menu

টেকসই নগর ও উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ

নিতাই চন্দ্র রায়

  • ঢাকা , বুধবার, ২৪ জানুয়ারী ২০১৮

শিক্ষা, চিকিৎসা ও চাকরিসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নগর কেন্দ্রিক হওয়ার কারণে বাংলাদেশের নগরগুলোর জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও নদীভাঙ্গন এ কাজকে আরও ত্বরান্বিত করছে। বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ লোক নগরে বসবাস করে। আগামী ৩৫ বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। সম্প্রতি (২৮.১০.১৭) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘বিল্ডিং নলেজ নেট ওয়ার্ক অ্যান্ড পার্টনারশিপ ফর সাসটেইনেবল আরবান ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আঞ্চলিক সম্মেলনের পর্যালোচনা সভায় এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের আবাসিক প্রতিনিধি চিমিয়াও ফান বলেন, ‘নগর হলো প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। কিন্তু দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ শহরের পূর্ণ কার্যক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে বাংলাদেশের নগরায়ণ অবশ্যই টেকসই হতে হবে।’ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স এবং বিশ্বব্যাংক কর্তৃক আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে তিন শতাধিক পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের প্রতিনিধি ছাড়াও ১৩টি দেশের জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেন।

দেশে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেলেও নানা কারণে নগরগুলোতে দারিদ্র্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুই দশকে বাংলাদেশের নগরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার বেড়ে ১৫ থেকে ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত ৫ বছরে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করেছে। ঢাকা শহরে ৮ শতাংশ অধিবাসী চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। আর এ শহরের ২৩ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বাস করে, যা গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্যের তুলনায় অনেক বেশি। গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য একটি বাড়ি একটি খামারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি চালু থাকলেও নগরাঞ্চলে তা নেই।

প্রখ্যাত উপন্যাসিক ড. নীহারঞ্জন রায় প্রাচীন বাংলা সম্পর্কে বেশ সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। তার বর্ণনা মতে, প্রাচীন যুগের বাংলার প্রতিটি শহর ছিল প্রশস্ত ও প্রচলিত মূল ও স্থলপথের ওপর বা সংযোগস্থলে অবস্থিত। সেসব প্রাচীন নগরগুলোতে রাজা, মহারাজা, সামন্ত, রাষ্ট্রীয় ও সামরিক কর্মচারী প্রমুখ ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক। ধর্মতীর্থস্থান বা শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা নগরগুলোতে গুরু, আচার্য, পুরোহিত, ছাত্র এরা ছিলেন নাগরিক। অধিকাংশ স্থানেই ব্যবসা-বাণিজ্য গুরুত্ব পেত বলে বণিকগণও ছিলেন নগরের বাসিন্দা। কর্মকার, সূত্রধর ও শংখকার প্রভৃতি পেশার অনেকেই নগরে বাস করতেন।

১৬১০ সালে বর্তমান বাংলাদেশের প্রায় কেন্দ্রস্থলে ঢাকা শহর প্রতিষ্ঠা করেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতিনিধি সুবেদার ইসলাম খাঁ। অতি দ্রুত এর সমৃদ্ধি এসেছিল এবং মনে করা হয় যে প্রতিষ্ঠার মাত্র ১০০ বছরের মধ্যে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নগরীতে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানের মতো যানজট, জলাবদ্ধতা ও ময়লা আবর্জনার উৎকট গন্ধ ও বায়ু দূষণে এত বসবাসের অনুপযোগী নগরী ছিল না ঢাকা।

বাংলাদেশের অধিকাংশ নগর ও মহানগরের অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয় এবং সেবাও নিম্ন মানের। রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার, খেলার মাঠ, শপিংমল, বিনোদন কেন্দ্রের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। নবগঠিত কোনো কোন পৌরসভায় রাস্তায় দু ’একটি বিজলিবাতি ছাড়া অন্য কোন নাগরিক সেবার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বাংলাদেশের নগরগুলো বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। সেজন্য দ্রুত বর্ধনশীল নগরের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে টেকসই নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। জনগণের জন্য বাসযোগ্য করতে হলে সরকারের সকল পর্যায়ে সমন্বয়, বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে নগরগুলোকে পরিকল্পনামাফিক পরিচালনা করতে হবে। বাংলাদেশে মোট সরকারি ব্যয়ের তুলনায় স্থানীয় পর্যায়ে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় তিন শতাংশ,যা বৈশ্বিকভাবে নিম্নতম ব্যয়ের অন্যতম। তাই দেশের স্থানীয় পর্যায়ে অবকাঠামো খাতে ব্যয় বাড়ানো দরকার।

জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সম্মেলনের প্রধান অতিথি শিরীন শারমিন চৌধুরীর মতে, বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত নগরায়ণ হচ্ছে। ফলে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে। জিডিপি থেকে শুরু করে সব অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থার উন্নতি ঘটছে।বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থতিতে নগর উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে। দেশের সব অঞ্চলে সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্থানীয় সরকার প্রশাসনকে দুর্বল করে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। পৃথিবীর সবদেশেই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা হচ্ছে অথচ বাংলাদেশে এর উল্টো চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় সরকারের জন্য যে বাজেট দেয়া হয় তা অনেক কম। তবে বর্তমান সরকার স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছে। তবুও অনেক সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশের কোন মেয়র অনুকূল পরিবেশে কাজ করতে পারেন না। তবে সরকারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পৌরসভা মেয়রদের নিজেদের আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ৩০৫টি পৌরসভাকে নিজেদের সমস্যা নিজেদের মতো করে সমাধান করতে হবে। নিজেদের নগর কেমন হবে, তা জনগণের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিকল্পনামাফিক নিজেদেরকেই গড়ে তুলতে হবে।

কিন্তু এসব কাজ বিদ্যমান নগর ব্যবস্থাপনা দ্বারা সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশে নগরগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং সেগুলোর কোনো স্ব-শাসন নেই। নেই নিজস্ব কোনো আয়ের ব্যবস্থা। প্রায় সকল উন্নয়ন কাজের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নগরগুলোকে নির্ভর করতে হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন নাগরিক সেবা ও আইন শৃঙ্খলায় নিয়োজিত সংস্থার ওপর নগর কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে নগরের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে পরিকল্পিত ও পরিবেশ বান্ধব নগর গড়ে তোলার জন্য রয়েছে স্ব-শাসিত, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক নগর সরকার। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ, নগর বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পানবিদ ও সুশীল সামজের প্রতিনিধিগণ এরূপ নগর সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি করলেও রাজনৈতিক কারণে এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

যে যাই বলুক, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর গঠনে নগর সরকারের কোন বিকল্প নেই। পৃথিবীর অনেক দেশেই তা প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য নগর সংসদ, নগর নির্বাহিক বিভাগে ও নগরবিচার বিভাগের মাধ্যমে প্রত্যেক নগরে একরূপ নগর সরকার গঠন করতে হবে। নগর সরকারের মেয়াদ হবে চার থেকে পাঁচ বছর। এ পদ্ধতিতে প্রত্যেক ওয়ার্ড হতে একজন পুরুষ ও একজন নারী কাউন্সিলর নির্বাচন করতে হবে। প্রত্যেক ভোটার পুরুষ কাউন্সিলরের জন্য একটি এবং নারী কাউন্সিলরের জন্য একটি করে দু’টো ভোট দিবেন। বিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচিত কাউন্সিলর(নগরসাংসদ) গণের সমন্বয়ে নগর সংসদ গঠন করতে হবে। নগর সংসদ হলো নগরের পার্লামেন্ট। নগর উন্নয়ন, প্রশাসন, বাজেট, বিধি-প্রবিধি ইত্যাদি প্রণয়ন করবে নগর সংসদ। অর্থাৎ নগর সংসদে গৃহীত সকল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে নগর নির্বাহী বিভাগ। নগর সংসদের সভাপতি কাউন্সিলরদের ভোটে তাদের মধ্যে হতে নির্বাচিত হবেন। তার কাজ হবে জাতীয় সংসদের স্পিকারের মতো। মেয়র নগরবাসীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। তিনি নগর সরকারের প্রধান ও নগর নির্বাহিক বিভাগের প্রধান হিসাবে কাজ করবেন। নগরের ছোটখাট অপরাধের বিচারের জন্য প্রত্যেক নগরে থাকবে একটি নগর বিচারিক বিভাগ। বিচার বিভাগের দায়িত্ব আলাদাভাবে নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের ওপর ন্যস্ত থাকবে। নগরের নির্বাচিত ও অনির্বাচিত কর্মকর্তাগণ এবং তাদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ, অনুযোগের তদন্ত সাপেক্ষে মীমাংসা ও নিষ্পত্তি করার জন্য প্রতিটি নগরে এজন ন্যায় পাল থাকবেন। তিনি নাগরিকদের সরাসরি ভোটে কিংবা নগর সাংসদগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। মিলেনিয়াম প্রপোজার পার্ট ওয়ান অনুসারে প্রত্যেক নগরে একজন নারী ডেপুটি মেয়র এবং একজন পুরুষ ডেপুটি মেয়র নির্বাচন করতে হবে এবং তাদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে।

গ্রামভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশ ক্রমেই নগরায়ণের দিকে যাচ্ছে। ফলে মানুষের জীবনযাপনের ধরন, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, আচার আচরণ, মন-মানসিকতা, পেশা ও প্রযুক্তির ব্যবহার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাথাপিছু আয় ও গড় আয়ু বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ বলতে এমন দেশকে বৃঝায়, যাদের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৪৬ থেকে চার হাজার ১২৫ মার্কিন ডলারের মধ্যে। বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৬১০ ডলার। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, একটি দেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে তার মাথা পিছু আয় হতে হবে চার হাজার ১২৬ থেকে ১২ হাজার ৭৩৫ মার্কিন ডলারের মধ্যে। খুবই দ্রুত উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে আমাদের পুঁজির সঠিক ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশের পুঁজি হলো- মানব সম্পদ, অর্থসম্পদ, কৃষি সম্পদ ও খনিজ সম্পদ। উচ্চ মধ্যম আয়ে যেতে হলে শুধু পরিকল্পিত নগরায়ণ করলেই হবে না। এ জন্য এই চারটি সম্পদের সমন্বিত ব্যবহার করে শিল্প ও ব্যবসায় সফলতা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

[লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লিঃ, লালপুর, নাটোর]