menu

ডিজিটাল যুগে ডাক বিভাগ হয়ে পড়ছে গুরুত্বহীন

সংবাদ :
  • ইসমাইল মাহমুদ
  • ঢাকা , বুধবার, ০৯ অক্টোবর ২০১৯
image

খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ সালে পায়রা বা কবুতরের মাধ্যমে চিঠি প্রদান করা হতো। রোম এবং প্রাচীন গ্রীসে এ প্রক্রিয়াটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দ্বাদশ শতকে সিরিয়া এবং পারস্যে প্রথম এক শহর থেকে আরেক শহরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কবুতরের মাধ্যমে বার্তা প্রদান সেবা চালু হয়।

খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে দিকে সিরিয়া এবং ইরানে কবুতরের মাধ্যমে বার্তাবহন শুরু হয় বলে ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়। খ্রিস্টাব্দ ১২ শতকে বার্তাবাহক কবুতরের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখা হত সিরিয়া ও মিসরে। বার্তাবাহক কবুতরই ছিল সে সময়ের (টেলি) যোগাযোগের প্রথম এবং একমাত্র মাধ্যম। ১৮০০ সালের দিকে ফ্রান্সের রোথসচাইল্ড পরিবার ইউরোপের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংবাদের জন্য কবুতরের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। তৎকালীন সময়ে কবুতরই ছিল অন্যান্য যোগাযোগের মাধ্যমের চেয়ে দ্রুত ও কার্যকরি একটি মাধ্যম। কবুতরের গতি এবং বার্তা আদান-প্রদানের ক্ষমতা রোথসচাইল্ড পরিবারকে সাফল্য পেতে সাহায্য করেছিল। সেই আদিকালের প্রতিষ্ঠান রোথসচাইল্ড এখনও টিকে আছে।

১৮৯৬ সালে নিউজিল্যান্ড ও গ্রেট ব্যারিয়ার দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে চালু হয় বিশ্বের প্রথম সরকারি পিজিয়ন এয়ারমেল বা কবুতর ডাক সার্ভিস। গ্রেট ব্যারিয়ার উপকূলে নিউজিল্যান্ডের যাত্রীবাহী জাহাজ ‘এসএস ওয়াইরারাপার’ দুর্ঘটনার শিকার হয়। ওই দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন প্রাণ হারান। উন্নত ও ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় নিউজিল্যান্ডে জাহাজডুবির খবর পৌঁছায় দুর্ঘটনার তিন দিন পর। দুর্ঘটনার পরপরই খবর না পাওয়ায় দুর্গতদের উদ্ধারের জন্য কোন ত্রাণ পাঠানো সম্ভব হয়নি। এরপরেই দুই ভূখণ্ডের মধ্যে সরকারিভাবে পায়রা ডাক ব্যবস্থা চালু করা হয়। গ্রেট ব্যারিয়ার দ্বীপপুঞ্জ থেকে প্রশিক্ষিত পায়রা নিজের পায়ে বাঁধা বার্তা নিয়ে মাত্র ১.৭৫ ঘণ্টা সময়ের মধ্যেই নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড শহরে পৌঁছাত। প্রতিটি পায়রা একসঙ্গে ৫টি বার্তা বহন করতে সক্ষম ছিল। তবে মাত্র ৫০ মিনিটে খবর পৌঁছে দিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল ‘ভেলোসিটি’ নামের এক পায়রা ডাক হরকরা। এই বিশেষ ডাক ব্যবস্থার জন্য সে সময়ে ব্যবহার করা হত বিশেষ ডাক টিকিটও।

বিশ্বের অন্যতম বড় সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’ ১৮৫০ সালে ৪৫টি প্রশিক্ষিত কবুতরের মাধ্যমে জার্মানি থেকে বেলজিয়ামে দৈনন্দিন তাজা খবর এবং স্টক এক্সচেঞ্জের খবর পাঠানো শুরু করে। সে সময়ে জার্মানি থেকে বেলজিয়ামে ৭৬ মাইল যেতে রেলগাড়িতে সময় লাগতো ৪ ঘণ্টা। কিন্তু কবুতরের মাধ্যমে বার্তা পাঠালে তা ২ ঘণ্টারও কম সময়ে পৌঁছে যেত। পরবর্তীতে আমাদের উপমহাদেশে এ প্রক্রিয়ায় বার্তা আদান-প্রদান শুরু হয়। মজার কথা হচ্ছে কবুতরের মাধ্যমে বার্তা প্রেরণ বিশ্বে ১৯০০ সালের আগেই শেষ হয়ে গেলেও ভারতে আজ থেকে মাত্র ১৫ বছর আগে অর্থাৎ ২০০৪ সালে কবুতরের মাধ্যমে বার্তা আদান প্রদান পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

কবুতরের মাধ্যমে বার্তা পাঠালে কবুতর সে বার্তাটি প্রাপকের ঠিকানায় পৌঁছে দেবে সেটা কিন্তু ছিল না। এর জন্য আলাদা এক প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হতো। যাকে বার্তা পাঠানো হতো তার কবুতরতে নিয়ে যাওয়া হতো। এরপর কবুতরের পায়ে বেঁধে দেয়া হতো বার্তা। কবুতরকে যেখান থেকেই ছেড়ে দেয়া হোক না কেন, কবুতর নিজের বাসস্থানে ফিরে যাবে। কবুতরটি তার বাসস্থানে ফিরে যাবার পর বার্তা প্রাপক কবুতরের বাসস্থানে গিয়ে দেখতে হতো কোন বার্তা তার পায়ে বাঁধা আছে কিনা। ১৬, ১৭ ও ১৮ শতকে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা বিভাগের বা প্রতিরক্ষা বিভাগের নিজস্ব কবুতরশালা থাকতো। সে কবুতরশালায় থাকতো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কবুতর। কোন দেশের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে বা গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে সৈনিক বা গুপ্তচরেরা কবুতরশালা থেকে কবুতর নিয়ে যেত এবং বার্তা লিখে কবুতরের পায়ে চিঠি লাগিয়ে কবুতর ছেড়ে দিত। কবুতর ছাড়া পেয়ে বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নিজের বাসস্থানে ফিরে আসত। এদিকে গোয়েন্দা বিভাগ বা কবুতরশালার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়মিত খোঁজ নিত বার্তা নিয়ে কোন কবুতর ফিরে আসল কি না। বার্তাসহ কবুতর ফিরে আসলে তারা যুদ্ধের ময়দানের খবর পেয়ে যেত এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতো।

কালের বিবর্তনে এখন আর কবুতরের বার্তার দিন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এরপর বিশ্বে আসে ডাক বিভাগ। ডাক বিভাগের প্রতিষ্ঠার পর যোগাযোগের ক্ষেত্রে কবুতর হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন। ওই সময়ে ডাক বিভাগের মাধ্যমে ডাকটিকেটযুক্ত চিঠি আদান-প্রদান শুরু হয়। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে তাও শেষ হবার পথে। ইন্টারনেট কিংবা মোবাইল টেলিফোনে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের এই যুগে ডাক বিভাগের গুরুত্বও যে অনেক কমে এসেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরও সামাজিক যোগাযোগ এবং ব্যবসা বাণিজ্যে ডাক ব্যবস্থা এখনও নিভু-নিভু অবস্থায় সেবা দিয়ে চলেছে।

আজ ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস। প্রতি বৎসর এদিনে দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয়। ইউরোপের ২২টি দেশের তত্ত্বাবধানে ১৮৭৪ সালের ৯ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে গঠিত হয় ‘জেনারেল পোস্টাল ইউনিয়ন’। এর লক্ষ্য ছিল বিশ্বের প্রতিটি দেশের মধ্যে ডাক আদান-প্রদানকে অধিকতর সহজ ও সমৃদ্ধশালী করার মধ্য দিয়ে বিশ্বজনীন পার¯পরিক যোগাযোগকে সুসংহত করা। এক সময় ‘জেনারেল পোস্টাল ইউনিয়ন’ নামের এ সংস্থাটি ‘ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬৯ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ডাক ইউনিয়নের ১৬তম অধিবেশনে প্রতি বছরের ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক ইউনিয়ন দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৮৪ সালে জার্মানির হামবুর্গে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ডাক ইউনিয়নের ১৯তম অধিবেশনে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ‘বিশ্ব ডাক ইউনিয়ন দিবস’র নাম বদলে করা হয় ‘বিশ্ব ডাক দিবস’। ১৯৭৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ এ সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। ওই বছরের (১৯৭৩) ৯ অক্টোবর থেকে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ৯ অক্টোবর ‘বিশ্ব ডাক দিবস’ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

একুশ শতকের সূচনালগ্ন পর্যন্ত সারা বিশ্বের ডাকব্যবস্থা বিস্ময়কর সাফল্য লাভ করে। এরপর ই-মেইলসহ বিভিন্ন

প্রযুক্তি উদ্ভাবন মানুষকে উন্নত ও দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থায় নিয়ে যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের ডাক বিভাগ কচ্ছপ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ডাকসেবা যোগপযোগি করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ২০০০ সালে ই-পোস্ট সার্ভিস চালু করে। কিন্তু এ সার্ভিসটিও চলছে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে।

ডাক বিভাগ সূত্র জানায়, বর্তমানে সারা দেশে ‘ডাকঘর’ বা ‘পোস্ট অফিস’ রয়েছে ৯ হাজার ৮৮৯টি। আর এতে বিভিন্ন পদে কর্মরত আছেন প্রায় ৪২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। সম্ভাবনাময় ডাক বিভাগকে যুগোপযোগী, আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তি নির্ভর করতে পারলে এখনও মানুষ পুনরায় ডাক বিভাগের ওপর আস্থা ফিরে পেতে পারে। আর এটি করা গেলে সাধারণ মানুষের স্বল্প খরচে সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত হতো।

আমাদের দেশে যখন খবরা-খবরের একমাত্র মাধ্যম ছিল ডাক বিভাগ তখন ঝড়-বৃষ্টি-বন্যা উপক্ষো করে ডাক পিয়ন বা রানার প্রতিদিনই ছুটতো বাড়ি-বাড়ি। তাদের কাঁধে থাকতো বিশাল চিঠির বোঝা। ডাক ব্যবস্থার সেই রানার আর ডাক পিয়নের চিঠির বোঝাটি সংকুচিত হতে হতে এখন হাতে গোনা গুটিকয়েক চিঠিতে পরিণত হয়েছে। এক সময় হয়তো তাও থাকবে না। অর্থাৎ ডাক বিভাগের সুদিন নিঃশেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যাচ্ছে রানার বা ডাক পিয়নের বোঝা টানার দিন।

[লেখক : গণমাধ্যকর্মী ও কলামিস্ট]

ismail.press2019@gmail.com

  • বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা

    প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। ১৯৮০ সাল থেকে জাতিসংঘের অধীনে বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সকল সদস্য দেশে দিবসটি গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির প্রধান উদ্দেশ্য হলো

  • জুবিলী : বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন

    আজ ৫ অক্টোবর, ২০১৯ ‘বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন’-এর সুবর্ণ জুবিলী। ৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান উৎসব সমাজের মধ্যে সাজ সাজ রব ও আনন্দের উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। খ্রিস্টিয়ান পরিচালিত অফিসগুলোতে, চায়ের টেবিলে