menu

ঈদের তাৎপর্য ও শৈশবের কিছু স্মৃতি

সামসুল ইসলাম টুকু

  • ঢাকা , রবিবার, ১১ আগস্ট ২০১৯
image

মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য বছরের দুটি ঈদ সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন। ধর্মীয় ছুটির দিন, খুশির দিন, সুন্দর ও ভালোবাসার দিন। ঈদুল ফিতরের উৎসবটি হয় রমজান মাসের ২৯ অথবা ৩০ দিনের সিয়াম সাধন বা সংযম পালন শেষে রোজা ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে এবং ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ হয় জিলহজ মাসের দশম তারিখে। ঈদ অর্থ খুশি বা আনন্দ। এটি আরবি শব্দ। এটির প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা বা হারানো জিনিস ফিরে পাওয়া। দুটি ঈদই মহা ধুমধামের সাথে পালিত হয়। বিভিন্ন প্রকার খাদ্য বানানো, নতুন নতুন রং-বেরঙের পোশাক পরিধান, আত্মীয়স্বজনদের বাড়ি বেড়ানো, খেলাধুলার আয়োজন ইত্যাদি। এদিনে মুসলমানরা একত্রিত হয়ে সামাজিকভাবে মাঠে বা মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে পরস্পর সালাম ও মুসাফা, কোলাকুলি ও মতবিনিময় করেন। এ দিন ছোটরা পরস্পরের বাড়িতে যায়, খাবার খায়, নতুন জামা কাপড় পরে, উপহার আদান প্রদান করে, হাসি আনন্দ বিতরণ করে। এ পবিত্র ঈদ আনন্দের জন্য পুরো এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। ঈদের চাঁদ দেখা দিলেই বাচ্চারা পটকা ফুটিয়ে জানান দেয় তাদের বহু প্রতীক্ষিত আনন্দের দিনের আগমন। মা বোনেরা মেতে ওঠেন হরেকরকম রান্নায়। আন্ধাসা, সেমাই, লাচ্চা, জর্দা পোলাও, ক্ষীর, হালুয়া, লুচি-পুরি, পাটিসাপটা, চটপটিসহ হরেক রকমের সুস্বাদু খাবার রান্না করেন। এ খাবার যেমন নিজেরা খান তেমনি আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শীদের বাড়িতে পাঠান, গরিব-দুখীদের মাঝে বিতরণ করেন এবং বাড়িতে বেড়াতে আসা অতিথিদের খাওয়ান। ছেলেমেয়েরা রং-বেরঙের নতুন ডিজাইনের কাপড় পরে, হাতে মেহেদি লাগায় ও প্রসাধন করে, আতর মাখে, লিপিস্টিক লাগায়। এরপর এরা যখন পথে বের হয় তখন অভূতপূর্ব দৃশ্য নজরে আসে। সকলে কোলাকুলি করে হাসে খেলে ঈদের আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। এ যেন বাঁধভাঙ্গা খুশির দিন। দলে দলে পরস্পর পরস্পরের বাড়িতে যায়, মিষ্টি মুখ করে, বড়দের সম্মান জানায়। রাস্তায় ঘোরে, দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে যায়। এ সকল আনন্দ সবই হয় আর্থিকসঙ্গতি ভেদে। তবে কমবেশি হলেও আনন্দ কিছু হয়।

ঈদ উৎসবের বাইরের দিকটা এমন হলেও অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ভিন্ন। তা হলো একটি সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের সম্মিলিত হওয়া, সুখ ও দুখকে ভাগ করে নেয়া, উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়ানো, দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য মহান আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করা, মুসলিম সম্প্রদায়ের ভালোবাসা ও আত্মার বন্ধনকে মজবুত করা, হিংসা ভেদ ভুলে একাত্মতা হয়ে যাওয়া এবং সারা বছর সারাজীবন তা অটুট রাখা। ঈদ যেমন সমাজের ঐক্য ও শান্তির প্রতীক তেমনি তা আনন্দ উৎসবের। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে যে, ঈদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একদিনেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। তা সারা বছর বিস্তৃত হয় না। তাইতো সমাজে এতো হিংসা, ভেদাভেদ ও শত্রুতা। ঈদের ওই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা যেমন অনুপস্থিত তেমনি সমাজে ও ব্যক্তি পর্যায়েও অনুপস্থিত। তাই সত্যিকার অর্থে ঈদের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। মুসলমানরা দীর্ঘদিনের রীতি পালন করতে হয় তাই করে। ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদ হচ্ছে আনন্দের পাশাপাশি ত্যাগের উৎসব। যেমন অনেক পোষা ও আদরের জীবকে জবাই করে। শুধু তাই নয় কোরবানির মাংস তিন ভাগ করে এক ভাগ গরিব মানুষদের মাঝে বিতরণ করতে হয়, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনের মাঝে বিতরণ করতে হয় এবং এক ভাগ নিজেদের খাবার জন্য রাখতে হয়। কিন্তু আজকাল তা হয় না। ধনীরা লাখ লাখ টাকা দিয়ে বড় বড় গরু ছাগল কেনে। কোরবানির দিন জবাই করে। কিছুটা হয়তো গরিবদের মাঝে বিতরণ করে আর বাকিটা ডিপফ্রিজে জমা রেখে দেয় সারা বছর খাবার জন্য। অর্থাৎ ত্যাগের বিধান পরিত্যাগ করে ভোগের বিধান চালু হয়ে গেছে।

ঈদ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোন স্মৃতির কথা আমার মনে পড়ে না। তবে ছোটখাটো যে স্মৃতিগুলো আজও আমার স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে সেগুলোই বলব। খুব সাধারণ ঘরের সন্তান আমি, তাই শৈশবে (৫০-এর দশকে) টয়লেট সাবান দিয়ে গোসল করা সম্ভব হয়নি। মা সকালে উঠে আমার সকল কাপড় চোপড় খুলে সমস্ত ভেজা শরীরে চালের আটা ডলে দিতেন। দেখা যেত ওই আটার সাথে শরীরের সমস্ত ময়লা কালো হয়ে বেরিয়ে আসতো। তাতেই শরীরটা ফুরফুরে হয়ে যেত। সাবান দিয়ে গোসল করার স্বাদ অনুভব করতাম। মা ছোলা ডাল ভিজিয়ে রেখে সেটা নুড়া পাটায় বেটে ডালডা দিয়ে ভেজে বাদাম ও চিনি দিয়ে হালুয়া তৈরি করতেন। নরম হালুয়া বড় প্লেটে সমান করে রেখে দিতেন। সেটা শুকালে চাকু দিয়ে কেটে চারকোনা করে বরফি প্রস্তুত করতেন। সেটা যে কত সুস্বাদু ছিল তা আজো ভুলতে পারি না। এছাড়া আন্ধাসা বা মালপোয়া বা তেলপিঠা করতেন সেটা গরুর গোশতের সাথে ঝোল দিয়ে খেতে দিতেন। যার স্বাদ ভুলবার নয়। বারবার খেতে মন চায়। কোরবানি ঈদে দেখতাম নামাজ শেষে মোল্লাদের ছোরা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। গরু ছাগলের মালিকরা ৪-৫ জন মিলে গরুর পায়ে দড়ি বেঁধে মাটিতে ফেলে দিত আর মোল্লাজি আল্লাহ্ আকবর বলে পশুর গলায় ছুরি চালিয়ে দিত নির্মমভাবে। শৈশবে এ পশুর গলাকাটা চেহারাটা এবং রক্তের দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারতাম না। হৃদয়ে খুব ব্যথা অনুভব করতাম। মনে হতো বড় মানুষগুলো এত নির্মম নিষ্ঠুর কেন? ছোটবেলায় আমাদের একটা পোষা ছাগল ছিল, যাকে ছয় মাস ধরে পুষেছি। তাকে আমিও ঘাস, পাতা, খাবার দিতাম। তার গলা জড়িয়ে ধরে আদর করতাম। কোরবানির দিন যখন ওই ছাগলকে জবাই করল তখন আমি কেঁদে ফেললাম। শুধু তাই নয় মাকেও কাঁদতে দেখেছি। এরপর বেশ কয়েকটি ঈদে আমি জবাই করা দৃশ্য দেখতে যেতাম না। পরে বুঝেছিলাম এটা একটা ধর্মীয় প্রথা এবং সারা বিশ্বে এই ঈদে অসংখ্য পশু কোরবানি দেয়া হয়। তা যদি না দেয়া হতো তাহলে এই গরু ছাগলের বংশ বিস্তার মানুষের সমস্যা হয়ে দাঁড়াতো। ঈদের দিন মা গোসল করিয়ে কাপড় পরিয়ে দিলে আব্বা আমাকে সাথে নিয়ে ঈদগাহ ময়দানে যেতেন। সেখানে নামাজের পূর্বে পটকা ফুটানো হতো। কয়েকটা লোহার চোঙ্গে ঠেঁসে বারুদ ভরে সেই চোঙ্গার নিচের দিকে দেয়া সলতেতে আগুন দিলে তা প্রচন্ড শব্দে বিস্ফোরিত হতো। এ শব্দ দিয়ে জানান দেয়া হতো নামাজ শুরুর সময় হয়ে গেছে। কিন্তু আমি ওই শব্দে চমকে গিয়ে আব্বাকে জাপটে ধরতাম। নামাজের সময় যখন হাজার-হাজার মানুষ রুকু ও সেজদায় যেতেন তখন আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম। আব্বা বসিয়ে দিতে চাইলেও বসতাম না। দাঁড়িয়ে যেতাম এবং রুকু ও সেজদায় যাওয়ার অভাবিত দৃশ্য উপভোগ করতাম। শৈশবের এসব স্মৃতি মাঝে মধ্যেই মনে পড়ে। আর মনে হয় আবার যদি শৈশবে ফিরে যেতে পারতাম।

[লেখক : সাংবাদিক]