menu

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান একটি গৌরবের অধ্যায়

মো. মুজিবুর রহমান

  • ঢাকা , বুধবার, ২৪ জানুয়ারী ২০১৮

১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল স্বাধীন বাংলাদেশে অভ্যুদয়ের ইতিহাসের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়। ঊনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি ছিল অগ্নিগর্ভ। পাশাপাশি সেদিন ঘটেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে চরম বিস্ফোরণ। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করার প্রত্যয় প্রকাশ পেয়েছিল বাঙালিদের বজ্রদীপ্ত আন্দোলনে। জাতীয় মুক্তি ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে কেন্দ্র করেই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। এ গণঅভ্যুত্থান স্বাধীনতার পটভূমি রচনা করে। ‘জয় বাংলা, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, পিন্ডি না ঢাকা- ঢাকা-ঢাকা, জেলে তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো’- সে সময়কার এ সকল সেøাগানগুলো পাকিস্তানি শাসকদের কাছে রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল হলেও তাদের কিন্তু কোন কিছুই করার ছিল না।

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই ভাষা আন্দোলন থেকে বাঙালি পেয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবোধের প্রেরণা। এ ভাষা আন্দোলন বাঙালির মনে জুগিয়েছিল অদম্য শক্তি ও সাহস। সে অদম্য শক্তি ও সাহসে বলীয়ান হয়ে অধিকার আদায়ে বাঙালি জাািত ১৯৫৪’র নিবার্চনের জন্য ১৯৫৩ সালে গঠন করেছিল যুক্তফ্রন্ট। এ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ভূমিধস সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। কিন্তু বাঙালিদের ক্ষমতায় বেশিদিন থাকতে দেয়নি পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সামরিক জান্তার নেতা আইয়ুব খান রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান ও এ দেশের মধ্যে যে বৈষম্য নীতি অনুসরণ করে আসছিল তা নিরসনকল্পে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। এ ৬ দফা ছিল বাঙালিদের অধিকার আদায়ের দাবি। বাঙালির স্বাধিকার উত্তরণের ইতিহাসে ৬ দফার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। জাতির স্বকীয় মহিমায় আত্মপ্রকাশ আর আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের চাবিকাঠি ছিল এ ৬ দফা। অন্যদিকে মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনে যে বাঙালি জাতীয়তাবোধের চেতনার উন্মেষ ঘটে তা পরিপূর্ণতা পায় ৬ দফা দাবি ঘোষণায়। ৬ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন দমন করার জন্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তা কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে দেখা যায় যে ১৯৬৬ সালের প্রথম তিন মাসে বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আটবার গ্রেফতার করা হয়। ৮ মে নারায়ণগঞ্জে পাটকল শ্রমিকদের জনসভায় বক্তৃতা শেষে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন শেখ মুজিব ও আটক নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে সারাদেশে ধর্মঘট পালন করা হয়। ওই দিন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গীতে শ্রমিকসহ ১১ জন নিহত ও বহু লোক আহত হয় পুলিশের গুলিতে। বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা দেয়ার কারণে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সামরিক জান্তা ফাঁসিতে ঝোলাবার জন্য চক্রান্ত করে। এ চক্রান্তের ফলস্বরূপ ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি তাকেসহ পঁয়ত্রিশজনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে শাসকগোষ্ঠী মামলা করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সে মামলার নাম দেয় ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা।’ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যখন মামলা করে তখন বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জেলখানায় বন্দী।

১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেল গেট থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে আটক রাখা হয়। বিক্ষুব্ধ বাংলার জনতা দ্রোহের আগুনে জ্বলে ওঠে। ১৯ জুন ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সে মামলার বিচারকার্য শুরু হয়। এ বিষয়ে বাঙালি জাতি ছিল বেশ উদ্বিগ্ন। কেননা ইতোমধ্যে বাঙালি জাতি শেখ মুজিবকে গ্রহণ করেছে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা হিসেবে। বিক্ষোভ ও উদ্বেগের মধ্যে দিয়ে তার মুক্তির জন্য বাঙালি ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে। এ মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ সকলের মুক্তির দাবিতে ১৯৬৯ সালে ব্যাপক আন্দোলনের জন্য ছাত্ররা এগিয়ে আসে।

ঊনসত্তরের ৫ জানুয়ারি ৬ দফা ও ছাত্রদের প্রণীত ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ৮ জানুয়ারি সম্মিলিত বিরোধী দল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ৮টি বিরোধী দলের ঐক্যফ্রন্ট কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ দফাভিত্তিক এক ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। ৯ জানুয়ারি দেশের ৮টি বিরোধী রাজনৈতিক দলের ঐক্যের ভিত্তিতে ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি- সংক্ষেপে ‘ডাক’ গঠিত হয়। সে সঙ্গে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটির ৮ দফা দাবির ভিত্তিতে ১৭ জানুয়ারি ‘দাবি দিবস’ পালনের। ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। আবার ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটির (ডাক) আহ্বানে বায়তুল মোকাররমে গণজমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র-জনতা শাসকগোষ্ঠীর পূর্ব ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। সেদিন পুলিশ ব্যাপক নির্যাতন করে। এ নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৮ জানুয়ারি ঢাকা শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানানো হয়। সে আহ্বানে ১৮ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সফল ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্র জমায়েতের পর খন্ড খন্ড মিছিল বের করা হয় এবং উক্ত মিছিলগুলোতে সহস্র কণ্ঠের উচ্চারিত হয়Ñ ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, আইয়ুব খানের পতন চাই।’ ওই একই দিন (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন্নাহ হলে (বর্তমানে সূর্যসেন হল) ইপিআর ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ করে। ১৯ জানুয়ারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল বের হয়। মিছিলে পুলিশ বাধা দেয় ও গুলিবর্ষণ করে। ঊনসত্তরের ২০ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক ঘোষিত কর্মসূচিকে বানচাল করতে সরকার মিছিল সমাবেশের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ১১ দফা দাবিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে একটি মিছিল বের করে। ওই দিন দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে পুলিশ মিছিলে বাধা দেয় এবং ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ ঘটে। পুলিশ চলমান মিছিলে অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। সামনে ছিল ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী আসাদ। আসাদ লুটিয়ে পড়েন রাজপথে এবং সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেন। তার শার্ট রক্তে ভিজে যায়। রক্তাক্ত শার্ট নিয়ে জনগণ মিছিল করে। আসাদের লাশ নিয়ে চলে জনগণের সঙ্গে পুলিশের খ-যুদ্ধ। শহীদ মিনারের সামনে অনুষ্ঠিত শোকসভায় সংক্ষিপ্ত বক্তৃতার পর আসাদের রক্তাক্ত শার্ট ছুঁয়ে ছাত্র-জনতা শপথ গ্রহণ করে। ঊনসত্তরের ২০ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এদিনটিকে নিছক তারিখ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। এটি বাঙালি জাতির ইতিহাসের একটি অংশ।

ঊনসত্তরের ২১ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে শহীদ আসাদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে জানাজার পরে লাখো মানুষের মিছিল বের হয়। মিছিলের আগে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় : ২২ জানুয়ারি শোক মিছিল, কালো ব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন; ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মশাল মিছিল, পরে কালো পতাকাসহ শোক মিছিল; ২৪ জানুয়ারি বেলা ২টা পর্যন্ত হরতাল। এভাবেই ছাত্র আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

ঊনসত্তরের ২১ জানুয়ারি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামে পারিবারিক গোরস্তানে আসাদকে দাফন করা হয়। ২২ জানুয়ারি ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকায় সব বাড়ি আর গাড়িতে কালো পতাকা আর প্রতিটি বাঙালি তার বুকে ধারণ করে কালো ব্যাজ। ২৩ জানুয়ারি ঢাকা শহর মশাল মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়, যা ইতিহাসের বৃহত্তম মশাল মিছিল হিসেবে গণ্য করা যায়। ২৪ জানুয়ারি হরতাল। হরতালে সেদিন কলকারখানার শ্রমিক এবং সরকারি ও বেসরকারি অফিসের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে সাধারণ কর্মী পর্যন্ত সবাই ছাত্রদের সঙ্গে রাজপথে নেমে এসেছিল। মিছিলে অংশ নিয়ে মিছিলকারীরা সেøাগান দেয় ‘আইয়ুবশাহী নিপাত যাক।’ সেদিন ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের কিশোর শিক্ষার্থী (দশম শ্রেণীর ছাত্র) মতিউর রহমান তোপখানা রোডে সচিবালয়ের সামনে হরতালের পিকেটিংয়ের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন। রাজপথে সেদিন ছিল লাখো মানুষের মিছিল। চোখেমুখে আলোর ঝলক ও মুক্তির আকাক্সক্ষার ভাব নিয়ে আদমজী, ডেমরা ও পোস্তগোলা শিল্পাঞ্চল থেকে এবং টঙ্গী-তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরাও রাজপথে নেমেছিল। বিক্ষুব্ধ বাঙালি ‘দৈনিক পাকিস্তান’, ‘মর্নিং নিউজ’ এবং ‘পয়গাম’ পত্রিকা অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়। শহীদদের তালিকায় যুক্ত হয় আনোয়ার, রুস্তম, মিলন, আলমগীরসহ আরও অনেকের নাম। দুপুরে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় পল্টন ময়দানে। সেখান থেকে লাশ নিয়ে মিছিল এসে জমায়েত হয় ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) মাঠে। সান্ধ্য আইন অমান্য করে রাজপথে লাখো মানুষের ঢল নামে। ছাত্র-জনতার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে সবকিছু। এভাবেই গণবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয় গণঅভ্যুত্থান। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আগা মোহাম্মদ আইয়ুব খান এদিন ঘোষণা দেন তিনি আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর পতন ত্বরান্বিত হয়। এদিকে বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখনো ঢাকা সেনানিবাসে বন্দী। প্রতিটি বাঙালি হৃদয়জুড়ে ছিলেন তিনি। ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান হলেও এ দেশে পরবর্তী তিনদিন সান্ধ্য আইন বহাল ছিল। সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার হলে বাঙালি অদম্য সাহস নিয়ে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে। ঊনসত্তরের ৯ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে পল্টন ময়দানে এক বিশাল সমাবেশে ১০ জন ছাত্রনেতা জীবনের বিনিময়ে ১১ দফা দাবি প্রতিষ্ঠা করার সংকল্প ঘোষণা করেন এবং শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তারাই আন্দোলন অব্যাহত রাখার শপথ গ্রহণ করেন। আবার ধীরে ধীরে সমগ্র দেশ গণবিস্ফোরণে প্রকম্পিত হতে থাকে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটির (ডাক) আহ্বানে হরতাল পালিত হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ শিরোনামের মামলার (পাকিস্তানি শাসকদের প্রদত্ত নাম আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা) অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে নির্মম হত্যা করার ফলে বাঁধ ভাঙা জলোচ্ছ্বাসের মতো দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ বাঙালি রাজপথে নেমে আসে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি শাসকদের হানাদার বাহিনী। ড. জোহার হত্যায় সারাদেশ ক্রোধে ফেটে পড়ে। সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্র-শিক্ষক-জনতা রাস্তায় নেমে আসে। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীকে বিনা শর্তে মুক্তি দিলে দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ঊনসত্তরের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিকাল ৩টায় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে এক সংবর্ধনা দেয়ার জন্য বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় ডাকসুর সহ-সভাপতি ও ছাত্র সংগ্রাম নেতা তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। সেদিন বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে ছাত্রদের ১১ দফার দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। কেননা ৬ দফা ও ১১ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন গড়ে তুলেছিল ছাত্ররা এবং দাবি দুটি একে অপরের পরিপূরক। পাশাপাশি এ দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ এ দেশে একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সে সঙ্গে একক নেতা হিসেবে এ বাংলায় স্বীকৃতি পান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এ বছর গণঅভ্যুত্থানের ৪৯তম বার্ষিকী। ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান দিবস। এ দিনটি বাঙালি জাতির একটি গৌরবের অধ্যায়। এ অধ্যায়ের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন জাগ্রত হয়। পাশাপাশি এ অভুত্থান বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। এ দিকে ঊনসত্তরের ২০ জানুয়ারি আসাদের মৃত্যু গণআন্দোলনের অবয়বকে পাল্টে দিয়েছিল। শহীদ আসাদের পুরো নাম আমানউল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্স ডিগ্রির মানোন্নয়ন পরীক্ষার্থী হিসেবে চূড়ান্ত পরীক্ষায় আবার অংশগ্রহণ করেছিলেন। সে পরীক্ষার ফলাফল শহীদ আসাদ জেনে যেতে পারেননি। এ পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় শ্রেণী পেয়েছিলেন। আবার তিনি তৎকালীন সিটি ল’ কলেজের ছাত্র ছিলেন। তিনি শুধু ছাত্র ছিলেন না, তিনি একজন ছাত্র সংগঠকও ছিলেন। পাশাপাশি তিনি নরসিংদীর শিবপুর-হাতিরদিয়া-মনোহরদী এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে একটি শক্তিশালী কৃষক সংগঠনও গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৭০ সালে শিবপুরে শহীদ আসাদের নামে (শিবপুর সরকারি শহীদ আসাদ কলেজ) একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। ১৯৮৭ সালে শিবপুরে শহীদ আসাদের নামে (শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাইস্কুল এন্ড কলেজ) একটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আসাদের মৃত্যুর পরপরই ঊনসত্তরের আন্দোলনকারীরা স্বতঃস্ফর্তভাবে আইয়ুব গেটের নাম পরিবর্তন করে রাখে আসাদ গেট। শহীদ আসাদের মতো শহীদ মতিউরও স্বাধীনতার আন্দোলনের ইতিহাসে এক ধ্রুবতারা। ঊনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি স্কুলের ছাত্র মতিউর রহমানের বুকের রক্তে ঢাকার কালো পিচঢালা পথ লাল হয়ে যায়। বিকালে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় মওলানা ভাসানী গায়েবানা জানাজা পড়ান। আসাদ, মতিউর, মকবুল, রুস্তমসহ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের স্বপ্ন শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে এগিয়ে আসতে হবে সকলকে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে ঊনসত্তরে ঘটেছিল ইতিহাস কাঁপানো গণঅভ্যুত্থান। এর প্রভাব পড়েছিল পড়েছিল ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে। এ নির্বাচনে বাঙালি প্রমাণ করেছে জাতীয় মুক্তি ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ জাতি আপস করে না। আবার এ নির্বাচনের প্রভাব পড়েছিল আমাদের স্বাধীনতা ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে। ৬ দফা ও ১১ দফার দাবি আদায় ও বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্তির দাবিতে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, সেই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আজকের প্রজন্মকে জানান দিয়ে বলে যেতে চাই গত শতকের ষাটের দশক বাংলাদেশে স্বর্ণযুগ হিসেবে লেখা থাকবে। আমাদের সকলকে সেই ইতিহাস জানতে হবে। তা না হলে বারবার পথ হারাবো। সেই সঙ্গে বিকাশ ও অগ্রগতির পথে প্রেরণা লাভ করতে পারব না।

[লেখক : কলেজ শিক্ষক এবং ডিজিটাল সংগ্রহশালা আর্কাইভস ৭১ এর প্রতিষ্ঠাতা]