menu

খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের রোড মডেল

সংবাদ :
  • ইসমাইল মাহমুদ
  • ঢাকা , বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯

আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন) গঠিত হয়। ১৯৭৯ সালে ওই সংস্থার ২০তম সাধারণ সভায় হাঙ্গেরির তৎকালীন খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. প্যাল রোমানি বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিবৃত্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ দিনটি ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস’ হিসেবে উদযাপনের প্রস্তাব করেন। তার উত্থাপিত প্রস্তাবটি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এর ফলে ১৯৮১ সালের ১৬ অক্টোবর প্রথমবারের মতো বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশে দিবসটি পালিত হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।

আমাদের সংবিধানে দেশের প্রতিটি নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ নিশ্চিতকরণের কথা উল্লেখ রয়েছে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের খাদ্য প্রাপ্তি অন্যতম মৌলিক চাহিদা বা উপকরণ। বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে খাদ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জনগণ তাদের আয়ের বেশিরভাগ খাদ্যের জন্য ব্যয় করে। রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো সব সময়ে সবার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব সব নাগরিকের খাদ্যের মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করা। সরকারের কার্যবিধি অনুযায়ী জাতির জন্য একটি নির্ভরযোগ্য খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত। বিশ্ব খাদ্য শীর্ষ সম্মেলনে (১৯৯৬ সাল) গৃহীত সংজ্ঞা অনুযায়ী সব সময়ে সব নাগরিকের কর্মক্ষম ও সুস্থ জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় খাদ্য প্রাপ্তির ক্ষমতা নিশ্চিতকল্পে সবার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে বাংলাদেশ সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। ওই সংজ্ঞা অনুযায়ী খাদ্য নিরাপত্তা বলতে খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং মানুষের খাদ্য ব্যবহারের অধিকারকে বোঝায়। কোন বাসস্থানে যখন এর বাসিন্দাদের প্রত্যেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয় বা এর কোন বাসিন্দাই ক্ষুধার্ত অবস্থায় বসবাস করেন না কিংবা খাদ্যের অভাবে ওই বাসস্থানে কোন বাসিন্দারই উপবাসের কোন আশঙ্কা থাকে না তখন ওই বাসস্থানকে ‘খাদ্য নিরাপদ’ বলে মনে করা হয়।

বর্তমান সরকারের গত প্রায় ১১ বছরের টানা শাসনামলে খাদ্য উৎপাদনে অনেকটা নীরব বিপ্লব চলছে। খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের রোড মডেল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে দেশের কৃষিজমি অব্যাহত গতিতে হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবকিছু মোকাবিলা করে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ও মজুদ ঈর্ষণীয় পর্যায়ে রয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার চলতি বছরের তথ্যানুযায়ী, সবজি ও মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া ধান উৎপাদনে চতুর্থ এবং আলু উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। স্বাধীনতার পর থেকে গত প্রায় ৪৮ বছরে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন তিনগুণেরও বেশি, গমের উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণ, সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচগুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে দশগুণ।

নব্বইয়ের দশকে আমাদের দেশের কিছু জেলায় বছরে দুটি ফসল হতো আর অধিকাংশ জেলায় হতো এক ফসল। আর প্রায় এক দশক ধরে দেশের সব জেলায়ই বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। আর এ সাফল্য সম্ভব হয়েছে সরকারের যুগোপযোগী ও সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, কৃষিক্ষেত্রে কৃষকদের অধিক পরিশ্রম ও মনযোগ, সঠিকভাবে সার বিতরণ এবং মেধাবী কৃষিবিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণবিদদের যৌথ প্রয়াসে। আর এভাবে সবার সম্মিলিত পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পরিশ্রমে বর্তমানে বাংলাদেশ প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ এখন খাদ্য উৎপাদনে বিশ্বের জন্য অনন্য এক উদাহরণ।

খাদ্য সংশ্লিষ্ট বিশ্বের একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশ স্বাধীনের পর আমাদের দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে ২ টন চাল উৎপাদন হতো। আর বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.১৫ টনে। অর্থাৎ দেশে হেক্টর প্রতি চাল উৎপাদন হয়েছে দ্বিগুণ। চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশে^ চতুর্থ। আমন, আউশ ও বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলনে বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন উৎপাদনের রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বে প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদনশীলতা প্রায় তিন টন। আর বাংলাদেশে তা ৪ দশমিক ১৫ টন। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৫৩ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে, যা বিশ্বে চতুর্থ। ২০১৮ সালে ১৪ কোটি ১৩ লাখ টন ধান উৎপাদন করে শীর্ষ রয়েছে চীন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারতের উৎপাদন ১১ কোটি ৩৫ লাখ টন আর ৪ কোটি ৪৭ লাখ টন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া।

চাল উৎপাদনে সক্ষমতা দেখানোর কারণে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কাতে চাল রফতানি করে। ২০১৫ সালে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্প সংঘটিত হলে সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য ত্রাণ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার টন চাল পাঠানো হয়েছিল।

জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্যমতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। সারা দেশে বর্তমানে ৬০ ধরনের ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। এক সময় দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোরেই শুধু সবজির চাষ হতো। এখন দেশের প্রায় সব জেলায় সারা বছরই সবজির চাষ হচ্ছে। বর্তমানে সবজি উৎপাদনে ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে যাদেও প্রায় সবাই কম-বেশি সবজি চাষ করেন।

প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে তৃতীয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থার এক প্রতিবেদনে এ জানানো হয়েছে চীন ও ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। মাত্র দুবছর আগেও প্রাকৃতিক উৎসের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম। দ্য স্টেট অব ফিশ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চাষের ও প্রাকৃতিক উৎসের মাছ মিলিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে চতুর্থ। আর শুধু চাষের মাছের হিসাবে বাংলাদেশ পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তথ্যমতে, আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। মাত্র এক দশক আগেও দেশে আলুর উৎপাদন ছিল অর্ধ লাখ টনেরও নিচে। আর এত দশক পরে এখন উৎপাদন প্রায় এক কোটি টন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ আলু উৎপাদন করেছিল ৮৩ লাখ টন। এবছর এক কোটি টন ছাড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। ওই সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ১ কোটি ৮৪ লাখ টন আলু উৎপাদনে শীর্ষস্থানে রয়েছে চীন। আর ১ কোটি ২৩ লাখ টন উৎপাদন করে দ্বিতীয় অবস্থানে ভারত।

বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যচাহিদা নিশ্চিতকরণে সরকার নানামুখী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। খাদ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। প্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানি, বিপণন ও সরবরাহে সরকার সক্রিয় এবং যথেষ্ট সতর্ক রয়েছে। তবে দেশে খাদ্য উৎপাদনে ধারাবাহিক গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হলেও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের জন্য বিভিন্ন সময়ে বাজারে অস্থিরতা দেখা যায়। চালসহ খাদ্যের দাম এখনও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসেনি। দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে তবে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে টানাপড়েনও। নিম্ন আয়ের মানুষ এখনও প্রয়োজনীয় চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। দেশে খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে অসহনীয় অবস্থায় রয়েছেন দেশের প্রান্তজনেরা। দেশের পাহাড়, হাওর-বাঁওড়, চরাঞ্চলে বসবাসকারী প্রান্তজনদের মধ্যে এখনও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বতা তৈরি হয়নি। তারা এখনও তুলনামূলক দরিদ্র। সরকারের উচিত তাদের দিকে দৃষ্টি দেয়া।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, বাংলাদেশের এখনও অন্তত ৩ কোটি মানুষ আছেন যারা প্রতিদিন ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিইএফপি) কর্তৃক নির্ধারিত ১৮.০৫ কিলোক্যালরির নিচে খাদ্যগ্রহণ করে থাকেন। এ খাদ্যগ্রহণ একজন মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। ‘নদী ও জীবন প্রকল্প’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা যায়, চরাঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে অধিকাংশই একবেলা খেয়েই জীবনধারণ করে। দুর্গম চরাঞ্চলের মাত্র ১০ ভাগ পরিবার সারা বছর তিনবেলা খেতে পায়। বছরের অর্ধেক সময় তিনবেলা খেতে পায় মাত্র ২৫ শতাংশ এবং প্রায় সারাবছরই কম-বেশি খাদ্য কষ্টে থাকে প্রায় ৬৫ ভাগ পরিবার। একই চিত্র হাওর-বাঁওড় এবং পাহাড়ি এলাকাতেও। আর এর রয়েছে নানা কারণ। এই জনগোষ্ঠীর খাদ্য অনিশ্চয়তার যেসব কারণ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনমুখী কার্যক্রমের অভাব। এসব এলাকায় ভূমির মধ্যে প্রায় সবগুলোর খাস ভূমি। এসব ভূমি স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে বছরের পর বছর। এনব ভূমিতে অতি-দরিদ্র মানুষের কোনই অধিকার নেই। ফলে এসব এলাকার দরিদ্র ও অতি দ্ররিদ্র পরিবারারগুলো খাদ্যের সংস্থানে শহরমুখী। এদের অনেকেই এখন কর্মহীন। হাওর-বাঁওড়, চরাঞ্চল এবং পাহাড়াঞ্চলে বসবাসকারি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এসব এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বৃদ্ধি এবং খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা সুনিশ্চিতকরণের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজার বিপণন সহজতরো করে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা আবশ্যক।

[লেখক : গণমাধ্যকর্মী ও কলামিস্ট]

ismail.press2019@gmail.com