menu

শ্রমিক আন্দোলনের নামে

মধ্যপাড়া পাথরখনি বন্ধের পাঁয়তারা চলছে

উস্কানি দেয়ার অভিযোগ খনি কর্মকর্তা ও এক নেতার বিরুদ্ধে

সংবাদ :
  • চিত্ত ঘোষ, দিনাজপুর
  • ঢাকা , বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০

দেশের একমাত্র পাথর খনি মধ্যপাড়া পাথরখনিকে অচল করতে চলমান শ্রমিক আন্দোলনকে উস্কানি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে খনির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ স্থানীয় এক সরকার দলীয় প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে ।

খনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, করোনার কারণে উৎপাদন বন্ধ হওয়া মধ্যপাড়া পাথর খনিতে ৬ বছর ধরে বিরাজমান শান্ত পবিবেশকে শ্রমিক আন্দোলন ও সংগ্রামে অশান্ত করে তুলতে পাথরখনির একজন উপ-মহাব্যবস্থাপক এবং পার্বতীপুরের সরকার দলীয় এক প্রভাবশালী নেতা শ্রমিকদের মদদ দিচ্ছেন। আন্দোলনরত শ্রমিক নেতারা খনি বন্ধের পর ১৩ মে থেকে গত ২৯ জুলাই পর্যন্ত প্রায় ১০ বার বিভিন্ন অজুহাতে উক্ত ডিজিএম এর কাছে দেখা করতে গেছেন বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছেন।

গত ৩০ জুলাই বুধবার খনির ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জার্মানীয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) সরকারের নির্মাণাধীন উন্নয়ন প্রকল্পে মধ্যপাড়া পাথর খনির পাথর ব্যাবহারের কথা ভেবে করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের পর পাথর উৎপাদন করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২৮ জন শ্রমিককে কাজে যোগদান করার জন্য ডাকা হলে কয়েকজন শ্রমিক নেতা খনির গেটে তাদের বাধা প্রদান করেন। এতে করে প্রায় অর্ধেক শ্রমিক কাজে যোগদান না করে ফিরে যায়। এর পর বেলা ১২টার দিকে খনি কর্তৃপক্ষ সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের টাকা গ্রহণ করার জন্য পাথর খনির শ্রমিকরা খনি গেটে এসে অবস্থান নেয়। এ সময় তারা তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। খবর পেয়ে সরকারদলীয় ওই প্রভাবশালী নেতা মধ্যপাড়া পাথর খনিতে আসেন এবং খনির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে প্রায় আধাঘণ্টা পর বের হয়ে আসেন এবং উপস্থিত শ্রমিকদের আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

এদিকে গত এপ্রিল মাস থেকে বকেয়া বেতন-বোনাসসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে কয়েকজন শ্রমিকদের নিয়ে কমিটি গঠন করে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে বিভিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন ওই নেতা। তারই অংশ হিসেবে সরকার দলীয় সমর্থন আদায় করতে ২২ জুলাই আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন শ্রমিক লীগের ইউনিয়ন শাখা কমিটি গঠন করা হয়েছে। মধ্যপাড়া মহাবিদ্যালয় মাঠে কমিটি গঠন অনুষ্ঠানে পার্বতীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মো. হাফিজুল ইসলাম প্রামাণিক এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম- সাধারণ সম্পাদক মো. আমজাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন। উক্ত অনুষ্ঠানে আমজাদ হোসেন শ্রমিক আন্দোলনে তার পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তাদের পাশে থাকার জোরালো অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

খনির এক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বর্তমান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি কর্তৃক যখন মাসিক ১ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন পাথর উৎপাদন করে পাথর উৎপাদনের রেকর্ড তৈরি করে খনিটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে তখন খনি বন্ধের নানামুখী তৎপতার অংশ হিসেবে একটি অসাধু চক্র শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনে নানামুখী সহযোগিতা করছেন। যা সরকারের সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলার অপতৎপরতা চলছে বলে খনির স্বার্থ সংরক্ষণে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।

চিহ্নিত চক্রটির বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে মধ্যপাড়া পাথর খনিতে নানা অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগে খনি শ্রমিকদের আন্দোলনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। ওই দুষ্ট চক্রের কারণে দেশের একমাত্র এবং বৃহৎ এই পাথর খনিটি প্রায় ৭ বছরে প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে বন্ধের উপক্রম হয়। জিটিসি’র হাতে রেকর্ড পরিমাণ পাথর উত্তোলন হওয়ায় দেশের মেগা উন্নয়ন প্রকল্পে খনির পাথর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাথরের দেশীয় ক্রেতাও বেড়ে যায়। জিটিসি’র হাতে রেকর্ড পরিমাণ পাথর উত্তোলন হওয়ার ফলে গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে আয়-ব্যয় পর্যালোচনায় উৎপাদিত পাথর বিক্রয় রাজস্বের বিপরীতে কোম্পানির কর পরিশোধ পূর্বক মুনাফা ১১.৭৩ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা হয় ৭.২৬ কোটি টাকা। প্রথমবারের মতো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় দেশের একমাত্র পাথর খনি।

গত সোমবার বিকেলে আন্দোলন নিরসনের লক্ষ্যে ভবানীপুর কামিল মাদ্রাসা মাঠে স্থানীয় প্রশাসন, খনি কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের নিয়ে সমঝোতার আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম প্রামাণিক, পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহনাজ মিথুন মুন্নী, পার্বতীপুর মডেল থানার ওসি মো. মোখলেছুর রহমান, খনির জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) মো. আবু তালেব ফরাজি, জিএম (প্রশাসন ও সার্ভিস) শাহ মো. রেজওয়ানুল হক ও উপ-মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ রফিজুল ইসলাম রিটু। তারা সবাই শ্রমিকদের কাজে যোগদানের জন্য অনুরোধ করেন। সভায় উপস্থিত সবাই খনিতে উৎপাদন অব্যাহত রাখার পক্ষে ঐকমত্য পোষণ করেন।

অথচ সরকার দলীয় ওই প্রভাবশালী নেতার নির্দেশে গতকাল থেকে আবারও খনি গেটে শ্রমিকেরা অবরোধ কর্মসূচি শুরু করে। গতকাল সকাল ১০ টা থেকে ওই নেতার নির্দেশে খনি গেটের সামনে অবরোধ করে রেখেছে খনি শ্রমিকরা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (বিকেল ৪টা ) অবরোধ অব্যাহত ছিল।