menu

সংস্কারের পর ফের চালু হবে চিনিকল

সংবাদ :
  • রেজাউল করিম
  • ঢাকা , রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০

লোকসানের কারণে বন্ধ হওয়া চিনিকলগুলো ফের চালু হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)। গতকাল বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান সনৎ কুমার সাহা সংবাদকে জানান, লোকসানের বোঝা কমাতে সরকারি ছয় চিনিকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কলগুলো বন্ধ থাকবে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের আখমাড়াই পর্যন্ত। পরে বিদেশি বিনিয়োগে কারখানাগুলো আধুনিকায়ন করে চালু হবে এবং চিনির পাশাপাশি স্পিরিট, অ্যালকোহলসহ অন্য উপজাত পণ্য উৎপাদন করবে।

জানা গেছে, উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া চিনিকলগুলো হচ্ছে কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড়, শ্যামপুর (রংপুর), রংপুর ও সেতাবগঞ্জ (দিনাজপুর) চিনিকল। সব মিলিয়ে করপোরেশনের অধীনে রয়েছে ১৫টি চিনিকল। ছয়টি চিনিকল বন্ধ হলেও বাকি নয়টিতে আখমাড়াই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এমনকি ছয় চিনিকলের অধীনে থাকা চাষিদের আখ কিনবে করপোরেশন। সেই আখ চালু থাকা চিনিকলে মাড়াই হবে। বন্ধ হওয়া ছয় চিনিকলে ২ হাজার ৮৮৪ জন শ্রমিক কর্মচারী কর্মরত। সরকারের সবকটি চিনিকলেই বর্তমান বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে উৎপাদিত হচ্ছে চিনি। তাতে গত পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা লোকসান গুনছে করপোরেশন। তারমধ্যে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরেই লোকসান ছিল ৯৭০ কোটি টাকা। তাছাড়া ৭ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা ব্যাংকঋণের দায় রয়েছে করপোরেশনের ঘাড়ে। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও গ্র্যাচুইটি, ভবিষ্যৎ তহবিল, আখের মূল্য ও সরবরাহকারীর বিল বাবদ বকেয়া পড়েছে ৫৫১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান সনৎ কুমার সাহা সংবাদকে বলেন, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা বলছে যে চিনিকলগুলো বন্ধ হচ্ছে। কিন্তু কথাটি ঠিক নয়। আসলে কলগুলোর উৎপাদন বা মাড়াই স্থগিত করা হয়েছে। ছয়টি চিনিকলে চলতি অর্থবছর আখমাড়াই স্থগিত থাকবে। তবে চাষিদের সব আখ কিনে নেবে সরকার। সেগুলো চালু থাকা চিনিকলে পাঠানো হবে। চিনিকলের কোন শ্রমিক-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হবে না। উৎপাদন বন্ধ থাকা কারখানার শ্রমিকদের পার্শ্ববর্তী চিনিকলে বদলি করা হবে। ফলে চিনিকল বন্ধ হলেও আখচাষি ও কারখানার কর্মীদের কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। চিনিকলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ দিন ধরে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই ‘সংস্কার ও আধুনিকায়নের’ উদ্দেশ্যেই কারখানাগুলো আপাতত বন্ধ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অধিক লোকবল, মেশিনের দক্ষতা নষ্ট হওয়া, কাঁচামালের ঘাটতি, দীর্ঘদিন জমতে থাকা ব্যাংক ঋণের সুদ ও বছরের প্রায় ১০ মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকাসহ নানা কারণে প্রতি বছরই প্রায় হাজার কোটি টাকা লোকসন গুনছে রাষ্ট্রায়ত্ত ১৫টি চিনিকল। এসব কারণে বেসরকারি রিফাইনারিতে উৎপাদিত সাদা চিনি বাজারে প্রতি কেজি ৬০ টাকা থেকে ৭০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও সরকারি চিনিকলগুলো উৎপাদিত চিনির দাম পড়ে যাচ্ছে প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। ঋণজালে জর্জরিত কারখানাগুলো সময়মতো আখচাষিদের পাওনা পরিশোধ করার সক্ষমতাও হারাতে বসেছে।

বিএসএফআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯৭০ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে চিনিকলগুলো। বিগত পাঁচ বছরে জমতে থাকা লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯৭৬ কোটি টাকা। গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে আখ মাড়াই শেষে প্রায় ৫০ কোটি টাকার লোকসান দিয়েছে সেতাবগঞ্জ সুগার মিল। এ বছর উৎপাদন বন্ধ রাখার চিঠি পেয়েছে কারখানাটি। ফলে এই চিনিকলের আওতাভুক্ত আখগুলো চলে যাবে পাশের ঠাকুরগাঁও সুগার মিলে।

চিনিকলগুলো লোকসানে পড়ার একটি কারণ হলো, মাড়াইয়ের মৌসুমে কলগুলোতে যে পরিমাণ আখের প্রয়োজন সেই পরিমাণ আখ পাওয়া যায় না। কৃষকরা আখ চাষে আগ্রহ দেখায় না। কেন কৃষক আখ চাষে আগ্রহ দেখায় না এমন প্রসঙ্গে পঞ্চগড়ের রাকিব আশরাফ হোসেন নামের একজন আখচাষি সংবাদকে বলেন, ‘এক সময় আমি ১৫ একর জমিতে আখ চাষ করতাম। এখন করি মাত্র দুই একর জমিতে। নিজের টাকা খরচ করে আখচাষ করে যদি সময় মতো টাকা না পাই তাহলে তা চাষ করার প্রয়োজন নাই।’ কেন সময় মতো টাকা পান না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আখ চাষ করে সেই আখ চিনিকলগুলোতে বিক্রি করি। কিন্তু সেই আখ বিক্রির টাকা পেতে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। অনেক সময় দালালদের কমিশন দিয়ে টাকা পাই। আমরা কি নিজে কষ্ট করে আখ চাষ করে দালালকে কমিশন দিবো?’

শুধু তাই নয়, আখ চাষ করে লাভ কম হয় বলে জানান কয়েকজন কৃষক। এনামুল হক নামের একজন কৃষক বলেন, ‘আমরা চাষাবাদ করি লাভের জন্য। যে ফসলে লাভ বেশি হবে আমরা সেই ফসলই চাষ করব। এখন আখ চাষের চেয়ে অন্য ফসল চাষ করলেই বেশি লাভ হয়।’ কেন আখ চাষে লাভ কম হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চিনিকলগুলো আগ্রহ কম দেখায় এবং আমরা তাদের ছাড়া অন্য কোথাও আখ বিক্রি করতে পারি না। তাই তারা যে দাম দেয় আমাদের সেই দামেই বিক্রি করতে হয়। আখ চাষ করতে গিয়ে আমরা তাদের হাতে বন্দী হয়ে পড়ি।’

যেখানে সরকারি চিনিকলগুলো লোকসানের কারণে বন্ধ হচ্ছে সেখানে বেসরকারি রিফাইনারি চিনিকলগুলো লাভজনকভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। বিএসএফআইসি সূত্র জানায়, বিদেশ থেকে র-চিনি (চিনির ঝোলাগুড়) আমদানি করে সেই চিনির সঙ্গে আরও কেমিক্যাল মিশ্রণ দিয়ে চিনি উৎপাদন করছে রিফাইনারি চিনিকলগুলো। এসব তারা এক কেজি র-চিনি ২০ থেকে ২৫ টাকায় আমদানি করে। তারপর সেই চিনি রিফাইন করে তারা ৫০-৫৩ টাকায় বাজারে বিক্রি করে। এতে প্রচুর লাভ হয় তাদের। তাই বেসরকারি কলগুলো ভালো করলেও সরকারিগুলো করতে পারছে না।

সরকারি চিনিকলগুলোর লোকসানের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। যেমন সরকারি চিনিকলগুলোতে শুধু চিনি উৎপাদন করা হয়। কিন্তু বেসরকারি রিফাইনারি চিনিকলগুলোতে চিনির পাশাপাশি অন্য পণ্যও উৎপাদন হয়। এ প্রসঙ্গে দর্শনা চিনিকলের উদাহরণ টেনে বিএসএফআইসি জানায়, দর্শনা চিনিকলে ২০১২-১৩ সালে চিনি উৎপাদন করে ৩৫ দশমিক ২৭ কোটি টাকা লোকসান করে। তবে ঝোলাগুড় থেকে অ্যালকোহল উৎপাদন করে ৫৭ দশমিক ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। অন্য চিনিকলগুলোতে ডিস্টিলারি স্থাপন করা হলে ঝোলাগুড় থেকে অ্যালকোহল, ভিনেগার, মোসালেজ কুকিজ ও ছোবড়া ব্যবহার করে ৫০-১০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

সরকারি এই ছয়টি চিনিকলে কাজ করেন মোট ১২ শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী। আর আখ চাষের সঙ্গে জাড়িত প্রায় সাত হাজার চাষি। চিনিকলগুলো বন্ধ হওয়ায় সংকটে পড়তে যাচ্ছেন তারা। বাংলাদেশ চিনিকল আখচাষি ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও আখচাষি কল্যাণ সমিতি পাবনা সুগার মিলস লি.-এর সভাপতি আলহাজ শাজাহান আলী বাদশা বলেন, ‘আমরা অপেক্ষায় ছিলাম চিনিকলে আখ মাড়াই শুরুর চিঠি আসছে। কিন্তু চিনিকল বন্ধ করল বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশন। এতে ১২শ’ শ্রমিক-কর্মচারী আর সাত হাজার আখচাষি পথে বসল।’ তবে চিনিকল বন্ধ হলেও কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হবে বলে জানান বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে বাংলাদেশ সুগার মিলস করপোরেশন গঠিত হয়। পরে সুগার মিলস করপোরেশন ও বাংলাদেশ ফুড অ্যান্ড অ্যালাইড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন দুটি একীভূত করে বিএসএফআইসি গঠিত হয়েছে। তখন সংস্থাটির অধীনে ছিল ৭২টি প্রতিষ্ঠান। পরে আরও চারটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। তবে বিভিন্ন সময় ৫৯টি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়। বর্তমানে করপোরেশনের অধীনে ১৫টি চিনিকল, একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা ও তিনটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।