menu

চলমান রাজনীতি, নির্বাচন ও জনগণ প্রসঙ্গে

মো. মইনুল ইসলাম

  • ঢাকা , শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

দেশে চলমান রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন ও জনগণের মুক্তি ও মঙ্গলের সমস্যা ও সম্ভাবনা আলোচনাই এখানে উদ্দেশ্য। রাজনীতি আবর্তিত হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। আদর্শিকভাবে রাজনৈতিক দল গঠিত হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন এবং তাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করে জনগণের সেবা তথা মঙ্গল ও মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে তাই একাধিক দল দেখা যায়। প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নিয়ে বিজয়ী দল সরকার গঠন করে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়। অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন তাই এত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ ধরনের নির্বাচিত সরকারই বৈধ সরকার।

প্রথমেই দেখা যাক, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বৈশিষ্ট্য কী? তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং বাস্তব কর্মকা-ের মধ্যেই তাদের পরিচয় নিহিত। অথচ সরকারে থাকতে তাদের শীর্ষ নেতা-নেত্রী, আমলা-মন্ত্রী এবং ছোট নেতা-নেত্রী ও কর্মী বাহিনীর কাজকর্মই তাদের পরিচয় বহন করে। নির্বাচনের সময় প্রচার-প্রচারণায়, বক্তৃতা-বিবৃতিতে গণতন্ত্র, নির্বাচন, জনগণের উন্নয়নের নামে তাদের খুব সোচ্চার হতে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে তাদের কাজকর্মের মধ্যে কতটা প্রমাণিত হয় সেটাই প্রশ্ন এবং এসব প্রমাণের মাধ্যমেই জনগণ তাদের বিচার করে থাকে। বড় দল দুটি (আওয়ামী লীগ-বিএনপি) আসলে কেন্দ্র বা শীর্ষের দুই-একজন নেতানেত্রীকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। বর্তমানে আওয়ামী লীগ বলতে মুখ্যত শেখ হাসিনাকে বোঝায়। তারপর কয়েকজন মন্ত্রীও মানুষের মনে ভেসে ওঠে, যার মধ্যে মন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একজন। অন্যদিকে বিএনপি বলতে বেগম খালেদা জিয়াকে মানুষ বোঝে। তবে খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে জেলে থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রিজভীকেই দলে চালক বলে মনে হয়। মোট কথা, দল দুটি শীর্ষস্থানীয় মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোক দ্বারা পরিচালিত। তাদের আদর্শ-উদ্দেশ্যই দলের কর্মকা-ে প্রতিফলিত হয়। সরকারে থাকলে সেসব আদর্শ-উদ্দেশ্যই রাষ্ট্রের নীতি এবং কর্মকা-ে পরিস্ফুট হয়।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী দল। তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। তাদের আদর্শ এবং উদ্দেশ্য পরীক্ষিত। গত প্রায় ১০ বছর ধরে তাদের শাসনামলে দেশে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে, যার স্বীকৃতি এবং প্রশংসা আন্তর্জাতিক মহল থেকেও এসেছে। আন্তর্জাতিক মহল নির্মোহ এবং নির্দলীয়ভাবে সৎকাজের প্রশংসা করে এবং স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে বিএনপি এক সামরিক স্বৈরশাসকের শাসনকালে এবং তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত দল। তার মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে দলটির কর্ণধার হয়ে দাঁড়ায়। তবে ধীরে ধীরে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, তার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান বাস্তবে দলের মূল পরিচালক। বিএনপিকে দল পরিচালনায় কোন গণতান্ত্রিক নিয়মকানুন অনুশীলন করতে দেখা যায়নি। সরকার পরিচালনায়ও গণতন্ত্র ও উন্নয়নের কোন বলিষ্ঠ ও উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের দৃষ্টান্ত নেই। তাদের আমলে অসংখ্য ব্যর্থতার মধ্যে বিদ্যুতের বেহাল অবস্থা এবং দুর্নীতির রমরমা ব্যবসার মতো দুটি ঘটনার উল্লেখ করাই যথেষ্ট। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছিল এবং বাংলাদেশ সেরা দুর্নীতিবাজ দেশ হিসেবে পরপর ৪ বার বিশ্বসভায় পরিচিতি পায়।

রাজনীতিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে মূল উদ্দেশ্যই থাকে রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতা এবং সম্পদ অর্জন। দরিদ্র, দুর্বল এবং ক্ষমতাহীন মানুষের দেশে ক্ষমতাবান এবং ধনবান হওয়ার একটি বড় উপায় রাজনীতি

বিগত প্রায় এক দশক ধরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের শাসন চলছে। তবে সাধারণ মানুষ একে শেখ হাসিনার সরকার বলেই জানে। তার আমলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলেও স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে সে সাফল্যের সীমাবদ্ধতাটি হচ্ছে যে, সেটির বড় অংশই ভোগ করেছে মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর মানুষ। দেশের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ উন্নয়নের সুফল তুলনামূলকভাবে খুব কমই পেয়েছে, ফলে ঋণ-বৈষম্য দেশে প্রকট। তার সঙ্গে দেশে সুশাসনের অভাবও বেজায় প্রকট। যার ফলে দুর্নীতি জাতীয় জীবনে এক মহা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের এমন অফিস কমই আছে, যেখানে অবৈধ অর্থ প্রদান ছাড়া কাজ হয়। সরকারি কর্মীদের মধ্যে এমন একটি সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে যে, ঘুষ তাদের প্রাপ্য এবং অদক্ষতা ন্যায্য। জনগণ কর দিয়ে তাদের পুষবে এবং অন্যদিকে অবৈধ অর্থ দিয়ে প্রাপ্য সেবা কিনবে। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদককে বেশ সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। বড় বড় সরকারি রাঘববোয়াল দুদকের জালে আটকা পড়ছে দেখা যাচ্ছে। তবে এর ভয়াবহতা এত বিরাট এবং বিস্তৃত যে, দুদক এ মহা অভিশাপকে মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। দুর্নীতি শুধু সরকারি কর্মচারীরাই করে না। একদল রাজনীতিকও এ কাজ করে থাকে। এর মধ্যে সরকারের শীর্ষ নেতারাও থাকেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট, নাইকো-গ্যাটকো বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলাগুলো বিগত আমলের শীর্ষ নেত্রী এবং নেতাদের দুর্নীতির প্রমাণ বহন করে। এগুলোর কোনটি প্রমাণিত এবং কোনটি প্রমাণের অপেক্ষায়। প্রশ্ন হলো, এ সমস্ত অভিযোগ উঠবে কেন, এবং আদালত পর্যন্ত গড়াবে কেন?

বস্তুত: রাজনীতিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে মূল উদ্দেশ্যই থাকে রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতা এবং সম্পদ অর্জন। দরিদ্র, দুর্বল এবং ক্ষমতাহীন মানুষের দেশে ক্ষমতাবান এবং ধনবান হওয়ার একটি বড় উপায় রাজনীতি। রাজনীতি এবং দুর্নীতি এদের কাছে সমার্থক। এ দেশে বসবাসকারী শিক্ষিত-সচেতন মানুষ বিষয়টি ভয় বা বিনয়বশত বলে না। তবে তারা ভালো করেই জানে। আর এ সমস্ত রাজনীতিকদের ক্ষমতার দাপট এবং দুর্নীতির নানা ঘটনা মাঝে মধ্যে গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। তাদের সন্তান-সন্ততি এবং আত্মীয়স্বজনের দুর্নীতি ও দাপটের কাছে আইন ও প্রশাসন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। এদের কেউ কেউ দেশের শীর্ষ চাঁদাবাজ তদবিরবাজ এবং ঋণখেলাপিও হয়ে উঠে। বর্তমান সরকার বিশেষ করে তার শীর্ষ নেত্রী দেশ ও জনগণের প্রতি এ পর্যন্ত যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তাতে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। তবে কথায় আছে, মুনীরও মতিভ্রম হয়। ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ব যে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, সে কথাটি যারা মনে রাখে, তারাই মানুষের মনে এবং ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল এবং অক্ষয় হয়ে থাকে। ক্ষমতা কারও চিরদিন থাকে না কিন্তু মহৎ কাজের মৃত্যু নেই।

বর্তমানে দেশে নির্বাচনী হাওয়া বেশ জোরেশোরে বইছে। বিরোধী দলের মতো সাধারণ মানুষও সুষ্ঠু এবং সত্যিকার নির্বাচন চায়। কিন্তু আমাদের মতো দেশে অনেক সময়ই নির্বাচিত ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের শাসন কায়েম করে। আর একবার ক্ষমতায় গেলে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়। এ ব্যাপারে নির্বাচনকে ক্ষমতায় যাওয়া এবং থাকার ‘চাবি বানায়’ বলে সম্প্রতি লন্ডনের বিখ্যাত সাময়িকী The Economist এশিয়ার নেতাদের ব্যাপারে যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন, তা বহুলাংশে সত্য। সেই চাবি বানানোর নানা কলাকৌশলের বিবরণও দিয়েছে সাময়িকীটি। এ ধরনের কলাকৌশল বা ছলচাতুরি আমরা বিএনপি আমলে মাগুরার কালো নির্বাচন, তেজগাঁও-রমনা এলাকায় ফালুর নির্বাচন এবং ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের মাধ্যমে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ঘটনায় প্রত্যক্ষ করেছি।

এ সমস্ত ক্ষমতালোভী রাজনীতিকদের অভিধানে সত্য এবং সততার তেমন কোন স্থান নেই; যা আছে তা হলো দুর্নীতির ধন এবং ক্ষমতার দাপট। তাদের অনেকের শিক্ষা আছে কিন্তু সুশিক্ষা নেই। যেমন আমাদের ব্যারিস্টার মহোদয় সাহেব, যিনি দেশের রাজনীতির মঞ্চে নাটকের Villain বা দুর্বৃত্ত চরিত্র বলে সুপরিচিত। এ সমস্ত দুর্বৃত্ত চরিত্রের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে যারা দেশ চালায়, তারা নিজেরাও ডুবে, দেশকেও ডোবায়। একটি দেশ চালাতে গেলে যে দেশপ্রেম, প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি, দায়িত্বজ্ঞান এবং রূপকল্প নেতা বা নেত্রী থাকতে হয়, তা না থাকলে তারা ক্ষমতা, সম্পদলোভী ও তোষামোদকারী আমলা এবং রাজনীতিকদের পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

প্রকৃত অর্থে আমাদের মতো দেশে গণতন্ত্র ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দলে শীর্ষ নেতৃত্বের, বিশেষ করে নেতা বা নেত্রীর শিক্ষা, প্রজ্ঞা, দেশপ্রেম এবং সর্বোপরি দৃঢ় অঙ্গীকার থাকতে হয়। আমাদের মতো দেশে আরেকটি সমস্যা হল চাটুকার বা তোষামোদকারীদের বাহুল্য এবং বাড়াবাড়ি। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গাছের চেয়ে আগাছা বেশি জন্মায়। ক্ষমতা ও সম্পদলোভী এই চাটুকারেরাই বড় বৃক্ষটির আশপাশে বিরাজ করে তাকে দুর্বল করে এবং ভুলপথে চালনা করার প্রচেষ্টা চালায়। পরিশেষে বলতে হয়, নির্বাচনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ক্ষমতা যদি বিজয়ী দল বা জোট জনগণের সেবায় নিয়োজিত করে, তবেই রাজনীতি বিশ্বাসযোগ্য হবে এবং নির্বাচন সার্থক হবে।

[লেখক : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]