menu

পবিত্র ঈদুল আজহা

  • ঢাকা , শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২০

আগামীকাল পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলিম বিশ্ব এবার এক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহা পালন করছে। বৈশ্বিক মহামারী নভেল করোনাভাইরাসের কারণে এ বছর মক্কায় হজব্রত পালিত হচ্ছে সীমিত আকারে। বাংলাদেশের মানুষেক নভেল করোনাভাইরাসের পাশাপাশি বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই অবস্থায় ঈদুল আজহা এসেছে ত্যাগের মহিমা নিয়ে।

ঈদুল আজহার দিনটি ইসলামের ইতিহাসে ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। পবিত্র ঈদুল আজহা পালন করা হয় আল্লাহর রাহে প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করে। এই উৎসর্গ করার আনুষ্ঠানিক দিকটি হলো কোরবানি। কোরবানির মধ্য দিয়ে আল্লাহর বান্দা তার নৈকট্য লাভের দিকে অগ্রসর হয়।

হযরত ইব্রাহিমের (আ.) খোদাভক্তি পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাকে সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি উৎসর্গ করতে আদেশ দিলেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) তখন প্রিয়পুত্র হযরত ইসমাইলকে (আ.) আল্লাহর নামে কোরবানি দিতে উদ্যত হলেন। আল্লাহ রাহমানুর রাহিমের অশেষ দয়ায় হযরত ইব্রাহিম (আ.) দেখলেন তার পুত্র সুস্থ আছে। সেখানে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে পড়ে আছে। এই প্রতীকী কাহিনীর গভীর তাৎপর্য রয়েছে। মানুষ একদিকে ত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বার্থ বিসর্জন দিবে, অন্যদিকে মানুষের মনে যে কুপ্রবৃত্তিগুলো আছে তা বিদূরিত করবে।

আল্লাহর উদ্দেশে কোরবানি দেয়ার বিধি খুবই প্রাচীন। সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ লাভ, নশ্বর জীবনের ধনসম্পদ মহত্তর উদ্দেশ্যে ত্যাগ করার মানসিকতা অর্জন ও খোদাভীতি যাতে মানুষকে পাপ থেকে নিবৃত্ত রাখে এজন্য প্রচলিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির প্রথা।

যারা ধনগর্বে স্ফীত হয়ে আপন ধনরতœ বৈভব জাহির করার জন্য কোরবানির প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়, খোদাতায়ালা তার কোরবানি গ্রহণ করেন না। তাতে ত্যাগের মহিমা ক্ষুণœ হয়। হযরত ইব্রাহিম (আ.) যখন আপন প্রিয় পুত্রকে আল্লাহর নামে কোরবানি দিতে উদ্যত হলেন, তখন তিনি তার এই অতুলনীয় ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপনের মুহূর্তে দুঃখ বা কষ্ট অনুভব করেননি। এই দৃষ্টান্ত থেকে এই শিক্ষাই আল্লাহতায়ালা জগদ্বাসীকে দিতে চেয়েছেন, যে ত্যাগে আনন্দ নেই, যেখানে আপন কিছু ত্যাগে মনে কষ্ট বা দুঃখ উৎপন্ন হয় তা ত্যাগ নয়। ত্যাগের অর্থ হলো অন্যের কল্যাণ সাধন। অন্যের দুঃখ-কষ্টে অভিভূত হয়ে যিনি তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসে নিজের কিছু সুখ, কিছু স্বার্থ বিসর্জন দেন এবং উপকৃত ব্যক্তির দুঃখ মোচনের জন্য মনে নির্মল আনন্দ অনুভব করেন তিনিই প্রকৃত অর্থে ত্যাগী।

কোরবানির পশুর মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দীন-দরিদ্রের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ার যে নিয়ম রয়েছে, তার মধ্যে ত্যাগের দিকটি দেখতে পাওয়া যায়। ‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এবং এ ধরনের কাজের মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান সম্ভব- পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানি সেই শিক্ষাই দিয়ে থাকে।

‘কোরবানি দেয়া পশুর রক্ত, মাংস, অস্থি কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। তোমাদের তাকওয়া (খোদাভীতি) তার কাছে পৌঁছায়।’ পবিত্র কোরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালার এই সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। তাই ধনগর্ব ও মিথ্যা অহঙ্কার ত্যাগ করে নম্রচিত্তে আল্লাহর নামে কোরবানি যা দেয়া হয়, তাই আফজল অর্থাৎ উৎকৃষ্ট। বর্তমানে আমাদের সমাজে আত্মস্বার্থ উদ্ধারের জন্য অপরিমিত লোভকে তৃপ্ত করার উদ্দেশ্যে হিংসা, হানাহানি ও রক্তপাতের ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে, সেখানে একমাত্র মানুষের মনের পশুবৃত্তিকে কোরবানি দিয়েই আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও মানুষের মঙ্গল সাধন সম্ভব। কোরবানি শব্দের অর্থ উৎসর্গ ও নৈকট্য দুই-ই। পশু কোরবানির এই প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করলে তবেই কোরবানির সার্থকতা। ধর্মানুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ত্যাগের মহিমা সর্বোচ্চ- পবিত্র ঈদুল আজহা এটাই শিক্ষা দেয়।

সমগ্র মুসলিম জাহান পবিত্র ঈদুল আজহা পালনের মধ্য দিয়ে ত্যাগ ও ভালোবাসার দৃষ্টান্ত মানব সমাজের কাছে তুলে ধরছে। বছর বছর এই পবিত্র দিনটি ঘুরে ঘুরে এসে আমাদের কাছে এই শিক্ষা বহন করে যে, অন্তরের পশুপ্রবৃত্তি বিসর্জন না দিয়ে কখনই মানব সমাজ কল্যাণের পথে, মঙ্গলের পথে অগ্রসর হতে পারে না। কোরবানি তাই নিছক পশু হত্যা নয়, কবির ভাষায়, ‘সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন’।