menu

স্মরণ

তিনি ছিলেন খেটে খাওয়া মানুষের অনিবার্য নেতা

সংবাদ :
  • মো. মুজিবুর রহমান
  • ঢাকা , শুক্রবার, ০৯ নভেম্বর ২০১৮
image

আজ ৯ নভেম্বর ২০১৮, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ৬৮তম জন্মবার্ষিকী। অন্যভাবে বললে বলতে হয় ৬৯তম জন্মদিন। বেঁচে থাকলে তিনি আজ ৬৯ বছরে পা রাখতেন। ১৪ বছর আগে ২০০৪ সালের ৭ মে মাটি ও মেহনতি মানুষের সংগ্রাম-আন্দোলনের পুরোধা আহসান উল্লাহ মাস্টার ঘাতকচক্রের ব্রাশফায়ারে শহীদ হন। তার জন্ম গাজীপুরের সাবেক পূবাইল ইউনিয়নের (বর্তমানে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অধীনে) হায়দরাবাদ গ্রামে। জন্ম তারিখ ৯ নভেম্বর ১৯৫০ সাল।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার কিংবদন্তির মতো সব মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় প্রজ্বলিত মশাল হয়ে জ্বলছে। তার মূলধন ছিল এ দেশের মাটি ও মেহনতি মানুষ। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ছিল তার অকৃতিম ভালোবাসা। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার আন্দোলন-সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ ও জনগণের ইতিহাসের মধ্য থেকে উঠে আসা একজন সংগ্রামী মানুষ। তার সংগ্রাম ছিল খেটেখাওয়া মানুষের জন্য। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনতার জন্য তিনি রাজনীতি করেছেন। সাধারণ মানুষকে আপন করে নেয়ার এক দুর্লভ গুণ তার মধ্যে ছিল। তিনি যেমন সাধারণ মানুষকে সহজে আপন করে নিতে পারতেন, তেমনি সাধারণ মানুষও তাকে আপন করে নিয়েছিল। সাধারণ মানুষের অন্তরের মণিকোঠায় তিনি আপন আসন করে নিতে পেরেছিলেন। সেজন্য তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা ছিল অপরিমেয়। তার এ ভালোবাসা, সারাটা জীবন সৎ থাকা এবং অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার পেছনে তার রাজনৈতিক দর্শন, পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর আদর্শও কাজ করেছে। বিনম্র চরিত্রের এ অসামান্য রাজনীতিক কোনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। অন্যদিকে ছাত্রজীবন থেকে তিনি সোচ্চার ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায়, সত্য প্রতিষ্ঠায় এবং সব প্রগতিশীল আন্দোলনে। এদিকে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের পক্ষে তার অসাধারণ ভূমিকার জন্য শহীদ আহসান উল্লাহ সকলের অন্তর ছুঁয়ে আছেন।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপি ছিলেন আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক। গত শতকের ষাট দশকে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর সম্পর্কে আহসান উল্লাহ মাস্টারের দ্ব্যর্থহীন উচ্চারণ ছিলÑ ‘বঙ্গবন্ধু ছাড়া আমাদের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়।’ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ) সেই যে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বললেনÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’; আহসান উল্লাহ মাস্টারের মতো হাজারও কর্মী তাদের নেতা বঙ্গবন্ধুর ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে এগিয়ে গেলেন অবিসংবাদিত নেতার দেখানো পথে, ঐক্যবদ্ধ হলো বাঙালি জাতি। আহসান উল্লাহ মাস্টার জীবনবাজি রেখে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য অবতীর্ণ হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে গৌরবোদ্দীপ্ত সফল ভূমিকা ও অবদান।

শহীদ আহসান উল্লাহ একজন শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতা জীবনের প্রথম দিকে তরুণ আহসান উল্লাহ মাস্টার শুধু যে শ্রমবিষয়ক ও শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তা নয় তাকে আমজনতার দরদী নেতার ভূমিকা পালন করতেও দেখা গেছে। সত্য সন্ধানের কঠিন সাধনা উপলব্ধি থেকে বলতে পারি শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ব্যক্তিসত্তার মধ্যে একজন সমাজদরদী মহান মানুষের চরিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। শ্রমিকদের অভাব অভিযোগ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেনদরবার করা এবং তাদের স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টায় কোনদিনই তাকে পিছ-পা হতে দেখা যায়নি। ধীরে ধীরে মেহনতি মানুষ তাদের এই দরদী নেতার এমন অন্ধ-অনুসারী হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, তার আহ্বানে দু’তিন ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার লোকের সমাবেশ হওয়ার বিচিত্র দৃশ্য অবাক-বিস্ময়ে ঢাকা-টঙ্গী-গাজীপুরের সবাই বারবার প্রত্যক্ষ করেছে। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার তার অন্তরের দরদ দিয়ে আমজনতার ভালোমন্দ খোঁজখবর নিতেন ও তাদের নিয়ে ভাবতেন বলেই তার কথায় মানুষ সাড়া না দিয়ে পারতেন না। আর এভাবেই তিনি শ্রমিক ও জনতার দরদী নেতা রূপে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। সমাজের সকল স্তরের মানুষের সঙ্গেই সমভাবে তিনি মিশতে পারতেন। গরিব-দুঃখীদেরই একজন হয়ে সাধারণ মানুষের সমাজেও তিনি অকৃত্রিমভাবে মেলামেশা করতে পারতেন। তাকে সবাই ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতেন। বিপন্ন অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য তার অন্তরে সঞ্চিত ছিল সীমাহীন সহানুভূতি ও দরদ; এ জন্যই দেখা গেছে যে, গরিব-দুঃখীদের সহযোগিতার বেলায় তিনি অকৃত্রিম বন্ধু। শ্রমবিষয়ক আন্দোলনে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হলে, সেই মামলার আইনি লড়াইয়ের জন্য আইনজীবী নিয়োগ ও মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল গঠনসহ বহুবিধ কর্মযজ্ঞের সাথে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার পরিচিত হয়েছেন। ঢাকা-টঙ্গী-গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানের নির্যাতিত ও ভোগান্তির শিকার শ্রমিকদের জন্য মামলাবিষয়ক আইনি লড়াইয়ের জন্য ছুটে যেতেন তিনি নিজে। অসাধারণ বন্ধুপ্রীতি ও অনুগতজনের প্রতি গভীর সৌহার্দ ও অকৃত্রিম ভালোবাসা ছিল শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের অন্যতম গুণ। যাকে একবার তিনি বন্ধু বলে গ্রহণ করেছেন, তার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে তিনি সর্বক্ষণ প্রস্তুত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তাধারার জীবন-জোয়ার সৃষ্টি এবং সেই সঙ্গে তাকে সুসংহত করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার পথে তিনি ছিলেন একজন মাঠের দক্ষ কর্মী । তিনি ছিলেন, একজন দেশভক্ত প্রেমিক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা বিনির্মাণ ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য।

একজন সম্পূর্ণ মানুষকে আবিষ্কার করতে গিয়ে দেখা যাবে, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছেলেবেলা অন্য দশজনের ছেলেবেলার মতোই শুরু হয়। শিশু ও শৈশবে নিবিড় পল্লী-প্রকৃতিতে দিন অতিবাহিত করেছেন তিনি। ছয় ভাইবোন, অনেক বন্ধুবান্ধবের কলকাকলি এবং হাতছানির মধ্য দিয়ে দিনগুলো কেটেছে তার। আহসান উল্লাহ মাস্টারের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের হায়দরাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি টঙ্গী হাইস্কুলে ভর্তি হন। তখন থেকেই টঙ্গীতে ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। ছাত্রছাত্রী কর্তৃক শরীফ কমিশন রিপোর্ট প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার ১৯৬৪ সালে বিচারপতি হামুদুর রহমানকে প্রধান করে ছাত্র সমস্যা ও ছাত্র কল্যাণ বিষয়ে একটি নতুন কমিশন নিয়োগ করে। এ সকল ক্ষেত্রে ছাত্র আন্দোলন প্রকট রূপ নেয়। রাজপথে নামে ছাত্র-ছাত্রীরা। সে সময়ে টঙ্গীতে যে আন্দোলন হয়েছিল সেই আন্দোলনে স্কুলপড়–য়া ছাত্র আহসান উল্লাহ রাজপথে নেমে পড়েন। অংশগ্রহণ করেন মিছিলে। তখন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। টঙ্গী হাইস্কুল থেকে আহসান উল্লাহ ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করে ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত তৎকালীন কায়েদে আজম কলেজে (বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ) একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন।

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবি নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা যখন রাজপথে, তখনও ভাওয়ালের এই সন্তান আহসান উল্লাহ রাজপথের একজন সাহসী সৈনিক। এই রাজনীতির লড়াকু সৈনিক হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে সখ্য গড়ে উঠতে থাকে। তিনি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতি চালিয়ে যেতে থাকেন। বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ৬ দফা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা মিলে আন্দোলন গতি লাভ করে। সে সময়কার উত্তাপ্ত টঙ্গীতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে যেসব সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় সেগুলো আয়োজনে যাদের নাম সর্বাগ্রে আসে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তরুণ ছাত্রনেতা আহসান উল্লাহ। সে সময়কার দিনে টঙ্গী, গাছা ও পূবাইল এলাকায় গণআন্দোলনে তিনি অভূতপূর্ব অবদান রাখেন। ১৯৬৮ সালে তথাকথিত আগরতলা মামলায় বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার চক্রান্ত করে। ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করার নিমিত্তে টঙ্গী-জয়দেবপুরের জন্য যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, সেই কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন লড়াকু ছাত্রনেতা আহসান উল্লাহ। তিনি কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সাথে ‘মুজিব তহবিল’ এর জন্য প্রতিটি কুপন ১০ পয়সা করে বিক্রয় করে অর্থ সংগ্রহ করেন। তিনি আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য সব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৬৮ সালের গণজোয়ারের সৃষ্টিতে অবদান রাখেন। ছাত্রনেতা আহসান উল্লাহ ১৯৬৯ সালে ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতে গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। প্রবল গণজোয়ার ও গণঅভ্যুত্থানে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি লাভ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকায় প্রদত্ত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে টঙ্গী থেকে বিপুলসংখ্যক ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সাথে আহসান উল্লাহ যোগদান করেন। দশ লাখ লোকের সেই জনসভায় বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হয়।

জনগণের রায় ছিল শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের পক্ষে সব সময়। এ কথা বলতে হবে সবাইকে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচনে যতবার প্রার্থী হয়েছেন আমাদের জনগণের নেতা শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার একটিবারের জন্যও হারেননি। জিতেছেন বিপুল ভোটে। জয় করে নিয়েছেন গণ-মানুষের হৃদয় ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। তিনি ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সালে পূবাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার উপজেলা পদ্ধতি বিলোপ করে দেয়। সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উপজেলা চেয়ারম্যানদের নিয়ে আহসান উল্লাহ মাস্টার দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলেন। এজন্য তিনি জেল-জুলুম এবং নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। উপজেলা বিলোপের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন। তারই বিজয় আজ দেশে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের বাস্তব ফল হিসেবে বিরাজ করছে। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়ন, পেশাগত ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধ করার দাবি নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন প্রতিনিয়ত। দেশে যখন ত্রাস ও গ্রাসের রাজনীতির বলয় তৈরি হয়েছে তখনই শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে দেখা গেছে টঙ্গীর রাজপথে এবং ঢাকার রাজপথে। তিনি ১৯৮৩ সাল, ১৯৮৪ সাল, ১৯৮৭ সাল, ১৯৮৮ সাল, ১৯৯০ সাল, ১৯৯৫ সাল, ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পটভূমিতে শ্রমজীবী নেতা হিসেবে যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তা গর্ব করার মতো।

২০০১ সালে শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি বস্ত্র শিল্পের মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমে মিলগুলো বেসরকারিকরণে যে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনে যার অক্লান্ত পরিশ্রম বাস্তবে কাজে লেগেছে, তিনি হচ্ছেন শ্রমিকদের পরীক্ষিত নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার। শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের প্রশ্নে কোনদিন আপস করেননি। শ্রমিক অসন্তোষ যেখানে দেখা দিয়েছে, সেখানেই নিজে ছুটে গিয়েছেন। শ্রমিক অসন্তোষের সময় খেয়াল রেখেছেন শ্রমিকরা কেউ অসন্তোষকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে নিজের ফায়দা হাসিল না করতে পারে। দর কষাকষির মাধ্যমে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন করার নিরন্তর চেষ্টাকে তাকে সফল নেতায় পরিণত করেছে। প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে বন্ধ ও রুগ্ন কলকারাখানা চালুর উদ্যোগ নেয়া, পাটসহ জাতীয় শিল্প রক্ষা ও কৃষকদের স্বার্থে কাঁচা পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাসহ শ্রমিক-কৃষকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেছেন ভাওয়ালের এই কৃতীসন্তান শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার। তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করা, নারী শ্রমিক স্বার্থ সংবলিত দাবি বাস্তবায়ন ও বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মজুরি ও বেতন-ভাতা নির্ধারণ করার জন্য দেশের নীতিনির্ধারণী মহলের সচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গত শতকের আশির দশকে গঠিত শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার জন্য শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। তিনি আইএলও কনভেনশন ’৮৭ ও ’৯৮ এর ভিত্তিতে শ্রম আইন সংশোধনের দাবি করেছেন।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার যেমন ছিলেন শিক্ষক আবার ছিলেন শিক্ষকদের নেতা। শিক্ষকদের পেশাগত দাবির সমর্থনে রাজপথে ছিলেন তিনি। টঙ্গী-গাজীপুরে বেসরকারি অনেক শিক্ষকের মান্থলি পে অর্ডার (এমপিও) ভুক্ত করার ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। শুধু মানুষের ভালোবাসা ছিল শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের সঞ্চয়। আবার ছিল না বৈভব-বিত্ত। এমনি অবস্থায় রুখে দাঁড়িয়েছেন সমাজের যত অন্যায়-অবিচারের বিপক্ষে তিনি সর্বদা। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপস করেননি যে ব্যক্তিটি, যিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একজন মানুষ ও রাজনীতিবিদ। সেই ব্যক্তি প্রাণ হারালেন ঘাতকচক্রের হাতে। সেবার দ্বারা ও মহৎ কর্মের মাধ্যমে আলোর প্রদীপ হাতে নিয়ে যে মানুষটি অবদান রেখেছিলেন সংগ্রাম-আন্দোলনে, সে মানুষটি আজ চিরনিদ্রায় শায়িত। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার প্রমাণ করেছেন মানুষকে ভালোবাসলে, তাদের জন্য কাজ করলে ও জীবন উৎসর্গ করলেÑ মানুষ ভালোবাসায় তার প্রতিদান দেয়।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে মানুষ ভক্তি করত, তিনিও মানুষকে ভক্তি করতেন। এ জন্যই শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার ছিলেন দশের মধ্যে একক। স্বাতন্ত্র্যে ও বৈশিষ্ট্যে আর দশজন থেকে তাকে পৃথক করা যায় এবং তিনি দীপ্যমান হয়ে উঠেন জ্যোতির্ময় সূর্যের মতো। সবার প্রিয় শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার ছিলেন সর্বস্তরের মানুষের গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনগণমন অধিনায়ক। দেশ ও মানুষের জন্য তিনি কাজ করেছেন এবং জীবন উৎসর্গ করেছেন। শহীদ আহসান উল্লাহমাস্টার বহুমুখী প্রতিভা ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। এ রকম ব্যক্তিকে বাংলার মাটিতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ২০০৪ সালের ৭ মে, শুক্রবার। দেশ জাতি হারায় জনগণমন নন্দিত অধিনায়ককে, যিনি ছিলেন সহস্র তরুণের আদর্শ, যিনি ছিলেন জনকল্যাণমুখী চিন্তাধারার একজন রাজনীতিবিদ ও একজন মানুষ গড়ার কারিগর। বীর মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্লাহ মাস্টার একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় মরেননি; যুদ্ধ করেন দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধেÑ সেই পাকিস্তানি বাহিনী তাকে হত্যা করতে পারেনি। তাকে হত্যা করে স্বাধীন এ দেশের মাটিতে ঘাতকচক্র।

সমাজকে বড় করে দেখতে হলে মানুষকে বড় করে দেখতে হবে আর সেই মানুষই বড় সম্মান করে আহসান উল্লাহকে তার নামের সাথে একটি বিশেষণ জুড়ে দিয়েছিল ‘মাস্টার’। এমনকি এখন তা তার নামের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘আহসান উল্লাহ মাস্টার।’ তার পেশাপরিচয় ও শিক্ষকতার আদর্শই তার সমগ্র জীবনাচরণের অঙ্কুর ও শেকড়কে ধারণ করেছিল। তার সকল মানবিক গুণ, ধ্যান-পবিত্রতা, কর্তব্য-পরায়ণতা, দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা, সাহসিকতা ও ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর সমুদয় সত্যনিষ্ঠায় যর্থাথই হয়ে উঠেছিল তার পরিচয় এবং সম্মানসূচক বিশেষণ। আজন্ম শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার লোভ ও লালসার ঊর্ধ্বে থেকে গণমানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। মেহনতি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। তার সংগ্রামী মনন ও আন্তরিক কর্মনিষ্ঠা ইতিহাসের উজ্জ্বলতায় বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জীবন সংগ্রামে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তিনি বেঁচে থাকবেন তার কর্মে ও আদর্শে সমুজ্জ্বল হয়ে। আর সে কারণেই দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করি, তিনি ছিলেন একজন সংগ্রামী মানুষ, এ ধারাই তিনি হয়েছেন খেটে খাওয়া মানুষের অনিবার্য নেতা। আজকের জন্মদিনে সেই নন্দিত সংগ্রামী মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

[লেখক : কলেজ শিক্ষক এবং আর্কাইভস ৭১-এর প্রতিষ্ঠাতা]