menu

আইন করে বন্ধ করে দিন ভিন্নমতের পথ

সংবাদ :
  • জাকারিয়া জাহাঙ্গীর
  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর ২০১৯

নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য সারা দেশে টালমাটাল উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুটি সহযোগী ও ভাতৃপ্রতিম সংগঠন। ক্যাসিনো ও টেন্ডারবাজিসহ অবৈধ অর্থ উপার্জনের দায়ে আওয়ামী যুবলীগের বেশকিছু কেন্দ্রীয় নেতা বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, মাদক, স্বর্ণালঙ্কার ও জুয়ার সরঞ্জামসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক এবং সংগঠনটির চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর ব্যাংক হিসাব জব্দ ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। ক্ষমতার অপব্যবহার ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদধারীকে স্বপদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। নানা বিতর্কিত কারণেই এখন এ দুটি সংগঠন জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়েছে, দেশবাসীর কাছে বড় মুখে কথা বলার কিংবা মুখ দেখানোর নৈতিক অধিকার থেকে অনেক দূর ছিটকে গেছে। দেশে নেতিবাচক রাজনীতির অবাধ চর্চা ও ইতিবাচক রাজনীতির এ দুঃসময়ে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার মধ্য দিয়ে মূলত আগুনে ঘি ঢেলে দিল ছাত্রলীগ।

এমন এক সময়ে ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীরা হত্যাকাণ্ডটি ঘটাল; যার কিছুদিন আগেই সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো চেয়েছিলেন- ছাত্রলীগকে ঢেলে সাজাবার, দুর্নামের হাত থেকে বাঁচিয়ে সোনালি অতীতের গৌরবময় ইতিহাসের গর্বিত প্রজন্ম হিসেবে নেতাকর্মীদের গড়ে তুলতে। কিন্তু বিধিবাম! সন্ত্রাসের কাদা গায়ে মাখিয়ে নতুনরূপে তারা জানিয়ে দিল- ‘আমরা যেই, সেই’। এখন প্রশ্ন হলো, ছাত্রলীগ কি অপ্রতিরোধ্য? কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শাস্তি দেয়ার পরও যে নেতাদের মনে কোন ভয়ের সঞ্চার হলো না, তবে কি নিজেদের শেখ হাসিনার চেয়েও ক্ষমতাবান মনে করেন?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (তড়িৎকৌশল) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন আবরার ফাহাদ। কুষ্টিয়ার ছেলে আবরার হয়তো জানতেন না, প্রতিবাদী বাক্য উচ্চারণই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। তিনি জানতেন না, এতোই অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা ও হত্যাকাণ্ডের অলিখিত অধিকার ছাত্রলীগের। গণমাধ্যমে এসেছে, ভারত নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার আগে তার মোবাইল কেড়ে নিয়ে শিবির আখ্যা দেয়া হয়েছিল। তবে কি বুয়েটের শিক্ষার্থীদের সব কর্মকাণ্ডের গোয়েন্দা নজরদারি কিংবা সবার ফেসবুক স্ট্যাটাস পর্যবেক্ষণের দায়িত্বও পালন করে ছাত্রলীগ? তিনি কি দেশবিরোধী কোন অপপ্রচার করেছিলেন? নাকি সরকার ও ছাত্রলীগ নিয়ে আপত্তিকর কোন মন্তব্য করেছিলেন যে তাকে হত্যাই করতে হবে?

আবরার ফাহাদকে হত্যার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ তাকে ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী প্রথম বাংলাদেশি শহীদ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তবে এটা সত্য যে, দেশের স্বার্থে প্রতিবাদ করে হত্যার শিকার হয়ে তিনি অমর হয়ে গেলেন। তার মৃত্যু বুয়েটের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদের শক্তি হিসেবে মনে করছেন, হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলনে শিক্ষকরাও অংশগ্রহণ করেছেন। হত্যার সঙ্গে জড়িত বুয়েট ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল ও সহ-সভাপতি মুস্তাকিম ফুয়াদসহ কয়েকজনকে পুলিশ আটক করেছে। বুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি খন্দকার জামিউশ সানি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতাদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। কমিটির অধিকাংশ নেতার এহেন অন্যায়ের কারণে সহসাই তার পদত্যাগ করা উচিত ছিল, কিন্তু তিনি করেননি। কেন্দ্রীয় সংগঠন কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করেছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে, তবে তাদের বিরুদ্ধে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিতে হবে, এদের পেছনে ঈন্ধনদাতা কারা তাও বের করতে হবে। ভবিষ্যতে এরা কেউ যেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কোন সুযোগ না পায় কর্তৃপক্ষকে সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ও দায় এড়াতে পারে না।

ফেসবুকে আবরার বাংলাদেশের প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করেছিলেন। বাংলাদেশ ভারতের কাছে কলকাতা বন্দর ব্যবহারের অনুরোধ করেও না পাওয়া ও এখন বাংলাদেশের মোংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের আবদার, ভারতকে চাহিদামতো ফেনী নদীর পানি দেয়া, গ্যাস সুবিধা দেয়া, বাংলাদেশ অভিমুখে অসময়ে ফারাক্কার পানির দেয়া ও ভারতকে বাংলাদেশের ইলিশ উপহার দেয়ার বিষয় নিয়ে লিখেছিলেন। সরকার দেশে অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বললেও শুধু ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণে সরকারদলীয় অঙ্গ সংগঠনের লোকজনই তাকে হত্যা করল, যা কখনোই কাম্য ছিল না। প্রতিটি সচেতন মানুষ জানেন, আবরার যা লিখেছিলেন, তা সত্য নাকি মিথ্যা। তিস্তার পানির সুষম বণ্টন দীর্ঘদিনেও হয়নি, ভারত বারবার অসময়ে ফারাক্কার বাঁধ খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে। অথচ আমরা ঠিকই ফেনী নদীর দেড় লাখ কিউবিক মিটার পানি ভারতকে দিচ্ছি। তাদের কয়লা ও পাথর আমাদের দেয়া বন্ধ করে দিলেও আমরা গ্যাস দিয়ে যাচ্ছি। দেশের অনেক শিল্প-কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ হলেও তাদের গ্যাস সুবিধা বন্ধ করা হয়নি। এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে আমরা ভারতকে ৫০০ টন ইলিশ শুভেচ্ছা উপহার দিলেও তারা এ দেশে পিয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে এ দেশে পিয়াজের দাম এখন আকাশছোঁয়া। তাদের ট্রানজিটসহ বিভিন্ন চুক্তিতে পর্যাপ্ত সুবিধা দিলেও বাংলাদেশের বন্ধুত্বের সুযোগে তারা নিজেদের কখনও কখনও প্রভূত্বের আসনে দাঁড় করায়। এসব বিষয়ে নীতিগতভাবে যে কেউ যে কোনভাবে প্রতিবাদ করতে পারে, যদি সরকারের কোন পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী হয়। তবে কারও প্রতিবাদ যদি অযৌক্তিক, অন্যায় বা দেশবিরোধী হয়, তবে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। তবে তা কোনভাবেই হত্যা কিংবা নাশকতা দিয়ে নয়, এমনকি কোন ব্যক্তি বা সংগঠন আইন নিজ হাতে তুলে নিয়েও করতে পারে না।

মেধাবী শিক্ষার্থী আবরারকে প্রকাশ্য হত্যা করা হলেও কেউ এগিয়ে না আসাটা সমাজের জন্য লজ্জা ও বুয়েট প্রশাসনের জন্য চরম ব্যর্থতা। ভবিষ্যতের জন্য বুয়েট নিরাপত্তাহীন ক্যাম্পাস হিসেবেই জাতির কাছে কলঙ্কের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আবরারের হত্যাকাণ্ডস্থল বুয়েটের ২০১১ কক্ষটি ছাত্রলীগ ‘টর্চার সেল’ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে এলেও কর্তৃপক্ষ তা জানে না- বললে ভুল হবে। শুধু বড় ধরনের ঘটনা ঘটলেই তা নিয়ে তোলপাড় চলে, সবাই তৎপর হয়; তার আগে প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে, যা বাংলাদেশের কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতদিন কীভাবে কক্ষটি প্রকাশ্য অপকর্মের অলিখিত কার্যালয় হিসেবে ছিল, এ জবাবের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও আইনের আওতায় আনা জরুরি। এখানে ইতিপূর্বে কী কী অন্যায় সংঘটিত হয়েছে, তা একে একে বের করে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশে তথ্য অধিকার আইন আছে, আবার সে অধিকার খর্ব করার প্রভাবশালী মহলও আছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে, আবার ভিন্নমত দমনে বিভিন্ন আইনের অপপ্রয়োগও চলছে। বিশেষ করে বর্তমানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন ডিভাইসের মাধ্যমে সাত-পাঁচ না ভেবে কোনকিছু প্রকাশ করা অকাল বিপদের কারণ। ফলে ‘নিজের পায়ে কুড়াল মারা’র মতো বিপদে পড়ার ভয়ে সত্য ও ন্যায়সঙ্গত অনেক বিষয়েই সবাই আর কথা বলতে চান না। দেশের অগণিত সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম থাকা সত্ত্বেও অনেক ঘটনাই ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ’র দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়- তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আইনের বাধ্যবাধকতা থাকায় সংবাদ মাধ্যমগুলো সমাজের অনেক সংবাদ এড়িয়ে গেলেও সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। ফেসুবক, টুইটার, ইউটিউব, মেসেঞ্জারসহ সোশ্যাল মিডিয়াগুলো অনেকটা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের সুযোগ থাকায় বর্তমান সময়ে ‘প্রতিবাদের আদর্শ স্থান’ হিসেবে মনে করা হয়। অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হওয়া বিষয় নিয়ে সংবাদ মাধ্যম তৎপর এবং রাষ্ট্র সজাগ হয়। সেই হিসেবে ‘রাষ্ট্রের পঞ্চম স্তম্ভ’ সোশ্যাল মিডিয়া। কিন্তু শক্তিশালী এ মাধ্যমের প্রতিবাদকে গলাটিপে ধরলে হয়তো প্রতিবাদের ন্যূনতম ভাষাও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলবে মানুষ। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনের পক্ষে বিদেশি গণমাধ্যমে বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার শহিদুল ইসলাম বক্তব্য দেয়ায় তার প্রতি যে রাষ্ট্রীয় খ—গ নেমে এসেছিল, তা কেউ ভোলেনি। শিক্ষার্থীদের ওপরও নির্যাতনের মাত্রা কম ছিল না। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা তরুণদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ গালি দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। অথচ বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক ও উগ্র ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে প্রিয়া সাহা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে বিচারের ধরনা দিলেও তার ব্যাপারে কোন শাস্তিমূলক উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে দেশবাসী মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংজ্ঞা এখন ক্ষেত্রবিশেষ ভিন্ন ভিন্ন মনে করেন। তাই মতপ্রকাশের অধিকার যদি ক্ষেত্রবিশেষ আলাদা হয়, ভিন্নমত প্রকাশ যদি অপরাধ হয়, আর সে অপরাধের শাস্তি যদি হত্যা বা নির্যাতন হয়; তবে আইন করে ভিন্নমত প্রকাশের পথ বন্ধ করা হোক। মানুষ অন্তত একদিকে থাকবে যে, ‘জি হুকুম জাঁহাপনা’ ছাড়া করার কিছু নেই।

[লেখক : কবি, সাংবাদিক ও

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক ]

mzjahangir@gmail.com