menu

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে ঋণখেলাপিদের কাছে হস্তান্তর করা হোক

  • ঢাকা , বুধবার, ১৫ মে ২০১৯

ঋণখেলাপিদের গণহারে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ করে দেয়ার উদ্যোগ চলছে। ছোট, মাঝারি বা বড় সব ঋণখেলাপিই পুনঃতফসিলের সুযোগ পাবে। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীনতার পর থেকে যারা ঋণখেলাপি এবং টাকা পরিশোধ করেনি তারাও পুনঃ তফসিলের সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, পুরো বিষয়টি তদারক করবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে গত সপ্তাহে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে সার্কুলার জারির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে চিঠি পাঠানো হয়েছে তাতে এসব উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। চিঠিতে ঋণখেলাপিদের একগুচ্ছ সুবিধা দেয়ার কথা বলেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সার্কুলার মোতাবেক, ঋণখেলাপিদের ওপর অনারোপিত সুদ সম্পূর্ণ মাফ করে দেয়া হবে। আবার আরোপিত সুদের ক্ষেত্রেও খেলাপিরা বিশেষ ছাড় পাবে। খেলাপি ঋণের ওপর আরোপিত সুদের স্থগিত অংশ (সাসপেন্ডেড) মাফ পাবে খেলাপিরা। খেলাপিদের ঋণের সুদ হার গণনা হবে ৯ শতাংশ সরল সুদে। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিলেই ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করতে পারবে খেলাপিরা। ঋণ পরিশোধে এক বছর গ্রস পিরিয়ডসহ ১৩ বছর সময় পাবে তারা। এ এক বছরে কোন ঋণ পরিশোধ করতে হবে না। ছোট, মাঝারি ও বড় ঋণ খেলাপির ধরন যা-ই থাকুক না কেন সবাই এসব সুবিধা নিতে পারবে। স্বাধীনতার পর থেকে যারা ঋণখেলাপি তারাও এ সুবিধার আওতায় আসবে।

দেশে ঋণখেলাপিদের পুরস্কৃত করার যে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চালু হয়েছে তা দেখে কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে এটা বোঝা একেবারেই অসম্ভব যে, ঋণ খেলাপ করা একটা অমার্জনীয় অপরাধ। বরং এটাই মনে করা স্বাভাবিক যে, ঋণ খেলাপ করা একটা পুণ্যের কাজ; ব্যাংক থেকে টাকা তুলে তা না দিলে রাষ্ট্রের ‘মহাকল্যাণ’ সাধিত হয়, রাষ্ট্রযন্ত্র তাতে উপকৃত হয়। এ কারণেই রাষ্ট্র ও ঋণখেলাপিদের গণহারে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সব ঋণ গ্রহীতাকেই ঋণখেলাপি হওয়ার মহৎ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে ও করছে।

দেশের সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখেন নিরাপত্তার স্বার্থে, ব্যাংক তাদের টাকার রক্ষণাবেক্ষণ করবে, এ ভেবে। অথচ সেই ব্যাংক থেকে যাকে তাকে ইচ্ছামতো ঋণ দেয়া হচ্ছে, যারা লোন নিচ্ছে তাদের ঠিকানাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি হচ্ছে, জনগণের টাকা আত্মসাৎ করে ঋণখেলাপিরা বিদেশে টাকার পাহাড় বানাচ্ছে আর রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে- নিয়মিত ঋণ শোধকারীরা চড়া সুদ দেবে কিন্তু খেলাপিদের সুদ দিতে হবে না। অর্থাৎ প্রকারান্তরে বলা হচ্ছে, ঋণখেলাপিদের সব দোষ মাপ, তারা যা করেছে সেটা বৈধ। আর নিয়মিত ঋণ শোধ যারা করছেন তারাই আসলে দোষী, তারা নিয়িমিত ঋণ শোধ করছেন কেন!

দেশে চোরকে সাধু বানানোর নিয়ম চালু হলো! এ অনাচারকে কেন বা কার স্বার্থে বৈধতা দেয়া হচ্ছে? কেন দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাটের সাজা হচ্ছে না? এভাবে ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থাকে সংকটে পরিণত করা হচ্ছে। ফলে এ খাতের দুর্নীতি আরও বাড়ছে। মূলধন ঘাটতিতে পড়ছে ব্যাংকিং খাত। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে মানুষের অনাস্থা।

ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যাটা হচ্ছে সুশাসনের অভাব। সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকেই এটা মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে। উল্লিখিত সার্কুলারের পর ব্যাংক খাতের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণও আর থাকল না। সরকারি ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশনের কর্তৃত্ব চলছে। অথচ দুনিয়ার কোথাও ‘ব্যাংকিং ডিভিশন’ নামের কোন দানব নেই। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজ ব্যাংক মালিকদের হাতেই ব্যাংক পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে অর্পণ করা হয়েছে। পরিচালন পরিষদকে করা হয়েছে ঠুঁটো জগন্নাথ। খেলাপি ঋণে মহা ছাড় দেয়ার জন্য বারবার সার্কুলার দিয়ে নিয়ম বিধি পরিবর্তনের ঝামেলা না করে বরং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বিশেষ বিশেষ দুর্নীতিবাজদের সব ঋণ মওকুফ করে দেয়াই ভালো। অথবা ব্যাংকগুলো পছন্দের ঋণখেলাপিদের নামে লিখে দিলেই হবে স্বস্তিকর। এভাবে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ কেড়ে নিয়ে বিদেশে বেগমপাড়া বানানোর সুযোগ করে দেয়া হলে হয়তো এটাকেই রাষ্ট্রীয় নীতি মনে করে সবাই গ্রহণ করবে কিংবা অদৃষ্টের পরিহাস হিসেবে মেনে নেয়ার চেষ্টা করবে।

এ অনাচারকে বৈধতা দেয়া হলে ঋণ সংস্কৃতি ভেঙে পড়বে। ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর ব্যাংকিং খাতের সংস্কৃতি নষ্ট হলে মানুষের যাওয়ার আর জায়গা থাকবে না। সংকট থেকে ব্যাংকিং খাতকে বের করে আনতে প্রয়োজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ব্যাংকিং ডিভিশন তুলে দেয়া, যোগ্য লোকদের দায়িত্ব দেয়া, ব্যাংকিং কমিশন গঠন ও ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা। এ কথাগুলো আমরা বারবার বলে আসছি। এটা না করে যদি চোরদের ক্রমাগতভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হয় তবে দেশে অনিয়ম-নৈরাজ্য ঠেকানো যাবে না। দেশ দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।