menu

মালিকদের সিন্ডিকেট

লোকাল রুটে লঞ্চ সংকট চলছে ফিটনেসহীন ঝুঁকিপূর্ণ ছোট লঞ্চ

সংবাদ :
  • মাহমুদ আকাশ
  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯

  • কেবিন-সিটে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়
  • নোংরা পরিবেশ

লঞ্চ সংকটের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এক ইঞ্জিনচালিত ছোট লঞ্চে যাতায়াত করছে ঢাকা-বরিশাল লোকাল রুটের যাত্রীরা। লঞ্চ মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে মাত্র এক-দুইটি লঞ্চ দিয়ে এই রুটে যাত্রী পরিবহন করা হয়। বরিশাল থেকে ঢাকা পর্যন্ত আসা-যাওয়া পথে প্রায় অর্ধশত স্থানে বিরতি দেয় এইসব লঞ্চ। প্রতিটি ঘাট থেকে ২০-৫০ জন করে যাত্রী উঠা-নামা করা হয়। ধারণক্ষমতার দুই-তিন গুণ যাত্রী পরিবহন করা হয় লঞ্চগুলোতে। ঈদের সময় যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও বাড়ানো হয় না লঞ্চের সংখ্যা। অব্যস্থাপনা ও নোংরা পরিবেশের কারণে এই রুটে লঞ্চে যাতায়াত করতে চায় না যাত্রীরা। এই রুট লোকাল বলা হলেও বাস্তবে ঢাকা-বরিশাল ডাইরেক্ট রুটের লঞ্চের চেয়ে অধিক যাত্রী বহন করে এবং ভাড়াও বেশি নেয়া হয় এই রুটের লঞ্চগুলোতে। একটি লঞ্চে ২৫০ থেকে ৩০০ যাত্রী ধারণক্ষমতা থাকলেও এতে বহন করা হয় ১ থেকে ২ হাজার যাত্রী। এছাড়া ঈদের সময় এই রুটের লঞ্চগুলোতে ধারণক্ষমতার তিন-চারগুণ যাত্রী উঠায় লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। পা ফেলার পর্যন্ত জায়গা থাকে না। এই অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাইয়ের কারণে যেকোন সময় এই লঞ্চগুলো দুর্ঘটনায় পড়তে পারে বলে জানান লঞ্চ যাত্রীরা।

জানা গেছে, ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-মাদারীপুরসহ বিভিন্ন লোকাল রুটে প্রায় ১০-২০টি লঞ্চ চলাচল করে। এর মধ্যে ঢাকা-বরিশাল রুটের জলতরঙ্গ-১, জলতরঙ্গ-২, নিউসান-৪ ও মনিংসান-৬ নামের চারটি যাতায়াত করে। ঈদের সময় চারটি লঞ্চ চলাচল করলেও অন্য সময় দুটি চলাচল করে। আড়াইতলা হলেও এই লঞ্চগুলো আয়তন খুবেই ছোট। এর মধ্যে জলতরঙ্গ-১ লঞ্চে যাত্রী ধারণক্ষমতা ২০৭ জন উল্লেখ থাকলেও এতে বহন করে ৫ গুণ। এছাড়া নিউসান-৪ নামের একটি লঞ্চ রাজধানীর চরবাজারের সোয়ারীঘাট থেকে বরিশালের মুলাদীর থানার নাজিরপুর, ছবিপুরসহ বিভিন্ন ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ঢাকা আসা যাওয়ার সময় ডজন খাকেন ঘাট ধরে লঞ্চটি। এক ইঞ্জিল চালিত নিউসান-৪ লঞ্চটিতে যাত্রী ধারণক্ষমতা ৫৮৩ জন উল্লেখ থাকলেও এতে ১-২ হাজারের অধিক যাত্রী ধারণ করা হয়। এছাড়া ঈদে ধারণ ক্ষমতার তিন-চারগুণ যাত্রী ধারণ করা হয়। ছাদের যাত্রী উঠা নিষেধ থাকলেও তাও মানছে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। এই সব লঞ্চগুলো নিচ তলা, দোতলা, ছাদে উপরে লোক ধারণ করা হয়। এছাড়া লঞ্চের মাস্টারের রুমের ছাদের উপরে লোক ধারণ করা হয়। পাশাপাশি এ সব লঞ্চের টিকিট অতিরিক্ত ভাড়া নেয়া হয়। এই ছোট লঞ্চে কেবিন থাকে ১০ থেকে ১২টি। কিন্তু লঞ্চ স্টাফদের রুমগুলো অতিরিক্ত টাকার বিনিময় ভাড়া দেয়া হয়। এছাড়া এই লোকাল রুটে যাত্রী বেশি হলেও লঞ্চ মালিকরা সিন্ডিকেট করে এক থেকে দুটি বেশি লঞ্চ চলাচল করতে দেয় না। তাই দীর্ঘ থেকে এই লোকাল রুটের যাত্রীরা লঞ্চ মালিকদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এ ব্যাপারে ঢাকা-বরিশাল লোকাল রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী কামাল হোসেন নামের এক যাত্রী সংবাদকে বলেন, বরিশাল জেলার মুলাদী থানার ছবিপুর গ্রামে তার বাড়ি। তিনি ব্যবসায়ী কাজে নিয়মিত এই রুটে যাতায়াত করেন। রাজধানীর চরবাজারের সোয়ারীঘাট থেকে এই লোকাল রুটের ছাড়া হয়। প্রতিদিন ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-মাদারীপুর রুটে ঈদের আগে একটি করে দু’টি ও ঈদের দু’টি করে চারটি লঞ্চ যাতায়াত করে। ঈদের আগে যাত্রী কম থাকায় লঞ্চ কম চলাচল করে। কিন্তু ঈদের যাত্রী বেশি হলেও লঞ্চে সংখ্যা বাড়ানো হয় না। ঈদের আগে ভাড়া নেয়া হয় ২০০ টাকা আর ঈদের সময় ভাড়া নেয়া হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।

এই রুটের লঞ্চগুলো ফিটনেসবিহীন, ঝুঁকিপূর্ণ-ছোট লঞ্চ। তাই বর্ষার সময় যাতায়াত করতে যাত্রীরা ভয়ে থাকে। বিশেষ করে লঞ্চের কেবিনগুলো ছোট, খাটগুলো ভাঙা ও বাথরুমগুলো অপরিষ্কার। নেই পর্যাপ্ত বয়া ও লাইফ জ্যাকেট। প্রতিটি লঞ্চে যাত্রী ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত তিন-চারগুণ যাত্রী বহন করা হয়। তাই এই বর্ষার সময় পদ্মা ও মেঘনা নদী পাড় হওয়ার সময় যাত্রী ভয়ে কান্নাকাটি করে। এই রুটটি লোকাল বলে কোন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত ভাড়া ও যাত্রী বোঝাই করে লঞ্চ চালাচ্ছে মালিকরা। তাই ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-মাদারীপুর এই লোকাল রুটের লঞ্চের ফিটনেস ও যাত্রী বোঝাইয়ের ক্ষেত্রে নৌ-মন্ত্রণালয়ের সংস্থাগুলো আরও সতর্ক হওয়ার দাবি জানান যাত্রীরা। আনোয়ার হোসেন নামের এক যাত্রী সংবাদকে বলেন, ‘ঢাকা-বরিশাল এই লোকাল রুটের যাত্রীদের দুর্ভোগের শেষ নেই। বিশেষ করে ঈদের সময় লঞ্চে পা ফেলার মতো জায়গা থাকে না। লঞ্চে ধারণক্ষমতার চেয়ে তিনগুণ যাত্রী বোঝাই করা হয়ে লঞ্চগুলোতে। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণে লঞ্চের ভেতরে যাত্রীদের চলাচলের জায়গা থাকে না। এছাড়া ঈদের সময় এক শ্রেণীর দালার চক্র ডেকের যাত্রীদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে সিট বিক্রি করে থাকে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া ও কেবিনের জন্য হয়রানির শিকার হতে হয় যাত্রীদের। তাই অনেক যাত্রী ঢাকা-মুলাদী ও ঢাকা-বরিশালের রুটের বড় লঞ্চে যাতায়াত করে। লোকাল রুটে যাতায়াত করে না।’

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-মাদীপুরসহ বেশকয়েকটি লোকাল রুট রয়েছে। এই লোকাল রুট মানে রাজধানীর সদরঘাট থেকে বরিশাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে থামানো এই রুটের লঞ্চগুলো। এই রুটের লঞ্চগুলো সদরঘাটের বাইরে সোয়ারীঘাট, শ্যামপুর ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় রাখা হয়। এই ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার সময় সদরঘাটে কিছুক্ষণ জন্য রাখা এই লঞ্চগুলো। এরপর এই লঞ্চগুলো কাঠপট্টি, মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর হয়ে বরিশাল যেতে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি ঘাটের যাত্রী উঠা-নামা করানো হয়। তাই এই লঞ্চগুলোকে লোকাল রুটের লঞ্চ বলে। এই লঞ্চগুলো প্রতিদিন রাত সাড়ে ৮টায় সদরঘাটে থেকে ছেড়ে যায়। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে যাত্রী উঠা-নামানো করার কারণে বরিশাল যেতে দুপুর হয়ে যায়। তাই কোন কোন সময় বরিশাল পর্যন্ত যায় না এই লঞ্চগুলো। আবার ঢাকায় ফিরে আসে। তবে ঘাট বেশি হওয়া যাত্রী কিছুটা বেশি হয় এই রুটের লঞ্চগুলোতে। কিন্তু সে অনুযায়ী লঞ্চ সংখ্যা তেমন বাড়ানো হয় না। দুই কোম্পানি সিন্ডিকেট করে এই রুটের পরিচালনা করে থাকে। তাই সেবা তো দূরের কথা যাত্রী জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে এই রুটের লঞ্চ মালিকরা।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর এম. মাহবুব উল ইসলাম সংবাদকে বলেন, ঢাকা-বরিশাল লোকাল রুটসহ বিভিন্ন রুটে ফিটনেসবিহীন লঞ্চগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। ঈদের আগে নারায়ণগঞ্জে ভাঙাচোরা এমন কয়েকটি ফিটনেসবিহীন লঞ্চে এই অভিযান চালানো হয়েছে। এই সব লঞ্চে ডিজি শিপিং থেকে ফিটনেস সনদ ছিল। পরে তা প্রত্যাহার করে লঞ্চগুলো ডকইয়ার্ডে পাঠানো হয়। এভাবে সারাদেশে ফিটনেসবিহীন ছোট লঞ্চগুলোয় অভিযান চালানো হয়। এক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএ থেকে আরও তদারকি বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।