menu

ভুয়া এনআইডিতে ব্যাংক ঋণ

৯২৭ জনকে খুঁজছে গোয়েন্দা পুলিশ

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০

ভুয়া জাতীয় পরিচপত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে একটি চক্র। এমন ৯২৭ জনকে খুঁজছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবি পুলিশ জানায়, প্রতারণার আশ্রয় নেয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিল্টন নামে এক ব্যক্তি সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক থেকে ৩ ধাপে হাতিয়ে নিয়েছেন ১০ কোটি টাকা। ইয়াছির নামে এক ব্যক্তি সিটি ব্যাংকের প্রগতি সরণি শাখা থেকে ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। সালেহ আহমেদ নামে এক ব্যক্তি ইউসিবি থেকে ১৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে।

আবদুল মজিদ নামে এক ব্যক্তি এনআরবি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। জাভেদ নামে এক ব্যক্তি লংকা-বাংলার ধানমন্ডি শাখা থেকে ১৫ লাখ টাকা ও জহুরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি মেঘনা ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। এছাড়াও বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ীর নাম ওঠে এসেছে। তাদের নজরদারিতে রেখে তদন্ত অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, ভুয়া এনআইডির মাধ্যমে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক ও লংকা-বাংলা থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে অর্ধশত কোটি টাকা। এই পন্থায় সবচেয়ে বেশি ঋণ নেয়া হয়েছে সিটি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে।

সর্বশেষ ভুয়া এনআইডির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১২ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুরের চিড়িয়াখানা রোড এলাকার ডি ব্লক থেকে নির্বাচন কমিশনের ২ ডাটা এন্ট্রি অপারেটরসহ প্রতারক চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করে ডিবি। গ্রেফতারকৃতরা হলো নির্বাচন কমিশনের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সিদ্ধার্থ শংকর সূত্রধর (৩২) ও আনোয়ারুল ইসলাম (২৬), দুই দালাল সুমন পারভেজ ও মজিদ। এছাড়া আবদুল্লাহ আল মামুন নামে এক ব্যক্তি নিজের নামে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে ব্যাংক ঋণ নিয়ে স্ত্রীর নামে আরেকটি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র করতে গিয়ে হাতেনাতে গ্রেফতার হয়।

গোয়েন্দা পুলিশ লালবাগ জোনের ডিসি রাজিব আল মাসুদ বলেন, সুমন পারভেজ ও মজিদ মূলত ব্যাংকের দালাল। ভুয়া এনআইডি তৈরি করে ব্যাংক ঋণ পাইয়ে দেয়ার শর্তে একেক জনের কাছ থেকে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা নিত। তাছাড়া ব্যাংক ঋণ হাতে পাওয়ার পর তাদের দিতে হতো মোট টাকার ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। তারা জানিয়েছে, মো. মিল্টন নামের এক ব্যক্তি একটি ব্যাংক থেকে ৩ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। এ রকম ৩৫ থেকে ৪০ জন জাল এনআইডি দিয়ে ঋণ উত্তোলন করেছেন। তিনি বলেন, সুমন পারভেজ ৭-৮ বছর আগে একটি ভেরিফিকেশন ফার্মে কাজ করত। ওই প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিল কেউ ঋণ পাওয়ার যোগ্য কিনা, তা যাচাই-বাছাই করা। প্রায় আড়াই বছর আগে চক্রের অপর সদস্য আবদুল মজিদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে চাকরি ছেড়ে দু’জনে একসঙ্গে এ প্রতারণার কাজে নামে। কারও ঋণ প্রয়োজন হলে তারা ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সিদ্ধার্থ ও আনোয়ারুলের সঙ্গে যোগাযোগ করত। এ দুইজন জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে দিত। একটি জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার পরও আরেকটি জাতীয় পরিচয়পত্র কী করে তৈরি করা যায়, এমন প্রশ্নের উত্তরে গ্রেফতারকৃতদের বরাত দিয়ে ডিসি বলেন, অপারেটররা এজন্য একটি কৌশল অবলম্বন করে। যারা দ্বিতীয় পরিচয়পত্র করেন, তারা ভুয়া জন্মসনদ, নাগরিকত্বের সনদ ও বিদ্যুৎ বিল ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের হাতে পৌঁছে দিতেন। তারা অফলাইনে সব তথ্য, আঙুলের ছাপ নিয়ে পরিচয়পত্র অনুমোদনের জন্য পাঠিয়ে দিত। অনুমোদন হতে সময় লাগত সর্বোচ্চ ১৫-২০ মিনিট। তারপরই নতুন আরেকটি জাতীয় পরিচয়পত্র চক্রটি ঋণ নিতে ইচ্ছুক এমন লোকজনের হাতে তুলে দিত। যে ব্যক্তির নামে নতুন জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হলো, তার নামে আগে কোন পরিচয়পত্র আছে কিনা, তা যাচাই-বাছাই হতে মাস দুয়েক সময় লেগে যায়।

ব্যাংকও টের পায় ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়। তারা নতুন জাতীয় পরিচয়পত্রের সূত্র ধরে খোঁজখবর করে আর নতুন করে ঋণ নেয়া ব্যক্তিকে খুঁজে পায় না। নির্বাচন কমিশন অফিসের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সিদ্ধার্থ ২০০৭ সাল থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজ করে আসছিল। জিজ্ঞাসাবাদে সে গোয়েন্দা পুলিশকে বলেছে, গত বছর থেকে এ চক্রে জড়িয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছে, দ্বৈত জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সে একবার ব্র্যাক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও সিটি ব্যাংক থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা তুলেছিল। এরপর স্ত্রী রোজিনা রহমানের নামেও আরেকটি জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজ করাচ্ছিল।

গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, বিশেষ করে ঋণখেলাপিরাই এ চক্রের আশ্রয় নিতেন। ফলে জালিয়াতির মাধ্যমে একই ব্যক্তির দুটি ভিন্ন এনআইডি নম্বর তৈরি হওয়ায় ঋণ আবেদনে খেলাপি গ্রাহকদের তথ্য ব্যাংকের কাছে ধরা পড়ত না। এনআইডি তৈরির চুক্তির টাকার মধ্যে ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা করে নিত সিদ্ধার্থ ও আনোয়ারুল। তারা এ পর্যন্ত ৪০ থেকে ৫০টি দ্বৈত জাল জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পেরেছে ডিবি।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে ব্যাংক লোন নেয়া, জমি কেনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে স্বনামধন্য ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। ইতিমধ্যে এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনকে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক কর্মকর্তা জানায়, ইসি থেকে জানানো হয়েছে সারাদেশে ২ লাখ ৭ হাজারেরও বেশি ভুয়া এনআইডি রয়েছে। ইসির কর্মচারীদের জোগশাজসে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এ কাজটি করেছে। সম্প্রতি ইসির ২ কর্মচারীসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা লোন নেয়ার তথ্য ওঠে আসে। পরে তাদের দেয়া তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে চিঠি দেয়া হয়। ব্যাংকের দেয়া তথ্যেও ওঠে এসেছে প্রতারণার সত্যতা। মূলতো ঋণখিলাপি হওয়ায় আবারও ঋণ পেতে এ ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। শুধু ব্যবসায়ী নয়, ভুয়া এনআইডি বানিয়ে বিভিন্নভাবে প্রতারণার সঙ্গে জড়িয়েছেন দ্বৈত এনআইডি থাকা ৯২৭ জনের অনেকেই। তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতিও চলছে। এ বিষয়ে ডিবির লালবাগ বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মধুসূদন দাস বলেন, ভুয়া এনআইডির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত যারই নাম আসুক, তাকে গ্রেফতার করা হবে।