক্রিয়াজাত করে এ ব্যাগ তৈরি করা হয়েছে। পাটের তৈরি সোনালি ব্যাগ মাটিতে ফেললে অল্প সময়ের মধ্যেই মাটিতে মিশে যাবে। ফলে পরিবেশ দূষিত হবে না। এ ব্যাগ দামেও সাশ্রয়ী। এতে পাটের ব্যবহার বাড়বে এবং ন্যায্য মূল্য পাবেন কৃষক। বিশ্বব্যাপী পলিথিন পরিবেশ বিপর্যয়কারী পণ্য হিসেবে চিহ্নিত। তাই সোনালি ব্যাগ ঠিকমতো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারলে অতীতের মতোই বাংলাদেশ পাট দিয়ে নতুনভাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।

পাট থেকে পরিবেশবান্ধব পলিথিন উৎপাদনে সারা বিশ্বে এটিই প্রথম এবং একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন। পরিবেশবান্ধব এ পণ্যটি আবিষ্কার করে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃতী বৈজ্ঞানিক মোবারক আহমদ খান। লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে ম্যানুয়ালি পরিবেশবান্ধব ‘সোনালি ব্যাগ’ তৈরি করা হচ্ছে। এ অবস্থায় এটা বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুটামোরা কোম্পানি ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে পাট থেকে পলিথিন ব্যাগ তৈরির মেশিনারিজ ডিজাইন করবে এবং তৈরি করবে। বাংলাদেশে এসে সেটা প্রতিস্থাপনও করবে কোম্পানিটি। বাণিজ্যিক উৎপাদন পর্যন্ত তারা দায়িত্ব নেবে। তারা এ খাতে বিনিয়োগ করতেও রাজি আছে। তবে বাণিজ্যিক উৎপাদন হবে বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণে। কারখানাটি হবে ডেমরায় বাওয়ানী জুট মিলের নিজস্ব জায়গায়। বিশ্বের অনেক দেশে খোঁজাখুঁজি করে পাট থেকে সেলুলুজ উৎপাদনের মেশিন তৈরির কোন কোম্পানির সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফুটামোরা নামের একটি কোম্পানির সন্ধান পাওয়া যায়। কোম্পানিটি কাঠের সেলুলুজ থেকে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওই কোম্পানিটিকে পাট সরবরাহ করা হয়েছে। আশা করা যায়, কোম্পানিটি পাট থেকে সেলুলুজ তৈরির মেশিন তৈরি করতে সক্ষম হবে।

জানা গেছে, পচনশীল পরিবেশবান্ধব পলিব্যাগ তৈরির উদ্দেশ্যে পাট থেকে সেলুলুজ আহরণ করা হয়। ওই সেলুলুজকে প্রক্রিয়াজাত করে অন্যান্য পরিবেশবান্ধব দ্রবাদির মাধ্যমে কম্পোজিট করে এ ব্যাগ তৈরি করা হয়। এ ব্যাগে ৫০ শতাংশের বেশি সেলুলুজ বিদ্যমান। এতে অন্যকোন প্রকার অপচনশীল দ্রব্য ব্যবহার করা হয় না। তাই এটি ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে মাটিতে মিশে যায়। নতুন উদ্ভাবিত এ ব্যাগের ভার বহন ক্ষমতা পলিথিনের প্রায় দেড়গুণ এবং এটি পলিথিনের মতো স্বচ্ছ হওয়ায় খাদ্য দ্রবাদি ও তৈরি পোশাক শিল্পের প্যাকেজিং হিসেবে ব্যবহাররে জন্য খুবই উপযোগী।

পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সারা পৃথিবীতে বাড়ছে পলিথিনের বিকল্প ব্যাগের চাহিদা। বর্তমানে প্রতি বছর পৃথিবীতে ৫০০ বিলিয়ন পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোরালো আন্দোলনের কারণে অচিরেই পৃথিবীতে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন উদ্ভাবিত পরিবেশবান্ধব ‘সোনালি ব্যাগ’ বিশ্ববাজার দখল করার মতো বিস্ময়কর ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

[লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিমিটেড, নাটোর]

netairoy18@yahoo.com