menu

সমুদ্রসম্পদ আহরণে দরিদ্রবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের দাবি

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮

দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বঙ্গোপসাগরের সম্পদ আহরণের জন্য দরিদ্রবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন অধিকারভিত্তিক নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির উন্নয়ন ও বিকাশে অতি দ্রুত স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বঙ্গোপসাগরকে নিয়ে সরকার যে মাছ ধরার কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে, তাতে সাধারণ মৎস্যজীবীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয় তার সুপারিশ করেছেন।

গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে কোস্টাল অ্যাসোসিয়শেন ফর সোসাল ট্রান্সফরমেশন ট্রাস্টের (কোস্ট ট্রাস্ট) উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতি : প্রেক্ষাপট, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এই সুপারিশ করেন। অনুষ্ঠানে পিকেএসএফ-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. কেএম আবদুস সালাম। কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য ও মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান এবং কোস্ট ট্রাস্টের পার্টনারশিপ ও অ্যাডভোকেসি সমন্বয়কারী সালেহিন সরফরাজ। এতে আরও বক্তব্য রাখেন বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেকটোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক)-এর পরিচালক পংকজ হাজারিকা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং মৎস্য খাত বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দুর রহমান চৌধুরী, মৎস্য অধিদফতরের পরিচালক-মেরিন জনাব ড. একেএম আমিনুল হক। বিশেষজ্ঞরা সেমিনারে বলেন, সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশীয় পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার পাশাপাশি বিদেশিদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। এই নীতিমালা প্রণয়নের সময় সরকারকে অবশ্যই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। তারা আরও বলেন, সাগর এবং উপকূলে মৎস্য আহরণের ক্ষেত্রে বিদেশি ট্রলার নয়, বরং দেশীয় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

কেএম আবদুস সালাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে আমরা সমুদ্রের বিশাল এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছি। আদালতের রায়ে আন্তর্জাতিকভাবে এখানে আমরা বিজয়ী হয়েছি। এটা শেখ হাসিনার সরকারের বড় একটি সাফল্য। তিনি বলেন, মৎস্যজীবী, কৃষক সকলকে দাদনের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে। দেশে এটা আর চলতে দেয়া যাবে না। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে (এনজিও) দরিদ্র মানুষের জন্য দেয়া ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার অবশ্যই কমাতে হবে। তিনি এনজিওগুলোকে তাদের প্রফিট রেট কমানোর তাগিদ দেন।

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির উন্নয়ন ও বিকাশে অতি দ্রুত স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এখাতে আমাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সময়মতো সেই কাজ বাস্তনবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি দেশের ধারাবাহিক সামাজিক ও আর্থিক প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের প্রশংসা করেন এবং তা টেকসই করার প্রয়োজনীতার উপরও গুরুত্বারোপ করেন।

খলীকুজ্জমান বলেন, মৎস্যখাতে যেসব জলাভূমি রয়েছে, সেগুলো কোথাও যেন আর লিজ দেয়া না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সমন্বিত উন্নয়নের ক্ষেত্রে সব খাতকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, জাহাজ ভাঙা শিল্প পরিবেশের প্রতি নেতিবাচক কোন প্রভাব ফেলছে কিনা, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে এই শিল্পের প্রভাবে মৎস্য উৎপাদন ও বিকাশের ক্ষতি হচ্ছে, সেই বিষয়টি যাতে না ঘটে সেজন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

ড. সায়েদুর রহমান বলেন, সরকারের নীতিমালা আছে, কিন্তু সেখানে সরকারের অনুমান এবং প্রকৃত তথ্যের মধ্যে অনেক দূরত্ব রয়েছে। এই দূরত্ব ঘুচিয়ে আনতে হবে এবং নীতিমালাকে হতে হবে প্রকৃত তথ্য নির্ভর। তিনি বঙ্গোপসাগরে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং উপকূলীয় জেলেদের পর্যাপ্ত বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে তার উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সমুদ্র সম্পদ সুরক্ষায় অবারিত মৎস্য আহরণ বন্ধ করতে হবে। প্রজাতি সুরক্ষা ও মৎস্য রেণু সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধকরণের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে নির্র্দিষ্ট কিছু সময়ে মৎস্য শিকার নিষিদ্ধ করতে হবে।

মূল প্রবন্ধে ব্লু ইকোনমি ও পররাষ্ট্র নীতি এবং ব্লু ইকোনমি দ্বারা দারিদ্র্য বিমোচনের সরাকরের কৌশল নিয়ে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলো হলোÑ বাংলাদেশকে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংযোগস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আর এ কারণেই বাণিজ্য, সম্পদ আহরণ এবং ভূরাজনৈতিক বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারকে উপকূলয়ি এলাকার দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে, যেখানে জেলেরা তুলনামূলকভাবে বেশি দারিদ্র্যে জর্জরিত, তাই উপকূলীয় জেলেদের জন্য বঙ্গোপসাগরের সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এই প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারে একটি যথাযথ নীতিমালা গ্রহণ করে। এই নীতিমালা প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক বৈষম্য নিরসনেও ভূমিকা রাখবে।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ২০১২ সালে মায়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র এলাকা এখন বাংলাদেশের। সঙ্গে আছে ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরণের প্রণিজ-অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার। ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশের জন্য মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্রসীমা আরেকটি গোটা বাংলাদেশই বটে। এখন এই বিজয়কে প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করতে এর সম্পদ ব্যবহার করে উন্নয়ন তরান্বিত করতে হবে।