menu

নতুন বছরের সূর্যোদয় বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা বয়ে আনুক

রেজাউল করিম খোকন

  • ঢাকা , রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৯

কালের আবর্তে হারিয়ে গেল আরও একটি বছর। ১৪২৫ বিদায় নিচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। নতুন বাংলা বছর ১৪২৬-কে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সবাই। নতুন বছরকে বরণ করে নিতে চারদিকে চলছে ব্যাপক তোড়জোর। ব্যাপক আয়োজনে বাঙালি নববর্ষের বর্ণাঢ্য উচ্ছ্বাসময় উৎসবের জন্য প্রস্তত হচ্ছে। মেয়েদের পরনে লাল-সাদা শাড়ি, খোঁপায় বেলিফুলের মালা। রং-বেরঙের পুতুল, মাটির খেলনা, মুখোশ, বাঁশি আর শাঁশ-বাতাসার ছড়াছড়ি। কোথাও নাগরদোলা, তারই পাশে হয়তো সার্কাস, লাঠি খেলা। চিরচেনা এ দৃশ্য আমাদের বৈশাখী উৎসবের। প্রতিবারের মতো এবারও মঙ্গল শোভাযাত্রায় নতুন বছরকে বরণ করতে প্রস্তুত বাঙালির উচাঁন মন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে যেমন চলছে শোভাযাত্রার প্রস্তুতি, তেমনি বিভিন্ন এলাকা প্রস্তুত হচ্ছে বৈশাখী মেলার জন্য। এখন রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য বড় বড় শহরগুলোতে বৈশাখী মেলার ধুম পড়ে যায় নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে। বরাবরের মতোই এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাজুড়ে চলবে নববর্ষের উৎসব। চারুকলা থেকে সকাল সকাল বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। নতুন বছর প্রত্যেক বাঙালির মনে অনাবিল আনন্দ আর সুখের বার্তা বয়ে আনুক- এমন প্রত্যাশা আর দেশের মঙ্গল কামনায় এ শোভাযাত্রার আয়োজন। রমনার সবুজ বৃক্ষের ছায়াতলে চলবে পান্তা-ইলিশ উৎসব। মাটির শানকিতে মাছে ভাতে বাঙালির চিরচেনা খাবার ইলিশ ভাজা দিয়ে পান্তা-ভাত। খুব ভোর থেকে রমনার বটমূলে চলবে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

প্রকৃতির নিয়মে দেখতে দেখতে শেষ হয়ে এলো বাংলা সন ১৪২৫। বসন্তের শেষে গ্রীষ্মের ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতিতে। রোদের তাপদাহ বাড়ছে দিন দিন। আকাশে মেঘ জমছে। হঠাৎ বৃষ্টি ঝড় শুরু হয়ে গেছে। প্রকৃতি তার আপন বৈশাখীরূপে সেজে উঠছে। সেই ছোঁয়া লেগেছে শহর, গ্রাম আর শহরতলীতে। সবাই নিজ নিজ ভাবনায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কিভাবে বরণ করবে পহেলা বৈশাখকে। কৃষিকাজের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তনের হাত ধরে পহেলা বৈশাখের যাত্রা শুরু। দিন কয়েক পরেই বাংলা নববর্ষের আগমন। চৈত্রের বিদায়ে বৈশাখের নবযাত্রা। আর পহেলা বৈশাখ মানে ঐতিহ্যের আবাহন। বাঙালিয়ানা ধরে রেখে চিরচেনা আনন্দে নববর্ষ বরণ। প্রাণের সুরে আরও একবার মেতে ওঠা বাঙালি উৎসবে।

বাংলা নববর্ষ আমাদের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। ধনী দরিদ্র জাতি গোষ্ঠী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই বাংলা নববর্ষে মিলিত হই। পার্বত্যঞ্চল এবং বিভিন্ন এলাকার আদিবাসীরাও নববর্ষের আয়োজনে যুক্ত হয় স্বকীয়তা নিয়ে। এ উৎসব আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিকর মানবিক মূল্যবোধে দেশকে ভালোবাসতে শেখায়। এ উৎসবে আমরা এক হয়ে বাঙালিত্ব তথা মানবতার জয়গান গাই। বিভিন্ন জাতিসত্তাকে অস্বীকার না করেও বলা যায় যে, বাঙালির ঐক্যের যে বিনিসূতোর মালা পহেলা বৈশাখ গেঁথে চলছে, তা ছিন্ন করার অপচেষ্টাও কম হয়নি। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতিই তা রুখে দিয়েছে বারবার।

বাতাসে কান পাতলেই যেন শোনা যাচ্ছে নতুন বছর পহেলা বৈশাখের আগমনী ধ্বনি। বাংলা বছরের প্রথম এই মাস বৈশাখের সারাটা সময় থাকে দেশজুড়ে আনন্দঘন পরিবেশ। সারাদেশে চলতে থাকে বৈশাখ বরণ উৎসব। বৈশাখ শুধু একটি মাসের নাম নয়, বৈশাখ আগমন মানে তীব্র এক মাতন সারাবেলা। নবোদ্যমে, নবোল্লাসে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে দীপ্ত অঙ্গীকার সবাইকে উজ্জীবিত করে এই দিনে।

পহেলা বৈশাখে জরাজীর্ণ, পুরাতনকে ছেড়ে নতুনের আহ্বানে ভেসে যাবে সবাই। ব্যর্থতা, না পাওয়ার গ্লানি, দুঃখ শোক, বঞ্চনার ক্ষোভ দুঃখ সবই ভুলে আবার নতুন করে জীবনের পথ চলার প্রত্যয় নিয়ে শক্তভাবে দাঁড়াবে নারী-পুরুষ শিশু-কিশোর তরুণ-বয়স্ক সবাই। বৈশাখের রঙে নতুন চেতনায় সাজবে সবাই। বাঙালি যেন আকুল হয়ে প্রতীক্ষা করে বৈশাখী উৎসবের। কেননা আবহমানকাল থেকে বাঙালির চিরন্তন সার্বজনীন পার্বণ বাংলা নববর্ষ। বাঙালি আর বাংলা নববর্ষ এক বিকল্পহীন অভিযাত্রা। এই সময়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আনন্দে উদ্বেল হয় নববর্ষের আহ্বানে। মঙ্গল শোভাযাত্রা, হালখাতা, কারুশিল্প লোক সংস্কৃতির বর্ণচ্ছটা, নতুন রঙিন পোশাক, হলুদ ফুলের সাজসজ্জা এবং ভোরের আলোয় নববর্ষের সুর্যোদয় সবই উদযাপন করার আকাক্সক্ষায় থাকে প্রতিটি মানুষ। এ সময়ে আমাদের ফ্যাশনভুবন আন্দোলিত হয় নতুন আনন্দে। পোশাকের আয়োজনে আসে নতুন সংযোজন। ডিজাইনে আসে নতুনত্ব। বৈশাখ মানেই লাল-সাদার চিরায়ত রূপ। আগেও নববর্ষের দিন নতুন শাড়ি পরার চল ছিল। উৎসবের নতুন পোশাক হিসেবে সবাই সাধারণত লাল পাড়ের সাদা শাড়ি বেছে নিত। এর পেছনেও কারণ ছিল। পহেলা বৈশাখ ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সার্বজনীন একটি উৎসব। এই দিনে সবাই নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে যেতে অনুভব করে বাঙালিত্বের অনাবিল বিচিত্র স্বাদ। বৈশাখ মানেই ষোলো আনা বাঙালিয়ানা। তাই বৈশাখকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে এখন সাজসাজ রব। ঐতিহ্য আর রঙের সংমিশ্রনে এসেছে নতুন নতুন ডিজাইন।

পহেলা বৈশাখের ছোঁয়া লাগছে মানুষের পোশাকে, অন্দরে, খাবার থেকে সবখানে। তারুণ্য এই বৈশাখে সেজে উঠবে রঙে রঙে। কিভাবে? পোশাকে ও ফ্যাশনে। গত কয়েক দিনে বাজার ঘুরে অনুমান করা গেছে এবার তরুণদের বৈশাখী পোশাকে দেখা যাবে নানা ডিজাইনের খেলা। সাদা লাল রঙের পাশাপাশি অন্যান্য রঙের পোশাকও এবার পরবে তরুণ-তরুণীরা। পোশাকের কাটছাঁটেও থাকবে বৈচিত্র্য। সুতি শাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখের এত রঙিন পোশাকের আয়োজনের মধ্যে এতটুকু কমেনি সুতি শাড়ির আবেদন। বরং কপালে টিপ, চুলের বাঁধনে ফুলের বাহার আর হাতভর্তি রঙিন চুড়ি-চিরায়ত বাঙালির চমৎকার এ সাজ পোশাক এদিন ছড়িয়ে দেয় ষোলো আনা বৈশাখী বার্তা।

সবাই যেন নিজের মনের মাধুরীতে তুলে ধরেছে বৈশাখী আমেজ। এখন দোকানগুলোতে আনাগোনা বাড়ছে ক্রেতাদের। বিভিন্ন ধরনের পোশাক কিনছে মানুষ। বিশেষ দিনে সাজটা হওয়া চাই মনের মতো। শুধু পোশাক কিনেই বৈশাখী আয়োজন শেষ হচ্ছে না। ফ্যাশন সচেতন নারীরা ছুটছেন পার্লারে। নারীর সৌন্দর্যকে নববর্ষের উৎসবে নতুন রঙে রাঙাতে চলছে কত অফার কত আয়োজন। বাঙালির শ্রেষ্ঠ, বৃহৎ এবং সর্বোচ্চ অসাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠান হলো বৈশাখের প্রথম দিনে বাংলা নববর্ষকে বরণ করা। এ অনুষ্ঠানের আনন্দ এবং উচ্ছ্বাস এখন আর গ্রামে-গঞ্জে সীমাবদ্ধ নেই।

বাঙালি হয়ে জন্ম নিয়ে বাংলায় কথা বলা, বাংলায় বেড়ে ওঠার কি যে আনন্দ কি যে মজা তা সবাই আমরা অনুভব করি। দেশের মাটি, দেশের সংস্কৃতি যেন আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। সংস্কৃতি মানেই সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে আর মহৎভাবে বাঁচা। আর প্রতিনিয়ত মরতে মরতে বেঁচে থাকাটার নামই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতিতে বাংলা ও বাঙালির প্রতিটি বৈশাখেরই মৃত্যু হচ্ছে। এ মৃত্যু দৈহিক নয়। আত্মিক ও মানসিক। অসুন্দরের উপাসনা করে, অকল্যাণের হাত ধরে বেঁচে থাকাটাই অপসংস্কৃতি। এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে অপসংস্কৃতির প্রচন্ড দাপট, লোভ-লালসা, ষড়যন্ত্র, হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অপরাজনীতি, জঙ্গিবাদের চর্চা আমাদের চিরন্তন বাঙালিয়ানাকে ম্লান করে দিচ্ছে। আমাদের জীবনাচরণ, খাদ্যাভ্যাস, বিনোদন, আবেগ উচ্ছ্বাস সব কিছুতেই এখন বিদেশি সংস্কৃতির ছাপ সুষ্পষ্ট। বৈশাখ এলেই আমরা সবাই একদিনের জন্য যথার্থ বাঙালি হতে নানা কসরত করি; যা অনেক সময় হাস্যকর প্রহসন মনে হয়। শুধুমাত্র লোক দেখানো পান্তা-ইলিশ উৎসবের আয়োজন রমনার বটমূলে ঘুরে বেড়ানোর কোন তাৎপর্য থাকে না তখন।

শুধুমাত্র একটি দিনের জন্য বাঙালি সাজার প্রহসন না করে সারা বছরের জন্য বাঙালি হওয়ার শপথ নিতে হবে সবাইকে।

আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি, বাঙালিয়ানা ধরে রাখতে হবে আমরণ। সারা বছরজুড়েই আমরা বাঙালি থাকতে চাই। পোশাক-আশাকে, চিন্তা-চেতনায় মননশীলতায় বাঙালি সংস্কৃতি ও জীবনবোধকে গুরুত্ব দিতে সবাইকে বিশেষভাবে যতœবান হতে হবে। আসুন, এবারের পহেলা বৈশাখে নববর্ষের আনন্দ উৎসবে হৃদয়ের গভীর থেকে আত্মোপলব্ধির চেষ্টা করি যে, আমরা সবাই প্রত্যেকে খাঁটি বাঙালি। আমাদের বৈশাখী উৎসবে বিনোদনে আর উদযাপনে স্বদেশীয় বিশ্বাস, প্রথা ও চেতনাকে যুক্ত করতে যতœবান হই। যারা অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে স্বদেশীয় আর স্বজাতীয়, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে তৎপর, তাদের প্রতিরোধ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এখনই।

পেছনে ফেলে আসা বছরটিতে যেমন আমাদের অনেক গৌরবময় অর্জন রয়েছে, তেমনি রয়েছে গ্লানি দুঃখ-বেদনাময় অনেক অভিজ্ঞতা স্মৃতি। দেশজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনা, ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে প্রাণহানি এবং সম্পদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। নারী ধর্ষণ, হত্যা আর নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার অধপতনের ঘটনা সমাজে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আমাদের প্রত্যাশা, বাংলা নববর্ষের আনন্দঘন মুহূর্তগুলো সারাবছর ছড়িয়ে থাকুক বাঙালির ঘরে ঘরে। সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধিতে ঋদ্ধ হবে বাংলাদেশ। নতুন বছরের সূর্যোদয় বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসবে। জীর্ণশীর্ণ ঝরাপাতার মতো পুরাতন বছর শেষে নতুন বছর সবুজ পাতার মতো অঙ্কুরিত হবে আমাদের জীবন ও সমাজ। সম্প্রীতির বাংলা নববর্ষে আমরা প্রত্যাশা করি, আপাত রুদ্র বৈশাখ, কালবৈশাখীর তীব্র থাবা যেভাবে ধ্বংস করে যত আবর্জনা, উড়িয়ে নেয় জীর্ণ-মলিন রিক্ততার দিন, ধ্বংসের ওপর সৃষ্টি করে নতুন বসতি, সেভাবে যেন নতুন বছরের দিনগুলোতে ধ্বংস হয় সংকীর্ণতা আর সাম্প্রদায়িকতার সব অপশক্তি। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির আলোয় উদ্ভাসিত হোক অনাগত দিনগুলো।

[লেখক : ব্যাংকার]