menu

খেলাপি ঋণের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯

কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না ঋণখেলাপিদের। সরকারি-বেসরকারি কিংবা বিদেশি সব খাতের ব্যাংক থেকেই তাদের নেয়া ঋণের খেলাপি হওয়ার পরিমাণ তীব্র গতিতে বাড়ছে। তবে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি ঋণের আধিক্য বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১১.৮৭ শতাংশ।

২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা বা মোট বিতরণের ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। ফলে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ-এই তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা বা ১৮ শতাংশ। এর বাইরে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবলোপনের মাধ্যমে ব্যাংকের হিসাবের খাতা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে নিট ৪০ হাজার ১০১ কোটি টাকা। এ ঋণ যোগ করলে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৫০ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম, ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের অভাব এবং সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা শিথিল হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটি দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য, সর্বোপরি অর্থনীতিকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। প্রভাবশালী গ্রাহকরা পরিণত হচ্ছেন ঋণখেলাপিতে। এরা আবার অনেকেই ব্যাংকের মালিক। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ দেয়া হচ্ছে, কিন্তু কোন সিকিউরিটি মানি নেই। যারা লোণ নিচ্ছে তাদের ঠিকানাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ঊর্ধ্বতনদের দুর্নীতি। একের পর এক ব্যাংকের নাম আসছে এ তালিকায়। খেলাপি ঋণকে তফসিলি সুবিধা দিয়ে অবলোপনের তালিকায় ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। এভাবে ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থাকে দৃশ্যত সহনশীল কিন্তু বাস্তবে চাপা দিয়ে রাখা হচ্ছে। ফলে এ খাতের দুর্নীতি আরও বাড়ছে। মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে বেশকিছু ব্যাংক।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো- ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা না নেয়া। এছাড়া যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রদেয় নতুন ঋণ ও খেলাপির পাল্লা ভারি করছে। প্রশ্ন হলোÑ কেন তাদের ঋণ আদায় করা যায় না? কেন তাদের ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ নিলামে ওঠে না? মানুষ আরও অবাক হয়, যখন দেখা যায় এই ঋণখেলাপিদের আরও সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় কিংবা তাদের সুদ মওকুফ করে দেয়া হয়।

ব্যাংকিং খাতে বিরাজমান এ অরাজকতা বন্ধ করতে হবে। সংকট নিরসনে প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ব্যাংকিং ডিভিশন তুলে দেয়া, যোগ্য লোকদের দায়িত্ব দেয়া, ব্যাংকিং কমিশন গঠন ও ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা। যারা ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি করে ব্যাংকিং খাতকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে নিয়ে গেছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ঋণখেলাপিদেরও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ঋণখেলাপিরা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক সময় ব্যাংকাররা কঠিন পদক্ষেপ নিতে পারে না। এক্ষেত্রে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে এবং এদের বিরুদ্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। ঋণ নিয়ে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ফেরত দেয় না তাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। ঋণখেলাপিদের কালো তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে তারা নতুন করে ঋণ গ্রহণ, জমি ক্রয়, সম্পদ অধিগ্রহণ করে সমাজে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে না পারে। খেলাপি ঋণ হ্রাস করতে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের অনুমোদন নয় বরং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক বিষয় বিবেচনা করা উচিত। তাছাড়া, খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থার কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।