menu

কৈশোর ও স্বাস্থ্য

দুর্ঘটনাপরবর্তী মানসিক শক

সংবাদ :
  • ডা. মিনতি অধিকারী
  • ঢাকা , বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯

তুমি শিগগিরই একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে হারিয়েছে, যদিও নিজে আহত হওনি, তবু তুমি ওই ঘটনার পর থেকে, সব কিছু থেকে নিজেকে কেমন গুটিয়ে নিচ্ছ, বিমর্ষ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ছ। দুর্ঘটনা থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়ার পর থেকে তুমি গাড়ি চালাতে ভয় পাচ্ছ, গাড়ি চড়তে ভয় পাচ্ছ, এবং প্রায় রাতেই দুঃস্বপ্ন দেখ, ভয় পাও। তবে তুমি পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডার বা দুর্ঘটনা পরবর্তী মানসিক শক দ্বারা আক্রান্ত।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডার কি?

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডার বা দুর্ঘটনা পরবর্তী মানসিক শক মনের একটি আবেগময় অবস্থা, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনাকবলিত হলে হয়; যেখানে তার শারীরিক আঘাত পাবার সম্ভাবনা ছিল, বা সে শারীরিক আঘাত পেয়েছে কিংবা সহযাত্রীকে আঘাত প্রাপ্ত হতে স্বচক্ষে দেখেছে।

যে সব দুর্ঘটনা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডার এর কারণ হতে পারে :

অমানবিক নির্যাতত, যেমন ধর্ষণ

অগ্নিকা-, সড়ক দুর্ঘটনা

শারীরিক বা যৌন অত্যাচার

খুন, জখম, ছিনথাই, রাহাজানি

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন ঝড়, বন্যা সুনামি কিংবা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ, যেমন দাঙ্গা

সামরিক বাহিনীর শেল নিক্ষেপ

মারাত্মক কোনো অসুখের কথা জানতে পারা (নিজের, কিংবা পিতা মাতার) ইত্যাদি।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডারের লক্ষণ সাধারণত আঘাত পাবার তিন মাসের মধ্যে দেখা দেয়। কিন্তু কয়েক মাস এমনকি বছর না গড়ালে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডার এর লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট হয় না। কখনো কখনো উপসর্গ গুলি বছরের পর বছর চলতে থাকে আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা দেখা যাবার কিছু দিনের মধ্যেই মিলিয়ে যায়, শেষ জীবিনে পুনরায় দেখা যায়।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডারের লক্ষণ :

অনিদ্রা, দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা।

কাউকে সে বিশ্বাস করতে পারে না, এমন কি ঘনিষ্ট আত্মীয় স্বজনকেও না।

কিশোর-কিশোরীর মধ্যে সন্দেহ বাতিক দেখা দেয়, সে মনে করে সবাই তাকে ঘৃণা করে, জেনেশুনে সবাই তার সঙ্গে দুর্ব্যাবহার করে।

সে দুর্ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে চায় না, কোনো মতেই দুর্ঘটনার স্থান পরিদর্শন করতে রাজি হয় না।

সর্বক্ষণ ভয় ও দুশ্চিন্তা তাকে ঘিরে রাখে।

অল্পতেই সে উত্তেজিত হয়, রেগে যায়।

লেখাপড়া বা অন্য কোনো কাজে মন দিতে পারে না।

নিজেকে অনুভূতিশূন্য, সবার থেকে বিচ্ছিন্নভাবে।

কোনো কিছুতেই সে আনন্দ পায় না, এমনকি যে বিষয়গুলো সে পূর্বে দারুণভাবে উপভোগ করত তাতেও না।

নিজেকে অসহায় ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে, ভীষণ অপরাধবোধে ভোগে।

দুর্ঘটনার বিষয়টি নিয়েই সব সময় নিবিষ্ট চিত্তে ভাবে।

মাথাব্যথা, মাথাঘোরা, বমিভাব, পেটে ব্যথা অনুভব করে।

সব সময় আত্মহত্যার কথা ভাবে, পরিকল্পনা করে, কিংবা আত্মহত্যা করতে যায়।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডার এর চিকিৎসা :

@.কগনিটিভ বিহেভিওরাল থিরাপি পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডারের সুচিকিৎসায় সহযোগিতা করে। এ চিকিৎসার ফলে মন থেকে দুর্ঘটনার ছবি আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়; মনে নতুন আশা জাগানিয়া ভাবনা স্থান পায়। কিশোর-কিশোরী ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচক কাজ থেকে বিরত হয়।

@ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ওষুধের সাহায্যে ও পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডারের চিকিৎসা করে থাকেন।

আপনি সন্তানকে সাহায্য করুন।

সন্তানকে বুঝুন, তাকে সহযোগিতা করুন, মনেরোগ বিশেষজ্ঞের শরণ নিন। পরিবারের সদস্যগণ, আপনার বন্ধুমহলও আপনার সন্তানকে মানসিক চাপ মুক্ত হতে সাহায্য করতে পারে

সন্তানকে বলুন তার মানসিক আঘাত নিয়ে আপনার সঙ্গে খোলামেলা আলাপ করতে। তবে জোর করে তার কাছ থেকে কথা আদায়ের চেষ্টা করবেন না। সন্তান যখন মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে কথা বলার জন্য, শুধু তখনই কেবল তার কথা শুনতে পারেন।

সন্তানকে আশ্বস্ত করুন যে দুর্ঘটনা পরবর্তী তার এই মানসিক চাপ খুবই স্বাভাবিক, সে পাগল হয়ে যাচ্ছে এমন ভাবা ভুল। পিতা মাতার এই আশ্বাস সন্তানকে আনেক গভীর মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দিতে পারে।

সন্তানের ভেতর আত্মহত্যার প্রবণতা দেখাদিলে যথা শিগগিরই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণ নিন।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডার এ আক্রান্ত কিশোর-কিশোরী নিজেকে সর্ব বিষয়ে অক্ষমভাবে। তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে তাকে ছোটো ছোটো কিছু বিষয়ে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে বলুন। যেমন আজ দুপুরে তুমি কোন ধরনের খাবার খেতে চাও, সারা দিন তুমি কীভাবে কাটাতে চাও ইত্যাদি।

সন্তানকে আশ্বস্ত করুন যে দুর্ঘটনার জন্য সে দায়ী নয়। এবং দুর্ঘটনার জন্য কখনোই

সন্তানকে দোষারোপ করবেন না।

সন্তানের শিক্ষক এর সঙ্গে সন্তানের দুর্ঘটনাজনিত মানসিক কষ্টের কথা আলাপ করুন এবং অনুরোধ করুন তারা যেন বিষয়টিকে সহানুভূতির সঙ্গে দেখেন।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅরডার এ আক্রান্ত হয়ে সন্তান পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করলে বা আলো জ্বালিয়ে রাতে ঘুমুতে গেলে, প্রিয় কুকুরটিকে বিছানায় নিয়ে গেলে তাকে বকবেন না। সে হয়ত নিজেকে ভোলাবার জন্যই এগুলো করছে।

গন্তানের এই দুর্দিনে নিজেকে শারীরিক মানসিকভাবে সুস্থ রাখুন। কারণ দুর্ঘটনাজনিত মানসিক শক সন্তানের জীবনে দারুণ কষ্ট বয়ে আনতে পারে। এ সময়ে আপনাকে পাশে পাওয়া তার জন্য ভীষণ জরুরি।