menu

হেরিসন ডগলাসের গিফট বক্স প্রতারণা

    সংবাদ :
  • বাকিবিল্লাহ
  • ঢাকা , বুধবার, ০৯ অক্টোবর ২০১৯

আন্তর্জাতিক প্রতারক হেরিসন ডগলাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বন্ধুত্ব করে প্রতারণা করছে। এ চক্রে নাইজেরিয়ান ও আফ্রিকান নাগরিকসহ দেশি প্রতারক চক্রও রয়েছে। তারা পরস্পর যোগসাজশে ফেসবুকে বন্ধুত্ব, পরে মেসেঞ্জার, হোয়াটর্সঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথমে বন্ধুত্বসুলভ কথাবার্তার মাধ্যমে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। এরপর গিফট বক্স পাঠানোর নামে প্রতারণা করে টাকাপয়সা হাতিয়ে নেয়। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এ নিয়ে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বিদেশি এ প্রতারকচক্রের লোভে পড়ে বাংলাদেশের একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ তাদের সহযোগিতা করে। বিনিময়ে তাদের প্রতারণার ভাগ দেয়া হয়। বাংলাদেশি প্রতারকচক্রের সহযোগিতা নিয়ে বিদেশি এ চক্র ইতোমধ্যে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতরণাকে তারা ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে। এসব প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন নারীসহ সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক, সংস্কৃতি অঙ্গনের ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। গার্মেন্টস ব্যবসায়ী, পর্যটকসহ নানা পরিচয়ে এসব প্রতারকচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। একজন নাইজেরিয়ান নাগরিকসহ চক্রের ৫ সদস্যকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করেছে। তারা গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। ডিবি কর্মকতারা বলেন, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়াও বিভিন্ন পরিচয়ে বাংলাদেশে এসে প্রতারণা করছে। নাইজেরিয়ান, আফ্রিকানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা বাংলাদেশি চক্রের সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন মানুষকে প্রলোভনে ফেলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব চক্রের প্রধান টার্গেট থাকে নারী। তারা সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে বন্ধুত্বের পর বিভিন্ন উপঢৌকন (গিফট) পাঠানোর নামে প্রতারণা করে। এ ধরনের ঘটনায় একাধিক চক্র গ্রেফতার হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর জামিনে বের হয়ে ফের প্রতারণা করে। এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে বার বার সচেতন করা হলেও লোভে পড়ে অনেকেই প্রতারিত হয়। অনেকে প্রতারণার শিকার হলেও মামলা করে না।

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় প্রতারণার শিকার একজন স্কুল শিক্ষিকা একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-১৩)। ওই মামলায় তিনি অভিযোগ করে বলেন, চলতি বছরের গত ১৪ আগস্ট হেরিসন ডগলাস নামের এক ব্যক্তি ফেসবুক আইডি থেকে তাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়। সেখানে হেরিসন ডগলাস নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিচয় দেয়। ওই নারী শিক্ষক তার পরিচয় জানার পর তাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ম্যাসেজে আলাপ আলোচনা চলে। এক পর্যায়ে দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক বেশ জমে ওঠে। হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেঞ্জারেও নিয়মিত আলাপ চলে। এভাবে আলাপ আলোচনায় দু’জনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর লম্পট বিদেশি নাগরিক হেরিসন ডগলাস ওই শিক্ষিকার ঠিকানায় কিছু গিফট উপহার পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। এর কিছুদিন পরই ওই শিক্ষিকার কাছে ডেল্টা নামে একটি কুরিয়ার সার্ভিস থেকে ফোন আসে। তাকে জানানো হয় তার নামে একটি পার্সেল এসেছে। এ পার্সেলে অনেক দামি জিনিসপত্র রয়েছে। এজন্য তাকে কাস্টমস ক্লিয়ারিং করতে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। তখন ওই নারী তার কথিত বন্ধু হেরিসন ডগলাসকে বিয়ষটি জানালে ডগলাস বলে আমি ভুলে কাস্টমস ক্লিয়ারিংয়ের কাজ শেষ করতে পারিনি। ঠিক আছে তুমি কাস্টম ক্লিয়ারিং করে পার্সেলটা নিয়ে নাও। পরবর্তীতে তোমার জন্য আমার পক্ষ থেকে আরও দামি উপহার পাঠানো হবে। ওই শিক্ষিকা কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীর কথামতো কোন চিন্তা না করে বন্ধু ডগলাস হেসিনের কথামতো ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একটি একাউন্টে ৫০ হাজার টাকা জমা দেয়। কিন্তু এর পর আবার ফোন করে বলা হয় ম্যাডাম আপনার পার্সেলে কয়েক লাখ টাকার স্বর্ণলঙ্কার পাওয়া গেছে। এখন একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। ১ লাখ টাকা না দিলে মানিলন্ডারিং মামলা হয়ে যাবে। কি করবে বুঝতে না পেরে ওই নারী একই একাউন্টে আবার লোভে পড়ে এক লাখ টাকা পরিশোধ করে মামলা থেকে বাঁচার জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু পার্সেল আর পাওয়া যায়নি। পরে তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেন যে তিনি ভয়াবহ প্রতারণার খপ্পরে পড়েছেন। পার্সেল আর পাচ্ছেন না। এরপর বিদেশি বন্ধু ডগলাসকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এভাবে বহু নারী ফেসবুকে বিশ্বস্ত বন্ধু ভেবে প্রতারিক হয়ে সবকিছুই হারাচ্ছেন।

অন্যদিকে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় অলক আলী হোসেন শহিদী নামের এক ব্যক্তি আরেকটি মামলা করেন (মামলা নং-১২)। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, মিস্টার ওয়াগন নামের এক ব্যক্তি একটি ফেসবুক আইডি থেকে তাকে ফ্রেন্ডস রিকুয়েস্ট পাঠায়। পরে তাকে প্রস্তাব দেয়া হয় রোহিঙ্গাদের ওপর একটি ডকুমেন্টারি (তথ্যচিত্র) তৈরি করা হবে। এজন্য তাকে সহযোগিতা করলে তিনি লাভবান হবেন। এরপর প্রযোজক শাহিদী এ কাজে সহযোগিতা করতে পারবেন বলে জানান। পরে তাকে একাটি দামি ক্যামেরা কিনতে বলা হয়। ওই ক্যামেরা তার কাছে নেই বলে জানানো হয়। ওই ব্যক্তি কামরার ব্যবস্থা করবে। পরে আবার ফোন করে বলে, আপনার চাহিদা অনুযায়ী একটি ক্যামরা ক্রয় করা হয়েছে। যার মূল্য ৫ লাখ টাকা। এরপর তাকে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ১১ নম্বর সেক্টরের গরীবে নেওয়াজ এভিনিউ রোডে তাদের একটি অফিস আছে বলে জানানো হয়। সেখানে মহসিন নামে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। যোগাযোগের পর তাকে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫০ টাকা দিতে বলে। পরে অবশিষ্ট ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করে ক্যামরা বুঝে নেয়ার কথা বলা হয়। কোন উপায় না দেখে তিনি গত ৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে টাকা শোধ করে ক্যামরার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। টাকা দেয়ার পর আর যোগাযোগ করেও তাদের হদিস পাওয়া যায়নি। শহিদী অবশেষে বুঝতে পারেন তিনি প্রতারিত হয়েছেন। এ নিয়ে তিনি অভিযুক্ত প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করেন।

গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, মামলা দায়ের করার পর ডিবির টিম অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত ওকেচুকু জোসেফ নামের নাইজেরিয়ান প্রতারককে গ্রেফতার করে। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতারক চক্রের বাংলাদেশি গ্রুপের মূল হোতা মো. সাইফুর রহমান তালুকদার, মো. ইমরান হোসেন, বাদশা মিয়া এবং মো. আলমগীরসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে।

জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করে, হেরিসন ডগলাস এবং মিস্টার ওয়াগন মূলত কাল্পনিক চরিত্র। ওই নাম ছাড়াও একাধিক নামে একাধিক ফেক আইডি খুলেছে নাইজেরিয়ান এক নাগরিক। যে মূলত ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ আশেপাশের দেশে বসে এসব ফেক আইডি পরিচালনা করে। তার প্রধান সহযোগী বাংলাদেশি সাইফুর রহমান তালুকদার। নাইজেরিয়ান নাগরিক ওকেচুকু জোসেফ অ্যাপসটু ফেক আইডি পরিচালনাকারী তার পক্ষ হয়ে সাইফুরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সাইফুরের কাজ হলো পার্সেল এসেছে জানিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী, কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয়ে টার্গেট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। ওকেচুকু জোসেফ প্রতারণার অর্থ রিসিভ করে। বাদশা মিয়া ব্যাংকের একাউন্টধারী। মূলত তার নামে একাধিক ব্যাংক একাউন্ট রয়েছে। সে একাউন্টধারী হলেও ওইসব একাউন্টে লেনদেনের সবকিছু প্রধান হোতা সাইফুর রহমান তালকুদার।

মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ডিবি প্রতারক চক্রের ১২টি ব্যাংক একাউন্টের অস্তিত্ব পেয়েছে। এগুলোর অধিকাংশই ডাচ বাংলা ব্যাংকে করা। বাদশা মিয়া একজন সামান্য কৃষক। তার ভোটার আইডি ও ছবি দিয়ে একাউন্ট করা হয়েছে। তার একাউন্টে প্রতারণা করে যেসব টাকা নেয়া হয় সেই টাকা জমা করা হয়। পরে সেগুলো এটিএম কার্ড দিয়ে প্রতারক চক্র তুলে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে।

তদন্ত করে জানা গেছে, নাইজেরিয়ান নাগরিক ওকেচুক জোসেফ পাসপোর্ট ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে রয়েছে। এ চক্রে ৪ থেকে ৫ জন নাইজেরিয়ান এবং আরও ৭ থেকে ৮টি বাংলাদেশি গ্রুপের নাম পাওয়া গেছে। নাইজেরিয়ানরা মিঠুর মতো একাধিক বাংলাদেশিকে এসব কাজে ব্যবহার করে।